জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, মধ্যবিত্তের আর্থিক সঙ্কট, নিম্নমধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয়, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি
  •  আর্থিক সঙ্কটে পড়তে হয় অধিকাংশের
  •  বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দূর করা জরুরি

মাসের শুরুতে বেতন হাতে আসার পর বেশ স্বস্তিতেই কাটে কয়েকটি দিন। কিন্তু মাস শেষ হওয়ার আগেই পকেট প্রায় খালি হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় ধারদেনা, বকেয়া মেটানোর দুশ্চিন্তা কিংবা পরবর্তী মাসের বেতনের অপেক্ষা। অথচ মাসিক আয় একেবারে কম নয়। তারপরও মাস শেষে হাতে থাকছে না কোনো টাকা। প্রশ্ন উঠছে, আয়ের অর্থ কোথায় যাচ্ছে? 
প্রতি মাসে বাসাভাড়া, গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ বিল, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার, যাতায়াত এবং মোবাইল-ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় করতে হয় আয়ের একটি বড় অংশ। এর সাথে যুক্ত হয় ছোট-বড় নানা আনুষঙ্গিক খরচ। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত বেতন না পাওয়ায় আর্থিক সঙ্কটে পড়তে হয় অধিকাংশের। সঞ্চয় তো দূরের কথা, অনেকের পক্ষে পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজধানীতে বসবাসকারী কয়েকটি পরিবারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আয়ের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে বাসাভাড়া, খাবার ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধে। এর বাইরে সন্তানদের পড়াশোনা, যাতায়াত ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে মাস শেষে হাতে টাকা থাকছে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দূর করা জরুরি।
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাসিক ২০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন এক তরুণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই চাকরিজীবী তিন সদস্যের পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বাসাভাড়া ও ইউটিলিটি বিল বাবদ প্রতি মাসে সাত হাজার টাকা এবং গ্যাস বাবদ প্রায় দুই হাজার টাকা খরচ হয়। এরপর খাবার, যাতায়াত ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে গিয়ে মাস শেষ হওয়ার আগেই বেতনের টাকা ফুরিয়ে যায়।
ওই চাকরিজীবী বলেন, তিন সদস্যের একটি পরিবারের ন্যূনতম মাসিক ব্যয়ও এখন ২০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। ফলে সীমিত আয়ে সংসার চালাতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। নিয়মিত বেতন না পেলে পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, অনেকেই মাসের ১০ তারিখের পর বেতন পান। তাদের সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। আর যারা দুই-তিন মাস পর বেতন পান, তাদের পরিবারের অবস্থা কী হতে পারে বলে প্রশ্ন করেন তিনি।
একই ধরনের আর্থিক সঙ্কটে রয়েছেন রাজধানীর অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা বিভাগে কর্মরত স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী আরেক তরুণ। মাসিক ২৫ হাজার টাকা বেতনে চার সদস্যের পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। সীমিত আয়ে রাজধানীতে স্ত্রী-সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে না পেরে শ্বশুরবাড়িতে রাখতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
ওই চাকরিজীবী বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই টাকা বেতনে জীবনযাপন করা অত্যন্ত কঠিন। পরিবারের সদস্যদের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। স্ত্রী-সন্তানের প্রয়োজন মেটাতে না পারার কষ্ট প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়। 
তিনি জানান, সংসারের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সাথে আয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসাথে বসবাস করাও সম্ভব হচ্ছে না। তার প্রত্যাশা, মাসিক বেতন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা হলে পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করে কিছুটা স্বস্তিতে জীবনযাপন করা সম্ভব হতো।
ছয় সদস্যের আরেকটি পরিবারের চিত্রও প্রায় একই। পরিবারের প্রধান আব্দুর রহমান (ছদ্মনাম) একজন চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে মাসে ২৬ হাজার টাকা বেতন পান। তার বড় ছেলে স্নাতকোত্তর শেষ করে রাজধানীর ইসলামপুরে একটি কাপড়ের প্রতিষ্ঠানের হিসাব বিভাগে মাসিক ২০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করছেন। পরিবারের অন্য তিন ছেলে এখনো পড়াশোনা করছে। বাবা ও বড় ছেলের সম্মিলিত মাসিক আয় ৪৬ হাজার টাকা হলেও সংসারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
আব্দুর রহমান জানান, প্রতি মাসে বাসাভাড়া বাবদ সাড়ে ১১ হাজার টাকা, দু’টি গ্যাস সংযোগের বিল প্রায় চার হাজার টাকা এবং বিদ্যুৎ বিল আড়াই হাজার টাকা দিতে হয়। ছয় সদস্যের পরিবারের খাবার খরচেই চলে যায় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। শুধু বাসাভাড়া, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও খাবার বাবদ মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় ৩৫ থেকে ৩৮ হাজার টাকা। এর বাইরে তিন ছেলের পড়াশোনা, যাতায়াত ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ রয়েছে।
তিনি বলেন, দু’জনের মিলে মাসে ৪৬ হাজার টাকা আয় করেও সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মাস শেষে সঞ্চয় করার মতো কিছুই থাকে না। বাসাভাড়া, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও খাবারের খরচ মেটানোর পর ছেলেদের পড়াশোনা এবং যাতায়াতের ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাজারে প্রায় সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসারের খরচ সামলাতে আগের চেয়ে বেশি বেগ পেতে হচ্ছে।
বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা দূর করার তাগিদ দিয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শিব্বির আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, জনগণের ওপর বাড়তি বোঝা চাপানোর আগে প্রশাসনিক অপচয় ন্যূনতম পর্যায়ে আনা উচিত। নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। তার মতে, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের যোগসাজশ একটি বড় কারণ। পাশাপাশি চাঁদাবাজিও পণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
ড. শিব্বির আহমেদ বলেন, হঠাৎ বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির চাপ না দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ প্রকাশ করা উচিত, যাতে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুতি নেয়ার সময় পায়। তার মতে, মূল্যবৃদ্ধির আগে প্রশাসনিক অপচয় ও দুর্নীতি কমানোর উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, মূল্যস্ফীতি কমে এলেই বাজারে পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। মৌসুমি পণ্যের দাম, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে কিছু পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশে সরবরাহপক্ষের সমস্যা রয়েছে।
তিনি বলেন, বাজারে পণ্য ও সেবার সরবরাহ বাড়ানো না গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে। এ জন্য উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সুদের হার ও করের হার কমানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আরো সক্রিয় করার ওপর জোর দেন তিনি।
অধ্যাপক আবু আহমেদের মতে, নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়লে বাজারে পণ্য ও সেবার সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে মানুষের আয় বাড়বে। এতে বাজারে সরবরাহজনিত চাপ কমার পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষের দ্রব্যমূল্যের চাপ মোকাবেলার সক্ষমতাও বাড়বে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ মূল্যস্ফীতি ও সম্পদের সুষম বণ্টনের অভাব বলে মনে করেন তুরস্কের সাকারিয়া ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেসের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস সহকারী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সালাহ উদ্দিন। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, মূল্যস্ফীতির প্রভাব মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে। কারণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার সাথে তাদের জীবনযাত্রার মান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
সম্পদের অসম বণ্টনকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করে ড. মুহাম্মদ সালাহ উদ্দিন বলেন, সমাজের একাংশের হাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ থাকলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের অনেক মানুষ জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর মতো আয় করতে পারছেন না। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না।
তিনি বলেন, কিছু মানুষের কাছে মূল্যস্ফীতি বড় কোনো সমস্যা না হলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের জন্য এটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক বোঝা তৈরি করে। বিশেষ করে, মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ হলে এসব পরিবারের ব্যয় সামলানো আরো কঠিন হয়ে পড়ে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

Advertisement