
- রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর নয়, নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতায় লাগাম গুরুত্বপূর্ণ : ড. শরীফ ভূঁইয়া
- ১৪২ অনুচ্ছেদে সংশোধন হলে ফের গণভোটের প্রশ্ন, সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে মত
সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও বাস্তবে সেই ভারসাম্য কিভাবে নিশ্চিত হবে- এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। শুধু রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি নয়, নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা কমিয়ে সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার ওপর জোর দিয়েছেন সিনিয়র আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। তার মতে, রাষ্ট্রপতিকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়ে দু’টি পৃথক ক্ষমতা কেন্দ্র তৈরি করলে উল্টো নতুন জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে; বরং মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগসহ নির্বাহী বিভাগের বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর করার মাধ্যমেই প্রকৃত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন দেয়ার চেষ্টা চলছে এবং আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন হতে পারে। মৌলিক কিছু সাংবিধানিক বিধান সংশোধন করা হলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের আগে সাংবিধানিক গণভোটের প্রয়োজন হতে পারে বলেও তিনি জানিয়েছেন। একই সাথে জুলাই জাতীয় সনদ ও নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতিকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলেছেন তিনি।
এই প্রেক্ষাপটে সংবিধান সংস্কারের পর রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য কোথায় দাঁড়াবে- এ প্রশ্নে নয়া দিগন্তের সাথে কথা বলেছেন সিনিয়র আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া ও আহসানুল করিম।
রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী নয়, নির্বাহী ক্ষমতায় লাগাম
ড. শরীফ ভূঁইয়ার মতে, ক্ষমতার ভারসাম্য বলতে সাধারণভাবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্যের কথা বলা হলেও বিষয়টি এত সরল নয়। রাষ্ট্রপতিকে অধিক ক্ষমতা দেয়ার মাধ্যমে ভারসাম্য তৈরি করতে গেলে রাষ্ট্রে দু’টি পৃথক ক্ষমতা কেন্দ্র তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার কমিশনের আলোচনায়ও এ বিষয়টি উঠে এসেছিল। রাষ্ট্রপতিকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্ষমতা দিলে একধরনের ভারসাম্য তৈরি হতে পারে; কিন্তু একই সাথে দু’টি ক্ষমতা কেন্দ্র সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে এ ধরনের ব্যবস্থার নানা সমস্যার উদাহরণ পাওয়া যায়। তাই তার মতে, রাষ্ট্রপতিকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়ার পরিবর্তে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা হ্রাস করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন করা, তাদের ক্ষমতা বাড়ানো এবং নিয়োগ ও অপসারণের প্রক্রিয়ায় স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানকে এমন আইনগত ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে তারা নির্বাহী বিভাগের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি করতে পারে এবং সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন বা অন্য কোনো অনিয়ম করলে স্বাধীনভাবে তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে। তার ভাষায়, নির্বাহী বিভাগের ‘লাগামহীন ক্ষমতা’ রাষ্ট্রের জন্য ভালো নয়।
ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মানবাধিকার কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ গুরুত্ব দেন ড. শরীফ ভূঁইয়া। তার মতে, শুধু সংবিধানে ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা লিখে দিলেই তা বাস্তবায়িত হয় না। কোনো প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন বলা হলেও যদি তাকে কার্যকর ক্ষমতা না দেয়া হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠান নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে পারবে না।
মানবাধিকার কমিশনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগের কমিশনকে অনেকেই ‘দন্তহীন’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমালোচনা করেছেন। কিন্তু নতুন ব্যবস্থাতেও যদি কমিশনকে এমন ক্ষমতা না দেয়া হয়, যাতে সরকার বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান করতে পারে, তাহলে সেটি কিভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করবে; সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
দুদকের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে উল্লেখ করে ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান যদি সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে আনার কথা থাকে, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ ও কার্যক্রমে প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
তার বক্তব্যের সারকথা, ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্ত হলো নির্বাহী বিভাগের বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও স্বাধীন করা।
উচ্চকক্ষও হতে পারে ভারসাম্যের অংশ
সংবিধান সংস্কারের আলোচনায় উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ড. শরীফ ভূঁইয়া। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির সাংবিধানিক কাঠামোর অংশ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তবে তার মূল জোর হলো প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া শুধু নতুন একটি কক্ষ বা রাষ্ট্রপতির অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়ে কাক্সিক্ষত ভারসাম্য নিশ্চিত করা কঠিন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে জুলাই জাতীয় সনদকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিও বিবেচনায় নেয়া হবে। তবে ড. শরীফ ভূঁইয়ার প্রশ্ন, বাস্তব কর্মকাণ্ডে সেই অঙ্গীকারের প্রতিফলন কতটা রয়েছে। তিনি বলেন, মুখে জুলাই সনদ ও নির্বাচনী ইশতেহারের কথা বলা হচ্ছে; কিন্তু এখন পর্যন্ত যেসব আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে নির্বাহী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতা তিনি দেখতে পাচ্ছেন।
মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়কে এর উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় ১১৬ অনুচ্ছেদ
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন ড. শরীফ ভূঁইয়া। তার মতে, অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি বলেন, বিষয়টি শুধু জুলাই সনদের প্রস্তাব নয়; বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ও ৩১ দফাতেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। এ অবস্থায় অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে রাখার বিষয়ে আদালতের যে রায় হয়েছে, সেটিকে চ্যালেঞ্জ করার উদ্যোগের সাথে ঘোষিত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
তার যুক্তি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যদি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির অংশ হয়, তাহলে সেই স্বাধীনতার পক্ষে থাকা বিচারিক সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় আসবে।
বিরোধী দলের কমিটিতে না যাওয়া
সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের অংশ না নেয়ার বিষয়টিকেও ড. শরীফ ভূঁইয়া একেবারে একপাক্ষিকভাবে দেখছেন না। তার মতে, বিরোধী দল চাইলে কমিটিতে গিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারত। তবে তারা হয়তো মনে করছে, যে সংস্কার প্রক্রিয়া তারা সমর্থন করে অর্থাৎ গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত সংস্কার পরিষদ; সেই কাঠামো কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়ার অর্থ সীমিত।
তবে সরকারের দায়িত্ব এখানে বেশি বলে মনে করেন তিনি। কারণ সরকার ক্ষমতায় রয়েছে এবং সংস্কার প্রক্রিয়াকে অংশগ্রহণমূলক করার উদ্যোগ নেয়ার প্রধান দায়িত্বও তাদের।
সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল হওয়ার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন ড. শরীফ ভূঁইয়া। তিনি জানান, পঞ্চদশ সংশোধনীসংক্রান্ত মামলায় তিনি আইনজীবী হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, হাইকোর্টের রায় আপিল বিভাগ বহাল রাখার পর গণভোটের বিধান পুনর্বহাল হয়েছে। ফলে ১৪২ অনুচ্ছেদের আওতায় সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু মৌলিক বিধানে পরিবর্তন আনা হলে গণভোটের প্রয়োজন হতে পারে। তিনি বিশেষভাবে সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং ৪৮, ৫৬ ও ১৪২ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, সংশোধনীতে এসব বিধানের পরিবর্তন থাকলে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের আগে গণভোটের প্রশ্ন আসবে।
‘একটি গণভোটের পর আরেকটি গণভোট কেন?’
তবে এখানেই তিনি বর্তমান সংস্কার প্রক্রিয়ার একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন।
ড. শরীফ ভূঁইয়ার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পূর্ববর্তী গণভোটে জনগণ নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এর পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ অনুমোদন করেছে। সেই ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট সদস্যদের শপথ নিয়ে সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু সেটি হয়নি।
তার মতে, যদি গণভোটে অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী সংস্কার পরিষদ গঠন করে কাজ করা হতো, তাহলে সেই কাঠামোর অধীনে আবার নতুন করে গণভোটের প্রয়োজন হতো না। কিন্তু এখন ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে সংসদীয় প্রক্রিয়ার কারণে তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি সাংবিধানিক জটিলতা হিসেবে দেখছেন। একটি গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত কাঠামো কার্যকর না করে সংসদীয় পদ্ধতিতে সংশোধন করা হলে নির্দিষ্ট সাংবিধানিক বিধান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আবার গণভোটের প্রয়োজন হতে পারে। এ কারণে তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি সাংবিধানিক জটিলতা হিসেবে দেখছেন।
ড. শরীফ ভূঁইয়ার বিশ্লেষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতি। তার মতে, ওই সময় নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগ; রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান অঙ্গই কার্যত বড় ধরনের অকার্যকারিতার মধ্যে পড়ে। এ অবস্থায় রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ক্ষমতার উৎস জনগণের কাছে ফিরে যাওয়ার একটি তাত্ত্বিক প্রশ্ন তৈরি হয়।
তিনি মনে করেন, সংবিধানের মূল মালিক জনগণ। জনগণই সংবিধানের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের কাছে ন্যস্ত করে। কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে যখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর থাকে না, তখন সেই ক্ষমতার উৎস জনগণের কাছে ফিরে যাওয়ার ধারণা সাংবিধানিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে সংস্কারের উদ্যোগ নেয় এবং পরবর্তী গণভোট ছিল জনগণের সেই সাংবিধানিক ক্ষমতার সরাসরি প্রয়োগের একটি দৃষ্টান্ত। এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ড. শরীফ ভূঁইয়ার প্রত্যাশা, আগের গণভোটে জনগণ যে সংস্কার কাঠামো অনুমোদন করেছে, সেটিকেই কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া উচিত।
‘একদলীয়ভাবে নয়, সবাইকে নিয়ে সংস্কার’
সংবিধান সংস্কারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ড. শরীফ ভূঁইয়ার প্রত্যাশা, সরকার এখনো চাইলে একটি কার্যকর সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সব রাজনৈতিক পক্ষকে নিয়ে আলোচনা করতে পারে। তার মতে, একদলীয়ভাবে সংবিধান পরিবর্তন করলে তা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। অতীতের পঞ্চদশ সংশোধনীর অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতা আরো ভিন্ন। ফলে যত বেশি রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার করা যাবে, সেটি তত বেশি টেকসই হওয়ার সুযোগ থাকবে।
অন্য দিকে সিনিয়র অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম মনে করেন- রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। তার মতে, সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সাধারণত সীমিত থাকে; ফলে প্রস্তাবিত সংস্কারে রাষ্ট্রপতি ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে কী ধরনের ভারসাম্য তৈরি করা হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে তিনি মনে করেন নির্বাহী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে কিছু ভারসাম্য থাকলে যেকোনো সরকার কার্যকরভাবে কাজ করতে সুবিধা পেতে পারে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংসদ সদস্যের ভোট দেয়ার সুযোগের প্রশ্নেও তিনি ভারসাম্যের সম্ভাবনা দেখছেন। তার মতে, সংসদ সদস্যদের নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দেয়ার সুযোগের ক্ষেত্রে পরিবর্তন এলে সংসদীয় ব্যবস্থায় নতুন ধরনের ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে সাংবিধানিকভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম। তার মতে, বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা একসময় আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত একটি মডেলে পরিণত হয়েছিল। দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা আবার অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান ভবিষ্যতে কোনো সংসদ যাতে সহজে পরিবর্তন করতে না পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোট বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবকেও তিনি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন।
জুলাই জাতীয় সনদকে সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়ার সরকারি বক্তব্যের বিষয়ে আহসানুল করিম বলেন, সনদে সাংবিধানিক সংস্কারের যেসব বিষয় রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে সংবিধান আরো সুসংহত হতে পারে। তার মতে, সনদের অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়িত হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য তা সহায়ক হবে।
তবে দুই আইনজীবীর বক্তব্যে একটি জায়গায় অভিন্নতা রয়েছে- সংবিধানের লিখিত পরিবর্তনের পাশাপাশি বাস্তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত না হলে শুধু সংশোধনী দিয়ে কাক্সিক্ষত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
সংবিধান সংশোধনের বিল আগামী জানুয়ারিতে সংসদে উঠতে পারে- সরকারের এমন ঘোষণার পর এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো শুধু রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নির্বাহী বিভাগের ওপর বিচার বিভাগ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও স্বাধীন সংস্থাগুলোর কার্যকর নিয়ন্ত্রণও নিশ্চিত করবে। একই সাথে ১৪২ অনুচ্ছেদের আওতায় গণভোটের বিধান কিভাবে প্রয়োগ হবে এবং আগের গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার কাঠামোর সাথে বর্তমান সংসদীয় প্রক্রিয়ার সমন্বয় কিভাবে হবে- সেটিও সামনে থাকছে বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন হিসেবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








