পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে যুক্ত হচ্ছে ৫৮৩০ নতুন যান
  •  দুই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬,৬০৯ কোটি টাকা
  •  ৬৩৯ থানায় গাড়ি আছে মাত্র ১,২৩৭টি, ৬৪ শতাংশই ১০ বছরের বেশি পুরনো

থানাপ্রতি গড়ে দুটিরও কম গাড়ি, তার বড় অংশ আবার পুরনো। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ পুলিশের যানবাহন সক্ষমতা বাড়াতে দু’টি বড় প্রকল্প একনেকের বিবেচনার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। দুই প্রকল্পে মোট পাঁচ হাজার ৮৩০টি যানবাহন কেনা হবে। ব্যয় ধরা হয়েছে ছয় হাজার ৬০৯ কোটি টাকার বেশি, যার পুরোটাই সরকারি কোষাগার (জিওবি) থেকে। দু’টি প্রকল্পেরই উদ্যোগী মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ পুলিশ। মেয়াদ ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের জুন, কাজ হবে সারা দেশে।
প্রথম প্রকল্প- অপারেশনাল যানবাহন: ‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অপারেশনাল যানবাহন ক্রয়’ শীর্ষক প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় চার হাজার ৩২৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এতে চার হাজার ৮২৯টি যানবাহন কেনা হবে, যার জন্য রাখা হয়েছে চার হাজার ১৮৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। বাকি অর্থ রেজিস্ট্রেশন ফি, প্রশিক্ষণ, মেরামতের যন্ত্রপাতি ও কন্টিনজেন্সিতে যাবে।
প্রকল্প নথি অনুযায়ী, ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানা মাত্র এক হাজার ২৩৭টি যানবাহন নিয়ে প্রায় এক লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় টহলসহ অন্যান্য কাজ চালাচ্ছে। এর বাইরে ২৪টি রেলওয়ে থানা ও ৭৩টি হাইওয়ে থানা আছে। নথিতে বলা হয়েছে, একটি থানায় এক-দুটি গাড়ি থাকলে একটি দল অভিযানে গেলে বাকি এলাকার টহল ও দ্রুত সাড়াদান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সাধারণ পরিস্থিতিতে প্রতিটি থানায় ন্যূনতম চার-পাঁচটি পিকআপ বা টহলযান দরকার। জনবহুল ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় আরো বেশি লাগতে পারে।
যৌক্তিকতায় বলা হয়েছে, অপরাধের পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অপরাধী ধরা ও আলামত রক্ষায়, সন্ত্রাস দমন, মাদক উদ্ধার ও বিশেষ অভিযানে এবং জাতীয় নির্বাচনের মতো আয়োজনে সব থানায় একযোগে বাড়তি যান লাগে। নদীমাতৃক দেশ হিসেবে নদীপথে টহল, জাটকা নিধন প্রতিরোধ, দুর্যোগে উদ্ধার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় স্পিডবোট ও কান্ট্রি বোটের চাহিদাও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রকল্প- বিশেষায়িত যানবাহন: ‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষায়িত যানবাহন ক্রয়’ শীর্ষক পৃথক প্রকল্পের ব্যয় দুই হাজার ২৮০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এতে এক হাজার একটি যানবাহন কেনা হবে, যার জন্য দুই হাজার ২২৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। রেজিস্ট্রেশন ফির জন্য ৭৮৩টি যানের হিসাব আছে, ব্যয় প্রায় পাঁচ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। প্রশিক্ষণ পাবেন ৯১০ জন চালক ও মেকানিক এবং ৫০ জন ভেহিক্যাল মেকানিক।
নথিতে বলা হয়েছে, জনশৃঙ্খলা ও জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ টহল গাড়ির চেয়ে দাঙ্গা দমন যান অনেক দ্রুত ভূমিকা রাখতে পারে। দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অপরাধ দমনে সর্বভূমি যান সহজে প্রবেশ করতে পারে। মোবাইল কমান্ড সেন্টার অপারেশনের সময় ভ্রাম্যমাণ কন্ট্রোল রুম হিসেবে কাজ করে এবং উন্নত যোগাযোগ প্রযুক্তি দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ সহজ করে। ক্রাইম সিন ভ্যান অপরাধস্থল থেকে তাৎক্ষণিক প্রমাণ ও আলামত সংগ্রহে সহায়তা করে।
এডিপিতে অন্তর্ভুক্তি ও আয়-ব্যয় বিশ্লেষণ: প্রথম নথি অনুযায়ী, গত ১২ অক্টোবর আন্তঃমন্ত্রণালয় প্রোগ্রামিং কমিটির বিশেষ সভার সুপারিশ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ১৫ অক্টোবর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হয়।
প্রকল্পটি সেবাধর্মী হওয়ায় আর্থিক আয়-ব্যয় বিশ্লেষণ করা হয়নি। তবে ১২ শতাংশ ডিসকাউন্ট রেট ধরে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে নেট প্রেজেন্ট ভ্যালু (এনপিভি) প্রায় ১৯২ কোটি ১৭ লাখ টাকা, বেনিফিট কস্ট রেশিও (বিসিআর) ১ দশমিক ৫ এবং ইন্টারনাল রেট অব রিটার্ন (আইআরআর) ১৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এর ভিত্তিতে প্রকল্পটিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বলা হয়েছে। নথিতে প্রকল্পটিকে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রথম অধ্যায়ে উল্লিখিত সেবা বান্ধব পুলিশ গঠনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
পিইসির শর্ত: পিইসি সভা বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের সংখ্যা ডিপিপিতে রাখার সুপারিশ করেছে। তবে শর্ত দিয়েছে, যথাযথ ব্যয় প্রাক্কলন করে বিপিপিএ, অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিধিমালা অনুসরণ করে যানবাহন কিনতে হবে। টিওএন্ডই সংশোধনের সংস্থান রাখতে হবে এবং প্রকল্প শেষে গাড়িগুলো চালু রাখতে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ব্যবহার অযোগ্য, মেরামতযোগ্য ও চলমান যানবাহনের তথ্য পুনর্গঠিত ডিপিপিতে যুক্ত করতে হবে।
এ ছাড়া মেরামতের যন্ত্রপাতির বিস্তারিত তালিকা ও বাজার দর যাচাই কমিটির স্বাক্ষরিত প্রতিবেদন সংযুক্ত করা, বিদেশ প্রশিক্ষণ পরিহার, ক্রয় পরিকল্পনায় সমজাতীয় প্যাকেজ একত্র করে সংখ্যা কমানো এবং এক্সিট প্ল্যান সংযোজনের শর্তও দেয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের নথিতে এসব শর্ত ‘প্রতিপালন করা হয়েছে’ বলে উল্লেখ আছে। পিইসির কার্যবিবরণী জারি হয় ১৭ অক্টোবর এবং একই দিন পুনর্গঠিত ডিপিপি কমিশনে পৌঁছায়।
সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ কোটি টাকার বেশি হওয়ায় প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদনযোগ্য। পরিকল্পনা কমিশন তার মতামতে বলেছে, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পুলিশের যানবাহনের ঘাটতি পূরণের মাধ্যমে জনসেবায় দ্রুত সাড়া দেয়া সহজ হবে।

Advertisement