শিক্ষক, সুপারিশ, শিক্ষক নিয়োগ
শিক্ষক। ইন্টারনেট

 

 

* প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে ভেরিফিকেশন নিয়ে প্রশ্ন : পুলিশি তদন্তের পর এনএসআই যাচাই 
* অভিযোগের কারণ জানেন না প্রার্থীরা 
* আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ চান ভুক্তভোগীরা

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তারা। স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ডোপ টেস্ট ও সনদ যাচাইও শেষ হয়েছে। এরপর অপেক্ষা ছিল শুধু নিয়োগপত্রের। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় আট মাসের অপেক্ষার পর নিয়োগপত্র হাতে নিতে গিয়ে জানতে পারেন- তাদের কেউ কেউ আর নিয়োগ পাচ্ছেন না। বাদ পড়ার কারণও জানানো হয়নি অনেককে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫-এর চূড়ান্ত তালিকায় ১৪ হাজার ৩৮৪ জনের নাম থাকলেও নিয়োগপত্র বিতরণ শুরুর পর অন্তত এক হাজারের বেশি প্রার্থী নিয়োগবঞ্চিত হয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। চাকরিপ্রার্থীদের একটি অংশের অভিযোগ, পুলিশ ভেরিফিকেশন  সম্পন্ন হওয়ার পর জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) ভেরিফিকেশনের ভিত্তিতে তাদের নিয়োগ আটকে দেয়া হয়েছে। তবে কোন অভিযোগ, কোন তথ্য বা কোন মানদণ্ডে তাদের বাদ দেয়া হয়েছে- তা তাদের জানানো হয়নি।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত একজন প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়ার আগে একাধিক ধাপে যাচাই-বাছাই করার পরও শেষ মুহূর্তে বাদ দেয়ার ভিত্তি কী? ভেরিফিকেশনে আপত্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়েছে কি না? আর বাদ পড়াদের তালিকা ও কারণই বা কেন প্রকাশ করা হচ্ছে না?
সাত মাসের অপেক্ষার পর নতুন অনিশ্চয়তা
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের প্রথম ধাপের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয় গত ৫ নভেম্বর এবং দ্বিতীয় ধাপের বিজ্ঞপ্তি ১২ নভেম্বর। প্রথম ধাপে ৮ থেকে ২১ নভেম্বর এবং দ্বিতীয় ধাপে ১৪ থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত আবেদন নেয়া হয়।
লিখিত পরীক্ষা প্রথমে ২ জানুয়ারি নেয়ার কথা থাকলেও পরে তা পিছিয়ে ৯ জানুয়ারি করা হয়। ওই দিন পার্বত্য তিন জেলা বাদে দেশের ৬১ জেলায় লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করা হয়।
এরপর গত ৮ ফেব্রুয়ারি জেলাভিত্তিক চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়।
চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর প্রার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ডোপ টেস্ট ও শিক্ষাগত সনদ যাচাইসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। কিন্তু এর পরও নিয়োগপত্র পেতে তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এর মধ্যে পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং সবশেষে এনএসআইয়ের ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
সাত মাসেরও বেশি সময় পর গত বৃহস্পতিবার থেকে নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলে নতুন করে সামনে আসে বাদ পড়ার বিষয়টি।
‘কারণ না জানিয়েই বাদ’
ভুক্তভোগী চাকরিপ্রার্থীদের কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকেই লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সফল হওয়ার পর নিয়োগের ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন। সরকারি বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়ার পরও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় তারা এখন কারণ জানতে চাইছেন।
প্রার্থীদের অভিযোগ, ভেরিফিকেশনে কোনো আপত্তি থাকলে সেটি তাদের জানানো হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা, জিডি বা আইনগত অভিযোগ রয়েছে কি না- সেটিও তারা জানতে পারেননি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও বাদ পড়া প্রত্যেক প্রার্থীর বিষয়ে পৃথক কারণ প্রকাশ করেনি।
এখানেই নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
২৭ জেলায় ৭৭৮ জনের দাবি
চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের পক্ষ থেকে শুক্রবার দেয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, ২৭ জেলায় অন্তত ৭৭৮ জন চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তাদের পক্ষ থেকে প্রায় এক হাজার ২০০ প্রার্থীর নিয়োগপত্র ইস্যু না করার কথাও বলা হয়েছে।
প্রার্থীরা বলছেন, চূড়ান্ত তালিকায় নাম থাকার পরও যদি প্রশাসনিক বা নিরাপত্তাজনিত কারণে কাউকে নিয়োগ না দেয়া হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের কারণ জানার সুযোগ থাকতে হবে। একই সাথে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কোনো প্রার্থী বাদ পড়ে থাকলে তা সংশোধনের ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।
তাদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া প্রত্যেক প্রার্থীর নথি আবার নিরপেক্ষভাবে যাচাই, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, প্রশাসনিক আপিলের ব্যবস্থা, ভুল সংশোধন এবং চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত অথচ নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের বিষয়ে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পদক্ষেপ নেয়া।
রাজনৈতিক বিতর্কেও ভেরিফিকেশন
নিয়োগপত্র বিতরণ শুরুর পর বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম শুক্রবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে অভিযোগ করেন, গোয়েন্দা সংস্থার ভেরিফিকেশনের নামে অন্তত এক হাজার মেধাবী প্রার্থীকে নিয়োগবঞ্চিত করা হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, লিখিত ও অন্যান্য ধাপের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও প্রার্থীদের আট মাস ধরে ভেরিফিকেশনের নামে অনিশ্চয়তা ও হয়রানির মধ্যে রাখা হয়েছে। বাদ পড়া অধিকাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে থানায় কোনো মামলা বা জিডির তথ্য না থাকার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।
তার দাবি, সুনির্দিষ্ট আইনসম্মত অভিযোগ না থাকলে নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং ভেরিফিকেশনের মানদণ্ড জনসমক্ষে স্পষ্ট করতে হবে।
ঢাবিতে মানববন্ধন
এ ঘটনায় শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে মানববন্ধন করে জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। সেখানে পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানানো হয়।
সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক রাইয়ান ফেরদৌস অভিযোগ করেন, কোনো অপরাধে সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও ভেরিফিকেশনের নামে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে।
সভাপতি হাসিব আল ইসলাম বাদ পড়া প্রার্থীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানান। দাবি আদায় না হলে আন্দোলনেরও হুঁশিয়ারি দেন তারা।
জামায়াতের প্রশ্ন
চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েও অনেক প্রার্থী নিয়োগপত্র না পাওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে দাবি করেন, ২৭ জেলায় অন্তত ৭৭৮ জন চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি। একই সঙ্গে ভেরিফিকেশনের নামে অনেককে বাদ দেয়ার অভিযোগও রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তার প্রশ্ন- চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের মধ্যে কারা বাদ পড়েছেন, কেন বাদ পড়েছেন এবং কোন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে তাদের বাদ দেয়া হয়েছে, তা প্রকাশ করা প্রয়োজন।
সরকারের বক্তব্য ভিন্ন
অন্য দিকে সরকার বলছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ভেরিফিকেশন বা ভেটিং একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। এ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
শনিবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে তিনি জানান, ১ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে কেউ নিয়োগপত্র না পেয়ে থাকলে বিষয়টি যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র দেয়া হবে।
অর্থাৎ সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়োগপত্র না পাওয়া মানেই চূড়ান্তভাবে চাকরি থেকে বাদ পড়া নয়; বিষয়টি যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে থাকতে পারে।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলছে না
সরকারি নিয়োগে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ভেরিফিকেশন কেন প্রয়োজন- এ নিয়ে মূলত কোনো বিতর্ক নেই। প্রশ্নটি অন্য জায়গায়- এই যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক?
চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর একজন প্রার্থীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ডোপ টেস্ট, সনদ যাচাই এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হওয়ার পরও যদি নতুন কোনো গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাকে বাদ দেয়া হয়, তাহলে সেই প্রতিবেদনের প্রকৃতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে জানানোর কোনো ব্যবস্থা আছে কি না- তা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- ভেরিফিকেশনে ভুল তথ্য থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ কী? কোনো প্রার্থীকে বাদ দেয়ার আগে তার বক্তব্য নেয়া হয় কি না? একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিরূপ তথ্যের বিপরীতে প্রার্থী কিভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করবেন? এবং পুরো প্রক্রিয়ার ওপর কোনো স্বাধীন প্রশাসনিক পর্যালোচনার ব্যবস্থা রয়েছে কি না?
‘গোপনীয়তা’ বনাম ‘ন্যায্য প্রক্রিয়া’
নিরাপত্তা যাচাইয়ের কিছু তথ্য স্বাভাবিকভাবেই গোপনীয় হতে পারে। কিন্তু নিয়োগপ্রার্থীকে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত রেখে তার চাকরি বাতিল বা আটকে দেয়া হলে প্রশাসনিক ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে- বিশেষ করে যখন তিনি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সব ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তা যাচাইয়ের গোপনীয়তা বজায় রেখেও একটি ন্যূনতম প্রশাসনিক প্রতিকারব্যবস্থা রাখা সম্ভব। যেমন- বাদ দেয়ার সাধারণ কারণ জানানো, ভুল তথ্য সংশোধনের সুযোগ দেয়া, আপিল বা পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা রাখা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব স্পষ্ট করা।
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের এই ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত কতজন প্রার্থীর নিয়োগ আটকে আছে এবং তাদের কতজনকে পুনর্বিবেচনার পর নিয়োগ দেয়া হবে- তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। একই সাথে বাদ পড়া প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ভেরিফিকেশনে ঠিক কী ধরনের আপত্তি পাওয়া গেছে, তারও বিস্তারিত সরকারি তালিকা প্রকাশিত হয়নি।
ফলে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় নতুন করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এক দিকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যাচাইয়ের অধিকার, অন্য দিকে একজন পরীক্ষার্থীর ন্যায্য প্রক্রিয়া ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার- এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কোথায় থাকবে, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের সাম্প্রতিক ঘটনাই এখন সেই প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।