
- পশ্চিমবঙ্গ-সংলগ্ন জনপদে পুশইন আতঙ্ক
- বিশ্লেষকদের পরামর্শ কূটনীতিই পথ
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লি পুলিশ একে একে চারজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রীকে আটক করেছে। সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) আগে থেকেই কড়া অবস্থানে ছিল। এই ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গ ও আশপাশের জেলায় বিক্ষোভ ছড়ালে পুশইনের ঘটনা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সীমান্তসংলগ্ন এলাকার মানুষ। সার্বিক নিরাপত্তায় বিজিবির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য সদস্যদের সাথে সীমান্ত এলাকার বসবাসকারীরাও পুশইন ঠেকাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন।
গতকাল সীমান্তের বিজিবির একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা হলে তারা নাম প্রকাশ না করে বলেন, আমরা সীমান্তে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত আছি। এখানে জোরপূর্বক কোনো কিছুই করা সম্ভব নয় বলে স্পটভাবেই তারা বলেছেন।
এ দিকে সীমান্তসংলগ্ন ভারতীয় জনপদের বাসিন্দাদের একাংশ আশঙ্কা করছেন, দিল্লির উত্তেজনা পশ্চিমবঙ্গ ও আশপাশের জেলায় ছড়ালে বাংলাভাষী মানুষকে জোর করে সীমান্তের দিকে ঠেলে দেয়ার ঘটনা বাড়তে পারে।
বিজিবির প্রস্তুতি : সীমান্তে বিজিবির পাশাপাশি আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। সীমান্ত জেলাগুলোতে টহল বাড়ানো হয়েছে এবং গ্রামে গ্রামে মতবিনিময় সভার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। রাতে অপরিচিত লোকজন দেখলে খবর দিতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মত : সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বারবার কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলছেন। পুশ-ইন ও সীমান্ত হত্যা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দুই ধরনের আইনেরই লঙ্ঘন। তাদের মতে, মানুষকে শূন্যরেখায় ফেলে রাখলে মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি করে। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবিরের মূল্যায়নে, পুশইনে ভারত নিজের আইন ও কূটনৈতিক কাঠামো কোনোটিই মানছে না, আর রাজনৈতিক বিবেচনাই এখানে প্রধান। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মানবিক সঙ্কটের পাশাপাশি এতে সঙ্ঘাতের ঝুঁকিও সৃষ্টি হচ্ছে। বিএসএফ
তাদের ভাষ্য শুধু বিজিবি-বিএসএফ বৈঠক যথেষ্ট নয়, সমস্যাটি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। সীমান্তে আনা ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) ফজলে এলাহী আকবর গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, এই মুহূর্তে পুশইনের আশঙ্কার সাথে ভারতের রাজনৈতিক অস্থিরতার সরাসরি সম্পর্ক আছে বলে আমি মনে করি না। এই ন্যারেটিভের সাথে আমি একমত হতে পারছি না। আগে পুশইন হতো ধর্মীয় উগ্রবাদের অজুহাতে। সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর নির্যাতন হতো, তাদের মধ্যে ভয় কাজ করত। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হলেও মুসলমান তকমা লাগিয়ে ‘বাংলাদেশী’ বলে ঠেলে দেয়া হচ্ছিল। এখনকার অস্থিরতা সেই ধরনের নয়। এটা মূলত রাজনৈতিক।
তিনি আরো বলেন, ভারত সরকার এখন নিজেদের ক্ষমতা রক্ষা নিয়েই ব্যস্ত। তাই এই মুহূর্তে রাজনৈতিক কারণে তারা বাংলাদেশে পুশইনের কোনো পদক্ষেপ নেবে বলে আমি আশঙ্কা করছি না। আর যদি তারা তা করেই, তাহলে আমরা আগেও দেখেছি, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বিজিবির পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ করেছে। এবারো তারা একই দক্ষতা ও জজবা দেখাবে, এটাই আমার বিশ্বাস।
ফজলে এলাহী আকবর মনে করেন, বর্তমান আন্দোলনের মূল ইস্যু নির্বাচন। যাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে, তাদের নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আর এর সাথে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা জড়িয়ে আছে। সরকার এখন হার্ডলাইনে গেছে। চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রীসহ প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে। এতে অস্থিতিশীলতা আরো বাড়তে পারে, পশ্চিমবঙ্গেও বাড়তে পারে। আমি অসম্ভব কিছু বলছি না।
তিনি আরো বলেন, আন্দোলনকারীদের স্লোগান শুনলে বোঝা যায়, তাদের অভিযোগ হলো, নির্বাচন কমিশনের সহায়তা ছাড়া গত নির্বাচনে এমন প্রক্রিয়া সম্ভব হতো না। দুঃখের বিষয়, ভারতের মতো একটি বড় গণতান্ত্রিক দেশে এমন ঘটবে, তা আমরা কল্পনা করিনি। এখন মনে হচ্ছে, হাসিনা সরকারের ফ্যাসিবাদী পদ্ধতিগুলোই তারা অনুকরণ করছে। তারা বুঝতে পারছে না, বাংলাদেশে ২০২৪ সালে যে গণজাগরণ হয়েছিল, যাকে আমরা জুলাই বিপ্লব হিসেবে চিনি, একই উপায়ে ঠেকাতে চাইলে তাদেরও একই পরিণতি হতে পারে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ : গত ৬ অক্টোবর সীমান্তে নতুন করে টানাপড়েন দেখা গেছে। নওগাঁর সাপাহারের সোনাডাঙা ও জয়পুরহাটের কড়িয়া সীমান্তে সাতজনকে পুশ ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। বিজিবি তা ঠেকায়, আর সাতজনই শূন্যরেখায় অবস্থান করছিলেন। বিজিবি জানায়, তাদের ফেরত নিতে বিএসএফের সাথে আলোচনা চলছে।
এর আগে জুনে দিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের চার দিনের বৈঠক হয়। বৈঠকের আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সব অবৈধ পুশইন ঠেকানো হবে এবং বিষয়টি কূটনৈতিক চ্যানেলে তোলা হচ্ছে। ২০ জুলাই বিজিবি সদর দফতরে গিয়ে তিনি সীমান্তের সর্বত্র সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। বিজিবি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত এক বছরে অন্তত ২ হাজার ৪৬৩ জনকে পুশইন করা হয়েছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








