ছাত্ররাজনীতির মডেল, গণ-অভ্যুত্থান
। ইন্টারনেট

 

Advertisement

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্ররাজনীতির ধরন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের দলীয় আধিপত্য, হলকেন্দ্রিক ক্ষমতা, গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি এবং শিক্ষার্থীদের ওপর রাজনৈতিক চাপের বিপরীতে অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সমস্যা সমাধানভিত্তিক রাজনীতির দাবি সামনে এসেছে। এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ বিরতির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নির্বাচনের পর এসব ছাত্র সংসদ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা, কর্মসংস্থান, পরিবহন, আবাসন ও শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে ছাত্র সংসদের কার্যক্রমের পরিধি যেমন বেড়েছে, তেমনি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহির প্রশ্নও গুরুত্ব পেয়েছে। দলীয় কর্মসূচির বাইরে শিক্ষার্থীদের জন্য সরাসরি সেবা নিশ্চিত করার এই প্রবণতা প্রচলিত ছাত্ররাজনীতির মডেল পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তবে উদ্যোগের সংখ্যা বাড়লেই ছাত্ররাজনীতির কাক্সিক্ষত পরিবর্তন নিশ্চিত হয় না। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কতটা শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারছেন কি না এবং আবাসিক হলগুলোতে পুরনো রাজনৈতিক আধিপত্য কতটা কমেছে- এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে এই পরিবর্তনের স্থায়িত্ব।
ডাকসুতে সেবামূলক কার্যক্রমের বিস্তার
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট বড় জয় পায়। ভিপি নির্বাচিত হন আবু সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদ এবং এজিএস মুহিউদ্দীন খান। দায়িত্ব নেয়ার পর শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে একাধিক উদ্যোগ নেয় নির্বাচিত নেতৃত্ব। চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বছরের কার্যক্রমের প্রতিবেদনে ডাকসু জানায়, ৪১টি ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে এক হাজারের বেশি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আবাসন সঙ্কট নিরসনে দুই হাজার ৮৪১ কোটি টাকার হল প্রকল্প, পাঁচটি নতুন হল এবং ১০টি হলে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। ছাত্রীদের জন্য দেড় হাজার আসনের হল নির্মাণ, হল সংস্কার, রিডিংরুম আধুনিকায়ন এবং পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়নেও বিভিন্ন কার্যক্রম নেয়া হয়েছে।
পরিবহন খাতে বনানী রুটে বাস, সন্ধ্যাকালীন বাস, ঢাকা-কুমিল্লা সাপ্তাহিক বাস সার্ভিস এবং ক্যাম্পাসে ১৯টি ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে গাড়ি চালনার প্রশিক্ষণ, প্রাথমিক চিকিৎসা, স্পোকেন ইংলিশ, চাকরিমুখী প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার সেমিনার ও সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। চার শতাধিক শিক্ষার্থীকে আইনি সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি, বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন, জিমনেশিয়াম আধুনিকায়ন ও ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছে ডাকসু।
স্বাস্থ্যসেবায় প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে শহীদ ডা. মোস্তফা  মেডিক্যাল সেন্টার আধুনিকায়ন, মেডিক্যাল ক্যাম্প, টিকাদান কর্মসূচি ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম নেয়া হয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় কাউন্সেলিং কর্মশালা, শিক্ষক মূল্যায়নপদ্ধতি চালু, প্রশাসনিক সেবা অনলাইনে আনা এবং ‘ওয়ান ডিউ’ অ্যাপ চালুর উদ্যোগও রয়েছে।
গবেষণা ও উচ্চশিক্ষায় গবেষণা কর্মশালা, স্কলারশিপ সেমিনার, ‘ফ্রম ডিইউ টু অক্সফোর্ড’, ‘বিয়ন্ড বর্ডার্স : ইউএসএ’ এবং ‘এডুকেশন এক্সপো-২০২৬’ আয়োজনের কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সাহিত্যপত্রিকা ও বই প্রকাশ, ক্যান্টিনের খাবারের মান উন্নয়ন, স্বল্পমূল্যে পণ্য সরবরাহ, ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং খেলাধুলার আয়োজন করা হয়েছে।
তবে ডাকসুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবহন, শিক্ষক মূল্যায়ন, প্রশাসনিক সেবা, স্বল্পমূল্যে খাবার সরবরাহ ও ক্রীড়া অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতের ৩৩টি উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। ডাকসু নেতারা প্রশাসনিক অসহযোগিতা, অনুমোদনপ্রক্রিয়ার জটিলতা ও বাজেটের সীমাবদ্ধতাকে কাজের পথে বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমের ভাষ্য, প্রাথমিকভাবে ২৫ লাখ টাকা বাজেট দেয়া হলেও পরে আরো ১০ লাখ টাকা দেয়া হয়। তার দাবি, স্পন্সর সংগ্রহ করে তারা প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কোটি টাকার কাজ করেছেন। তবে এ ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, অর্থায়নের উৎস ও প্রকল্পভিত্তিক অগ্রগতি স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হলে এসব উদ্যোগের মূল্যায়ন আরো সহজ হবে।
ডাকসুর নিয়মিত মেয়াদ ১৪ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৯০ দিন দায়িত্ব পালনের সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিধানের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। পরবর্তী নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা না হওয়ায় ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। ছাত্রদল সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টও সংস্কার শেষে দ্রুত তফসিল ঘোষণা, প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন এবং অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে তা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে।
জাকসুতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে উদ্যোগ
২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ১৮ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেন। দায়িত্বের এক বছরে ৩৩৮টি কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে জাকসু। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন, সংস্কৃতি ও অবকাঠামো খাতে এসব কর্মসূচিতে প্রায় তিন কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য দেয়া হয়েছে।
জাকসু নেতারা জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে পাওয়া ১৮ লাখ টাকার বাইরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্পন্সরের সহায়তায় বাকি অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি আবাসিক হলে কম্পিউটার, ডেস্কটপ সেটআপ ও টেবিল সরবরাহে প্রায় ১১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা এবং মেডিক্যাল সেন্টার আধুনিকায়নে প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং নিয়েছেন ৮০০-এর বেশি শিক্ষার্থী। চাকরিমেলায় অংশ নিয়েছেন প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী। বিনামূল্যে আইইএলটিএস কোর্সের দুই ধাপে সুযোগ পেয়েছেন ৭০০-এর বেশি শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধায় বাস ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু এবং নারী শিক্ষার্থীদের সাইকেল ও স্কুটি চালানোর প্রশিক্ষণের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।
জাকসুর সাবেক এজিএস ফেরদৌস আল হাসান বলেন, শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করা হলেও বাজেট-সঙ্কটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সমাধান সম্ভব হয়নি। পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ফার্ম ও স্পন্সরের সহযোগিতায় কাজগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়।
রাকসুতে উদ্যোগের পর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
দীর্ঘ ৩৬ বছর পর ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম ১০০ দিনে ৫৫টি উন্নয়ন ও সংস্কারমূলক কাজের পাশাপাশি আরো ৪৮টি কার্যক্রমের তালিকা প্রকাশ করে রাকসু। এসব উদ্যোগের মধ্যে ছিল থিসিসের শিক্ষার্থীদের জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা প্রণোদনা, গবেষণাবিষয়ক সেমিনার এবং সাইবার নিরাপত্তা কর্মশালা।
রাকসুর বিভিন্ন বিভাগ গত কয়েক মাসে খেলাধুলা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, গবেষণা, নারী শিক্ষার্থীদের সুবিধা ও ক্যাম্পাসের পরিবেশ উন্নয়নে কর্মসূচি নিয়েছে। ভিপির উদ্যোগে বিশ্বকাপ ফুটবল প্রদর্শনী, ‘রান উইথ রাকসু’ এবং জুলাই জাদুঘর স্থাপনের কথা জানানো হয়েছে। ক্রীড়া বিভাগ আন্তঃহল ক্রিকেট, ভলিবল ও হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতার পাশাপাশি খেলোয়াড়দের ট্রাভেল কিট ও ব্যাগ বিতরণ করেছে। তথ্য ও গবেষণা বিভাগ রাকসু ভবনে ওয়াই-ফাই চালু, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক সেমিনার এবং উচ্চশিক্ষাবিষয়ক ওয়েবিনারের আয়োজন করেছে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন ও ফার্স্ট এইড বক্স স্থাপন করা হয়েছে।
তবে দায়িত্ব নেয়ার প্রায় ৯ মাস পরও আবাসনসঙ্কট, পরিবহন, হলের খাবারের মান ও মেডিক্যাল সেন্টারের উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে অপেক্ষা ও অসন্তোষ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের একাংশ উদ্যোগগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও বাস্তবায়নের ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
চাকসুতে নতুন নেতৃত্ব
২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত সম্প্রীতি শিক্ষার্থী জোট ২৬টি পদের মধ্যে ২৪টিতে জয় পায়। ভিপি নির্বাচিত হন ইব্রাহিম রনি এবং জিএস সাঈদ বিন হাবিব। ৪৪ বছর পর চাকসুর নেতৃত্বে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের প্রত্যাবর্তন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।
দীর্ঘ বিরতির পর নির্বাচিত প্রতিনিধি পাওয়ার সুযোগ ফিরে এলেও নেতৃত্বের কার্যকারিতা নির্ভর করবে শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধান, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনের কাছে তাদের দাবি তুলে ধরার সক্ষমতার ওপর। নির্বাচনে জয়কে সাংগঠনিক শক্তির প্রমাণ হিসেবে দেখা যেতে পারে; কিন্তু শিক্ষার্থীদের আস্থা ধরে রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত সেবা ও দৃশ্যমান ফলাফল।
জকসুতে চিকিৎসা, বৃত্তি ও উচ্চশিক্ষায় গুরুত্ব
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচন ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ ২০ বছর পর অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৬৫ শতাংশ। ভিপি নির্বাচিত হন মোহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম, জিএস আবদুল আলিম আরিফ এবং এজিএস মাসুদ রানা।
জকসু শিক্ষার্থীদের কল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সৃজনশীলতা বিকাশে তিন দিনব্যাপী ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতা এবং জরুরি রক্তের চাহিদা মেটাতে ‘হান্টেড ড্রপ’ অ্যাপ চালুর কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টার আধুনিকায়ন, ল্যাব স্থাপন ও নতুন অ্যাম্বুলেন্স যুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া ৩০০ শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে আইইএলটিএস কোর্সের ব্যবস্থা এবং টিসিবির সাথে যৌথ উদ্যোগে ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপণ্য সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন ক্যাম্পাসে আবাসন নিশ্চিত করা এবং আর্থিক সঙ্কটে থাকা শিক্ষার্থীদের বিশেষ বৃত্তির দাবিতেও মানববন্ধন করেছে জকসু।
দলীয় রাজনীতির বাইরে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচন ও পরবর্তী কার্যক্রমে সংগঠিত রাজনৈতিক প্যানেলের প্রভাব স্পষ্ট। ডাকসু, জাকসু, রাকসু, চাকসু ও জকসুর নির্বাচনী ফলাফল দেখিয়েছে, ছাত্র সংসদ এখনো সংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তবে কোনো সংগঠনের জয় বা পরাজয় দিয়েই ছাত্ররাজনীতির সামগ্রিক পরিবর্তন নির্ধারণ করা যায় না।
ছাত্ররাজনীতিতে ‘লেজুড়বৃত্তি’ বলতে সাধারণত শিক্ষার্থীদের স্বার্থের চেয়ে মূল রাজনৈতিক দলের নির্দেশ, ক্ষমতা ও কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রবণতাকে বোঝানো হয়। এ প্রবণতা কমাতে হলে ছাত্র সংসদকে শিক্ষার্থীদের কাছে সরাসরি জবাবদিহি করতে হবে। কোন সমস্যা সমাধান হয়েছে, কোন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি এবং কেন হয়নি- এসব বিষয়ে নিয়মিত ও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমানের মতে, ছাত্র সংসদের উদ্যোগকে স্থায়ী পরিবর্তনে রূপ দিতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীর জন্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, আবাসিক হলের আসন, খাবার ও নিরাপত্তার মতো বিষয়ে দলীয় প্রভাব কমাতে হবে। চতুর্থত, ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার এবং ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
ছাত্র সংসদকে শুধু প্রশাসনের সহযোগী হিসেবে নয়, প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের স্বার্থে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমালোচক হিসেবেও ভূমিকা রাখতে হবে।
সবমিলিয়ে, দীর্ঘ বিরতির পর ছাত্র সংসদ নির্বাচন শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব ও অধিকারচর্চার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা, পরিবহন ও কল্যাণমূলক উদ্যোগ এ পরিবর্তনের ইতিবাচক দিক; কিন্তু উদ্যোগের তালিকা, ব্যয়ের অঙ্ক কিংবা নির্বাচনী বিজয়ই শেষ কথা নয়। প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন, অর্থের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, ভিন্নমতের নিরাপত্তা এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত সেবা নিশ্চিত করাই হবে নতুন ছাত্ররাজনীতির প্রকৃত পরীক্ষা।