দুবাই, শ্রমবাজার, কুয়েত, প্রবাসী, বাংলাদেশী
খুলছে না দুবাইয়ের শ্রমবাজার। নয়া দিগন্ত

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইয়ের সাথে ইরানের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরই স্বপ্নের দেশ শুধু দুবাই থেকেই ছয় লাখ ভারতীয় ব্যবসায়ী পরিবার নিয়ে দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। ফলে সেখানকার ব্যবসাবাণিজ্যে পুরো স্থবিরতা নেমে এসেছিল। সেই দুবাই শহরই এখন অনেকটা ‘নিরাপদ’ হওয়ার কারণে মানুষের চলাফেরা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। ব্যবসাবাণিজ্যে গতি এসেছে। ভারতে ফেরত যাওয়া ব্যবসায়ীরাও তাদের ব্যবসা চালু করতে ফিরতে শুরু করেছেন। এর সাথে এখন হাজার হাজার বিদেশী পর্যটকও আসছেন। ড্রোন-মিসাইল হামলার মতো আতঙ্ক আর নেই বললেই চলে! তবে বাংলাদেশের বন্ধ শ্রমবাজারটি দীর্ঘদিন না খোলার পেছনে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের লোকজনের পালিয়ে আসাসহ অবৈধ বাংলাদেশীদের জালজালিয়াতি আর নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডই দায়ী বলে মনে করছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশী ব্যবসায়ীসহ নানা পেশার মানুষ।  
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে দুবাই বুর্জ আল খলিফার পাশে বিজনেস বে নামক হোটেলে অবস্থান করা প্রবাসী বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ও ইফরাজ গুডস্ হোলসেলার এলএলসির স্বত্বাধিকারী আরাফাত রহমান এভাবেই দুবাইয়ের সার্বিক পরিস্থিতির কথা নয়া দিগন্তের কাছে তুলে ধরেন। 
আরাফাত রহমান সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রদেশ দুবাই, আজমান ছাড়াও সৌদি আরব, বাহরাইন ও কাতারসহ মধ্যেপ্রাচ্যের দেশগুলোতে চলমান যুদ্ধের বিষয়ে বলেন, আমি শুধু দুবাইয়ে ব্যবসা করি না, সৌদি আরবসহ মিডলইস্টের আরো কয়েকটি দেশেই আমার ব্যবসা রয়েছে। কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, আমিরাত এবং দুবাইয়ে নতুন করে হামলা শুরু হওয়ার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইউএই সরকার শুনেছি সবকিছু ম্যানেজ করে ফেলেছে। কাতার, দুবাইয়ে আর কোনো বোমা পড়বে না! সমঝোতা হওয়ায় এখন দুবাইয়ের ব্যবসাবাণিজ্য আবারো চাঙ্গা হচ্ছে। ট্যুরিস্টরাও আসছে। তিনি বলেন, আবুধাবিতে যখন বোমা হামলা শুরু হয়েছিল তখন দুবাইয়ের ছয় থেকে সাড়ে ছয় লাখ ব্যবসায়ী ভয়ে ইন্ডিয়া পালিয়ে গিয়েছিলেন। এতে ব্যবসাবাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছিল। এখন ওই ব্যবসায়ীরাই তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, কোম্পানি খুলতে আবার আসতে শুরু করেছেন। তাই এখানকার নানা ধরনের ব্যবসাবাণিজ্য আবার চাঙ্গা হতে শুরু করেছে। 
এই মুহূর্তে বাংলাদেশীরা কেমন আছেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ইউএই সরকার পাকিস্তান এবং বাংলাদেশীদের ওপর খুবই বিরক্ত। তবে সবাই না। ফ্যাসিস্ট সরকারের অনেক লোকজনই ওই সময় পালিয়ে দুবাই চলে এসেছিল। এ ছাড়া কর্মী ভিসায় (ফ্রি) যারা এসেছে তাদের মধ্যে থেকে শতকরা ২৫-৩০ ভাগ লোকজনই এসে ক্রাইমের সাথে জড়িয়ে পড়েছে। মহিলা এনে নাচগান করায়, নেশা করে। এ ছাড়া নিজেরা মারামারি করে, ভিসা জালিয়াতি করে। বৈধভাবে এসে ওভারস্টে হওয়াসহ নানা ধরনের অপরাধে বাংলাদেশীরা জড়িয়ে পড়ে। মূলত তাদের কারণেই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারটি ইউএই সরকার এখনো বন্ধ করে রেখেছে। শুধু শ্রমবাজার নয়, তারা বিরক্ত হয়ে ট্যুরিস্ট ভিসাও আমাদেরকে এখন দিচ্ছে না। উপরন্তু যারা দুবাই থেকে বের হচ্ছে তাদের ভিসা অটো ক্যানসেল করে দিচ্ছে। শুধু দুবাই নয়, আওয়ামী লীগের লোকজনের অকারেন্সের কারণে দুবাই প্রবাসী বৈধ বাংলাদেশীদেরও অনেক ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে আবুধাবিতে প্রকৃত শ্রমিকরা অনেক ভালো আছে। এখন অ্যাম্বেসির উচিত ইউএই সরকারের সাথে শ্রমবাজার খোলা নিয়ে অনুরোধ করা। এর জন্য বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকেও এসব দেশে এসে বৈঠক করা উচিত। 
শুধু ইউএই নয়, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতারসহ বন্ধ অন্য দেশের শ্রমবাজারগুলো খুলতে ওই দেশের শীর্ষ নেতাদের সাথে বৈঠক করা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে তিনি মনে করেন। নতুবা মধ্যপ্রাচ্যে থাকা আমাদের শ্রমবাজার ক্ষতির মুখে পড়বে। এক প্রশ্নের উত্তরে ব্যবসায়ী আরাফাত রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, দুবাইয়ে ব্যবসা চাঙ্গা হলে তখন দেশে রেমিট্যান্স যাওয়ার হার কমে। তিনি বলেন, ইদানীং ঢাকার বায়তুল মোকাররম, চকবাজার, নিউ মার্কেট, বাদামতলী ও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকা থেকে এখানে ইমপোর্ট এর সংখ্যা বেড়েছে। এর ফলে হুন্ডিও বেড়েছে। ইমপোর্ট বাড়লে হুন্ডি বেড়ে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পেতে আমাদের যে ভোগান্তি পোহাতে হয় সেটি হুন্ডি বা বিকাশে পাঠালে হয় না। মানুষ চায় দ্রুত টাকা পেতে। যার কারণে বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠানোর চাইতে অনেকে হুন্ডিতে টাকা পাঠাতে পছন্দ করে। তবে সরকার ব্যাংকিং চ্যানেলে আরো ভালো সেবা দিতে পারলে তখন হুন্ডিতে না পাঠিয়ে বৈধপথে টাকা পাঠানোর হার বাড়বে।  
এ দিকে মধ্যেপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি যে ক’টি দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারমধ্যে কুয়েত অন্যতম। এই দেশটিতে চার লাখের মতো বাংলাদেশী শ্রমিক রয়েছে। যুদ্ধের প্রভাব ও কুয়েত সরকারের নতুন আইন করার কারণে অনেক শ্রমিক এখন কন্সট্রাকশনসহ অন্যান্য সেক্টরে কাজ না পেয়ে বেকার হয়ে পড়েছে। যারা বৈধভাবে এক কোম্পানিতে কাজ করছে তাদের কাউকে অন্য কোম্পানিতে পাওয়া গেলে সাথে সাথে পুলিশ আটক করে জেলে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এ নিয়ে কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এর ফলে কর্মীদের ইনকামও কমছে বলে জানিয়েছে তারা। 
গতকাল কুয়েত থেকে মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা যারা কুয়েতে আছি তারা ভালো নেই। অনেক শ্রমিক ইতোমধ্যে বেকার হয়ে পড়েছে। হঠাৎ রেমিট্যান্স কমার কারণ কী জানতে চাইলে তিনি অবশ্য বলেন, কুয়েতের কোম্পানিগুলো প্রতি মাসের ১৭-১৮ তারিখে কর্মীদের বেতন দিয়ে থাকে। এর ফলে টাকা কম গেছে এই সময়। আগামী সপ্তাহ থেকে কর্মীরা বেতন পাবে। তখন বৈধভাবে দেশে রেমিট্যান্স যাওয়া আবার শুরু হবে। তবে অনেকের এখন কাজই নেই। তারা টাকা পাঠাবে কিভাবে? এর মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ। বাংলাদেশী শ্রমিক জনি বলেন, আমাদের দিনকাল খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। তার মতে, প্রবাসীদের ইনকাম কমে গেছে; কিন্তু ব্যয় বেড়েছে। তাই দেশে টাকা পাঠাতে হিমশিম খাচ্ছি। তার দাবি আমি আগে পরিবারের কাছে ৪০ হাজার টাকা পাঠাতাম; কিন্তু এখন ২০ হাজারের বেশি টাকা পাঠাতে কষ্ট হয়। এর মধ্যে কখন কোথায় বোমা এসে পড়ে তা নিয়ে প্রতি মুহূর্তে থাকি দুশ্চিন্তায়।