
- কাগুজে স্ট্যাম্পের বিদায়, কমবে জালিয়াতি
- স্ট্যাম্প ছাপা ও কমিশনে দুই বছরে ব্যয় ২৪৪ কোটি টাকা, জাল স্ট্যাম্পের ঝুঁকিও কমবে
- অর্থমন্ত্রীর অনুমোদন
১২৭ বছরের স্ট্যাম্পের যুগের অবসান হতে চলেছে। কারণ আগামী ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে সব ধরনের নন-জুডিসিয়াল শুল্ক ই-চালানের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব গত সোমবার বিকেলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। তার অনুমোদন পাওয়া গেছে বলে আইআরডির এক সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইআরডির এক কর্মকর্তা গতকাল জানিয়েছেন, ১৮৯৯ সাল থেকে চলে আসা ইমপ্রেসড ও অ্যাডহেসিভ স্ট্যাম্পের ব্যবস্থা বদলাতে যাচ্ছে সরকার। জমি রেজিস্ট্রেশনসহ সব ধরনের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প শুল্ক ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বাধ্যতামূলকভাবে অনলাইনে ‘এ-চালান’-এর মাধ্যমে দিতে হবে। এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) স্ট্যাম্প শাখা প্রজ্ঞাপনের খসড়া চূড়ান্ত করে অর্থমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য সারসংক্ষেপ পাঠানো হলে তা অনুমোদন করা হয়েছে বলে আমরা জেনেছি।
কেন এই সিদ্ধান্ত
সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ইমপ্রেসড ও অ্যাডহেসিভ স্ট্যাম্পের মাধ্যমে শুল্ক আদায়ের প্রক্রিয়া অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এতে জাল স্ট্যাম্পের কারণে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকিও রয়েছে। স্ট্যাম্প ছাপা, সংরক্ষণ ও পরিবহনেও বিপুল অর্থ খরচ হয়।
আইআরডির হিসাবে, গত দুই অর্থবছরে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প মুদ্রণে ব্যয় হয়েছে ২১৪ কোটি টাকা। মুদ্রিত স্ট্যাম্প বিক্রির জন্য ভেন্ডরদের কমিশন বাবদ গেছে আরো ৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই বছরে মোট খরচ ২৪৪ কোটি টাকা। পদ্ধতিটি পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হলে এই ব্যয় সাশ্রয় হবে। জাল স্ট্যাম্প বিক্রিও বন্ধ হবে এবং সরকারের রাজস্ব বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
আইনি ভিত্তি
অংশীজনদের সাথে আলোচনার পর বিভাগটি সব নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প শুল্ক এ-চালানের মাধ্যমে আদায়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘দ্য স্ট্যাম্প ডিউটিজ (অ্যাডিশনাল মোডস অব পেমেন্ট) অ্যাক্ট, ১৯৭৪’-এর ২(১) ধারায় দলিল নিবন্ধনের স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধের পদ্ধতি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঠিক করার ক্ষমতা অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের আছে। বিমা পলিসির ক্ষেত্রে একই ক্ষমতা এসেছে ‘দ্য স্ট্যাম্প অ্যাক্ট, ১৮৯৯’-এর ১১এ ধারা থেকে। খসড়া প্রজ্ঞাপনটি ইতোমধ্যে ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং পেয়েছে।
যা যা বদলাবে
খসড়া অনুযায়ী ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের পর থেকে এ-চালান ছাড়া স্ট্যাম্প শুল্ক নেয়া হবে না। তবে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত এ-চালানের পাশাপাশি বর্তমান পদ্ধতিতেও শুল্ক দেয়া যাবে। এর মধ্যে ১৯৭৪ সালের আইনের অধীনে ২০০১ সালের স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধ (অতিরিক্ত পদ্ধতি) বিধিমালা, বিমা পলিসির ২০০২ সালের বিধিমালা এবং কোম্পানি নিবন্ধন ও শেয়ার হস্তান্তরের ২০১০ সালের বিধিমালাসহ সব বিদ্যমান বিধানের ওপর এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
প্রজ্ঞাপনে তিনটি শর্ত রাখা হয়েছে
প্রথমত, নিবন্ধনযোগ্য দলিল লেখার জন্য কার্টিজ পেপার ব্যবহার করতে হবে। সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে দলিল জমা দেয়ার সময় শুল্ক পরিশোধের প্রমাণ হিসেবে এ-চালানের রসিদের মুদ্রিত কপি সংযুক্ত করতে হবে। দলিলের প্রথম পাতায় এ-চালানের নম্বর উল্লেখ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিমা পলিসির ক্ষেত্রেও পলিসির সাথে রসিদের মুদ্রিত কপি যুক্ত করতে হবে। রসিদে সংশ্লিষ্ট পলিসির সনাক্তকরণ নম্বর থাকতে হবে এবং পলিসির প্রথম পাতায় এ-চালানের নম্বর লিখতে হবে।
তৃতীয়ত, একসাথে একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে শুল্ক দেয়া হলে প্রত্যেকের নাম ও সনাক্তকরণ নম্বর (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে টিআইএন, এনআইডি, বিআইএন বা ট্রেড লাইসেন্স নম্বর) উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক।
জানা গেছে, সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪-এর নির্দেশ অনুযায়ী, ভেটিং হওয়া খসড়ার তারিখবিহীন স্বাক্ষরিত তিন কপি লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগে পাঠালে এস.আর.ও. নম্বর দিয়ে প্রজ্ঞাপনটি জারি হবে। প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনের এক হাজার কপি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও অন্যান্য প্রযোজ্য দফতরের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন হবে।
অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। শতভাগ রাজস্ব সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ায় রাজস্ব ফাঁকি রোধ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি, নাগরিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো ঘরে বসে বা যে কোনো স্থান থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে সহজে স্ট্যাম্প শুল্ক পরিশোধ করতে পারবে, যা দেশের ‘ইজি অব ডুয়িং বিজনেস’ বা ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন সূচকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








