যে কাঁঠালের বীজ এতদিন রান্নাঘর, বাজার কিংবা প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেয়া হতো, সেই অবহেলিত উপাদানই এখন দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা ও খাদ্যশিল্পের নতুন সম্পদ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বিশ্বের অন্যতম কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কাঁঠালের বীজ, খোসা ও অন্যান্য অংশ কোনো মূল্য সংযোজন ছাড়াই নষ্ট হয়ে যায়। অথচ সেই বীজ থেকেই এবার ১৬ থেকে ১৭ গুণ বেশি খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান (মিনারেল কনসেন্ট্রেট) তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গাকৃবি) গবেষকরা। ইতোমধ্যে উদ্ভাবনটি বাংলাদেশ সরকারের পেটেন্টও অর্জন করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা গেলে দেশের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, কৃষিজ বর্জ্যের মূল্য সংযোজন এবং কাঁঠালভিত্তিক শিল্পের নতুন বাজার গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
গাকৃবির খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের খাদ্য বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মো: এমদাদুল হক এবং তার স্নাতকোত্তর গবেষক মো: আকরাম হোসেনের যৌথ গবেষণায় এ প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমানের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় প্রায় তিন বছর ধরে পরিচালিত গবেষণার ফল হিসেবে ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রযুক্তিটি উদ্ভাবন করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, শুকনো কাঁঠালের বীজে প্রায় দুই শতাংশ খনিজ উপাদান থাকলেও উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মাধ্যমে তা ঘনীভূত করে ৩৩ শতাংশেরও বেশি মিনারেল কনসেন্ট্রেট তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ খনিজের ঘনত্ব প্রায় ১৬ থেকে ১৭ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
গবেষকদের মতে, এই মিনারেল কনসেন্ট্রেট বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে ব্যবহার করে অধিক পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে এখনো পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, জিঙ্ক ও ম্যাঙ্গানিজের মতো প্রয়োজনীয় খনিজের ঘাটতি বড় একটি জনগোষ্ঠীর পুষ্টি সমস্যার অন্যতম কারণ। অথচ মানবদেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, হাড় ও দাঁতের গঠন, রক্ত উৎপাদন, স্নায়ুতন্ত্র ও পেশির কার্যক্রম, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিভিন্ন এনজাইমের কার্যকারিতা বজায় রাখতে এসব খনিজ অপরিহার্য।
গবেষকদের দাবি, কাঁঠালের বীজ থেকে তৈরি এই ঘনীভূত খনিজ উপাদান দেশে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।
গবেষণাটি বাস্তবায়নে অর্থায়ন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘গ্র্যান্টস ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন (জিএআরই)’ প্রকল্প। পরে উদ্ভাবনের গুরুত্ব বিবেচনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদফতর (ডিপিডিটি) প্রযুক্তিটির পেটেন্ট প্রদান করে।
এই উদ্ভাবনের মাধ্যমে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১-এ। একই সাথে ‘গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে রূপান্তরের পর এটিই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পেটেন্টপ্রাপ্ত উদ্ভাবন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে এটি একটি ঐতিহাসিক অর্জন।
ভিসি প্রফেসর ড. জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এটি শুধু একটি পেটেন্ট অর্জনের ঘটনা নয়; বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি গবেষণার জন্য এটি একটি নতুন মাইলফলক। আমাদের গবেষকরা প্রমাণ করেছেন, কৃষিজ বর্জ্য হিসেবে পরিচিত একটি উপাদানকেও কীভাবে উচ্চমূল্যের পুষ্টিসমৃদ্ধ সম্পদে রূপান্তর করা যায়।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবনী গবেষণার পরিবেশ আরো শক্তিশালী করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে শিল্প ও সমাজের উপযোগী প্রযুক্তিতে রূপান্তর করে দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর অবদান রাখা।’
প্রযুক্তিটির অন্যতম উদ্ভাবক প্রফেসর ড. মো: এমদাদুল হক বলেন, ‘কাঁঠালের বীজ থেকে ঘনীভূত খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান তৈরির এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা গেলে দেশে নতুন পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যপণ্য উন্নয়নের পাশাপাশি কাঁঠালভিত্তিক শিল্পের বিকাশ, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং কৃষিজ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।’
এদিকে দেশের সর্বাধিক কাঁঠাল উৎপাদনকারী জেলা এবং ‘কাঁঠালের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত গাজীপুরেই গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান হওয়ায় এ উদ্ভাবনকে ঘিরে জেলায় কাঁঠালভিত্তিক মূল্য সংযোজন শিল্প গড়ে ওঠার নতুন সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, এতদিন অব্যবহৃত থেকে যাওয়া কাঁঠালের বীজ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করে মিনারেল কনসেন্ট্রেট উৎপাদনের শিল্প গড়ে উঠলে স্থানীয় কৃষক, উদ্যোক্তা ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্প একই সাথে উপকৃত হবে। এর মাধ্যমে কৃষকের কাঁঠালের অতিরিক্ত অংশেরও বাজার তৈরি হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং গাজীপুরকে কেন্দ্র করে একটি নতুন কৃষিভিত্তিক শিল্পখাতের বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিজ বর্জ্যকে মূল্যবান শিল্পকাঁচামালে রূপান্তরের এ ধরনের প্রযুক্তি দেশে সার্কুলার ইকোনমি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে খাদ্য অপচয় কমবে, পরিবেশের ওপর চাপ হ্রাস পাবে এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
উল্লেখ্য, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত ৯৭টি উন্নত ফসলের জাত এবং ২১টি প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। কাঁঠালের বীজ থেকে মিনারেল কনসেন্ট্রেট তৈরির প্রযুক্তিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পেটেন্টপ্রাপ্ত উদ্ভাবন হিসেবে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।



