
* ২ মাসে উচ্চমূল্যের ৩০ কেজি কুশ উদ্ধার
*৪ ভারতীয় গ্রেফতার সহযোগীদের সন্ধানে গোয়েন্দারা
ভারতে মাদক পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। শুধু সীমান্ত নয়, এখন নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা বিমানবন্দরও মাদক কারবারিদের নিয়ন্ত্রণে। সম্প্রতি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উচ্চমূল্যের মাদক ‘কুশ’সহ একাধিক ভারতীয় নাগরিক আটক হওয়ার একাধিক ঘটনা উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এসব ঘটনায় একই ধরনের রুট ও কৌশলের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে।
ব্যাংকক থেকে থাই এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে ঢাকায় আসা ভারতীয় নাগরিকদের কাছ থেকে পরপর কুশ উদ্ধারের ঘটনায় বিমানবন্দরকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক পাচার নেটওয়ার্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশে মাদক পাচারের ক্ষেত্রে সীমান্তপথ দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাম্প্রতিক বিমানবন্দরকেন্দ্রিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, আন্তর্জাতিক আকাশপথও পাচারকারীদের নজরে রয়েছে।
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই ও আগস্টে শাহজালাল বিমানবন্দরে থাইল্যান্ড থেকে আসা ভারতীয় নাগরিকদের কাছ থেকে একাধিক চালানে প্রায় ৩০ কেজি কুশ জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪ জুলাই এক ভারতীয় নাগরিকের কাছ থেকে ১১ কেজি ৮০০ গ্রাম কুশ উদ্ধার করা হয়। জুলাই-আগস্টে ধারাবাহিক এসব ঘটনায় একাধিক ভারতীয় নাগরিক গ্রেফতার হন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, গত ২৪ ও ২৭ আগস্ট মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে পৃথক দুই অভিযানে ১০ কেজি ৫৬০ গ্রাম কুশ উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে চার ভারতীয় নাগরিককে। উভয় ঘটনাতেই তারা ব্যাংকক থেকে থাই এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে ঢাকায় আসেন।
ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, ২৪ আগস্ট ব্যাংকক থেকে আসা থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটের দুই যাত্রীকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। তাদের ট্র্যাভেল ট্রলিতে কাপড়ের নিচে লুকানো অবস্থায় পাঁচ কেজি ৪০ গ্রাম কুশ পাওয়া যায়। একই সাথে তিন লিটার বিদেশী মদ ও ২৪টি ভারতীয় শাড়িও জব্দ করা হয়। এর মাত্র তিন দিন পর, ২৭ আগস্ট একই বিমানবন্দরে একই ধরনের অভিযানে ব্যাংকক থেকে আসা অপর একটি ফ্লাইটে আরো দুই ভারতীয় নাগরিককে আটক করা হয়। তাদের ট্রলিতে কাপড়ের নিচে লুকানো অবস্থায় পাওয়া যায় পাঁচ কেজি ১২০ গ্রাম কুশ। এর আগে ২২ আগস্টও ব্যাংকক থেকে থাই এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে আসা এক ভারতীয় নাগরিকের কাছ থেকে তিন কেজি কুশ উদ্ধার করা হয়েছিল। আরো আগে ১৮ আগস্ট শাহজালাল বিমানবন্দরে চার কেজি ১৮০ গ্রাম কুশ উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় দুই ভারতীয় নাগরিক তাদের ট্রলি ও পাসপোর্টের ফটোকপি রেখে পালিয়ে যান। পরে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
অর্থাৎ আগস্টের মাঝামাঝি থেকে বিমানবন্দরে কুশের একের পর এক চালান ধরা পড়ছে। কোনো কোনো ঘটনায় বাহক গ্রেফতার হলেও অন্তত একটি ঘটনায় সন্দেহভাজনরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এসব ঘটনার যোগসূত্র অনুসন্ধান করে পাচারকারীদের মূল নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
প্রশ্ন উঠেছে; শুধু বাহক গ্রেফতার করলেই কুশের এই প্রবাহ বন্ধ হবে কি, যাত্রী নিজ উদ্যোগে এত বড় চালান বহন করছেন, নাকি তার পেছনে আন্তর্জাতিক কোনো নেটওয়ার্ক কাজ করছে, তা তদন্তের বিষয়।
ডিএনসি বলছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে অধিক মূল্যের এই মাদক থাইল্যান্ড থেকে ভারতে পাচার করা হচ্ছে। কিন্তু তারা নিরাপদ রুট হিসাবে বাংলাদেশের হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে বেছে নিয়েছে। কারণ এখানে কোন চক্র এই মাদক কারবারিদের হয়ে কাজ করছে এবং মাদক পাচারে বিভিন্ন সহযোগিতা করছে। যার কারণে ভারতের মাদক কারবারিরা এই রুটকে বেছে নিয়েছে। কিন্তু বিমানবন্দরে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার গোয়েন্দা তথ্যে মাদকের তথ্য উঠে আসায় চালানগুলো জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। হতে পারে এমন অনেক চালান বিনা বাধায় পাচার হয়ে গেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ডেপুটি ডিরেক্টর (ঢাকা মেট্রো উত্তর) রাজিউর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশে কুশ মাদকের ব্যবহার এখনো বিস্তৃতি লাভ করেনি। এটি মূলত ভারতে পাচার করার জন্য থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা হয়েছিল। ভারতের মাদক কারবারিরা বাংলাদেশের বিমানবন্দরকে পাচারের রুট হিসাবে ব্যবহার করেছে। এসব ঘটনায় গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। দেশের কাদের সহযোগিতায় তারা মাদকগুলো সহজে পাচারের চেষ্টা চালাচ্ছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সাথে জড়িতদের ধরতে দুই দেশের দূতাবাসগুলোকে চিঠি দেয়ার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।








