
আমিনুল ইসলাম গোপালগঞ্জ থেকে ফিরে
* নির্ধারিত সময়ে ছাড়ে না ট্রেন
* কাক্সিক্ষত স্টেশনে না থামায় ভোগান্তি
* কর্মজীবীদের সময়ের সাথে মিলছে না শিডিউল
* নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন
টিকিটের মূল্য তুলনামূলক কম। ঢাকা-গোপালগঞ্জ সরাসরি যাতায়াতের সুযোগও রয়েছে। পদ্মা সেতু হয়ে রাজধানীর সাথে রেল যোগাযোগের কারণে স্বল্প খরচে ও তুলনামূলক নিরাপদে ঢাকায় যাতায়াতের স্বপ্ন দেখেছিলেন গোপালগঞ্জ ও আশপাশের জেলার মানুষ। বিশেষ করে কর্মজীবীদের অনেকেই আশা করেছিলেন- সকালে বাড়ি থেকে ট্রেনে উঠে ঢাকায় অফিস করবেন, আবার অফিস শেষে ট্রেনেই বাড়ি ফিরবেন; কিন্তু সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না ‘অভিযাত্রী’ কমিউটার ট্রেন।
নানা অব্যবস্থাপনায় এ ট্রেন থেকে ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন যাত্রীরা। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে এক থেকে দেড় ঘণ্টা বিলম্বে ট্রেন ছাড়ার অভিযোগ, কর্মজীবীদের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সময়সূচি, টিকিটে আসন নম্বর না থাকা, কাক্সিক্ষত স্টেশনে যাত্রাবিরতি না দেয়া, স্টেশন ও ট্রেনের ভেতরে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা এবং পুরনো বগিতে দীর্ঘ সময় বসে থাকাসহ নানা সমস্যায় ক্ষুব্ধ তারা। প্রথমবার ভ্রমণ করেই দ্বিতীয়বার এ ট্রেনে উঠতে চান না- এমন যাত্রীর সংখ্যাও কম নয়। যাত্রীদের মতে, সম্ভাবনাময় এ ট্রেনকে সময়োপযোগী ও যাত্রীবান্ধব করা গেলে গোপালগঞ্জসহ আশপাশের জেলার মানুষের ঢাকামুখী চাপ কমানোর পাশাপাশি রাজধানীর ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা
ঢাকা থেকে প্রতিদিন বেলা সাড়ে ৩টায় গোপালগঞ্জের উদ্দেশে ‘অভিযাত্রী’ কমিউটার ট্রেন ছাড়ার কথা থাকলেও প্রায়ই এক থেকে দেড় ঘণ্টা দেরিতে ট্রেন ছাড়ছে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ট্রেনটির সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে গোপালগঞ্জে পৌঁছানোর কথা; কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার দিকে সেখানে পৌঁছায়। ফলে গোপালগঞ্জ থেকে সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে ট্রেন ছাড়ার কথা থাকলেও সেটি রাত ৯টা থেকে সোয়া ৯টার দিকে ছাড়তে হয়। এর প্রভাব পড়ে ঢাকায় ফেরার সময়েও। রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা থাকলেও কখনো কখনো রাত ১২টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়। ফলে কর্মজীবী, শিক্ষার্থী, নারী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যাতায়াতকারী যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ে। যেখানে বাসে গেলে সময় লাগে সর্বোচ্চ আড়াই ঘণ্টা।
গত রোববার সরেজমিন কমলাপুর রেলস্টেশনের ৭ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ‘অভিযাত্রী’ ট্রেনের অপেক্ষায় শত শত যাত্রীকে দেখা যায়। তাদের অধিকাংশই ছিলেন প্রথমবারের যাত্রী। মাত্র কয়েকজনকে পাওয়া যায়, যারা এর আগে এ ট্রেনে ভ্রমণ করেছেন। বেলা সাড়ে ৩টা পেরিয়ে গেলেও ট্রেনের দেখা মেলেনি। ১০ মিনিট, ৩০ মিনিট এবং এক ঘণ্টা পেরিয়ে যায়। ট্রেন না আসায় যাত্রীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দেয়। অবশেষে নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা ১৫ মিনিট পর প্ল্যাটফর্মে আসে কাক্সিক্ষত ‘অভিযাত্রী’।
ট্রেন আসার সাথে সাঙ্গেথই শুরু হয় ভয়াবহ হুড়োহুড়ি। কে আগে ট্রেনে উঠবেন, কে আগে আসন পাবেন- এ নিয়ে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। নারী ও শিশুদের ধাক্কা দিয়ে অনেককে ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করতে দেখা যায়। যাত্রীদের ভাষ্য, ট্রেনটিতে আসন নম্বর দেয়া হয় না। ফলে আগে উঠতে পারলেই পছন্দমতো আসন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর এ কারণেই ট্রেনে ওঠার সময় এমন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন বৃদ্ধ, নারী ও শিশুরা।
নুর আলম নামে এক যাত্রী বলেন, টিকিটে নির্ধারিত আসন নম্বর না থাকায় ট্রেনে উঠে পছন্দমতো আসন খুঁজে নিতে হয়। ফলে অনেকসময় পরিবারের সদস্যরা পাশাপাশি বসার সুযোগ পান না। শিশু, নারী ও অসুস্থ যাত্রীদের জন্য বিষয়টি আরো কষ্টকর হয়ে ওঠে। তিনি ট্রেনের সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করে নির্ধারিত সময়ে চলাচল নিশ্চিত করার পাশাপাশি টিকিটে আসন নম্বর উল্লেখ এবং আসন বণ্টনে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান।
পদ্মা সেতু পার হলেই কিশোরদের দৌরাত্ম্য
যাত্রীদের অভিযোগ- ট্রেন ছাড়ার পর কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও কিছু সময় পর শুরু হয় কিশোর বয়সী টিকটকার ও ইউটিউবারদের উৎপাত। বিশেষ করে পদ্মা সেতু পার হওয়ার পর বিভিন্ন স্টেশন থেকে দল বেঁধে ট্রেনে উঠতে থাকে কিশোর-তরুণরা। যাত্রীদের অভিযোগ, কোনো নিয়মনীতি না মেনে তারা এক বগি থেকে অন্য বগিতে ছুটে বেড়ায়। অনেকসময় যাত্রীদের শরীরের ওপর দিয়েই চলাচল করে। দরজার কাছে ভিড় করে ছবি তোলা ও ভিডিও করার পাশাপাশি ধূমপানেও ব্যস্ত থাকে তারা। এতে নারী যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। অনেক নারী ওয়াশরুম পর্যন্ত যেতে পারেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। অপরিচিত লোকজনের ভিড়ে ব্যাগ বা অন্য মালামাল টান দিয়ে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে বলে জানান যাত্রীরা।
কাশিয়ানির পর যাত্রাবিরতি নেই
পাইককান্দির বাসিন্দা রিয়াজুল বলেন, কাশিয়ানির পর আর কোনো স্টেশনে ট্রেন না থামায় তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। গোপালগঞ্জ গিয়ে আবার বাস বা অন্য কোনো যানবাহনে করে সাত-আট কিলোমিটার পেছনে আসতে হয়। আবার কাশিয়ানি নামলেও অনেকটা পথ বাসে যেতে হয়। তার মতে, যাত্রীদের প্রয়োজন বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোতে ট্রেনের যাত্রাবিরতি দেয়া হলে এ রুটের মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।
কর্মজীবীদের সময়ের সাথে মিলছে না
গোপালগঞ্জ ও আশপাশের জেলার কর্মজীবীদের একটি বড় অংশের প্রত্যাশা ছিল, ‘অভিযাত্রী’ ট্রেনের মাধ্যমে প্রতিদিন ঢাকায় যাতায়াত করা সম্ভব হবে। এতে ঢাকায় থাকার প্রয়োজন কমবে এবং রাজধানীতে আবাসন ও পরিবহনের ওপর চাপও কমবে; কিন্তু যাত্রীদের অভিযোগ, বর্তমান সময়সূচি তাদের অফিস সময়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার ওপর নির্ধারিত সময়ের বাইরে ট্রেন চলাচল করায় অফিসগামী মানুষের জন্য এ ট্রেনকে নিয়মিত যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ছে। যাত্রীদের মতে, সময়সূচি এমনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে সকালে ঢাকায় অফিসে পৌঁছানো এবং বিকেলে অফিস শেষে ট্রেনে বাড়ি ফেরা সম্ভব হয়। একই সাথে ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
গোপালগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের কর্মকর্তারা জানান, গোপালগঞ্জ স্টেশন থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ হাজার টাকার টিকিট বিক্রি হচ্ছে। তবে বর্তমানে প্রতিদিন সব আসন পূর্ণ হচ্ছে না। তাদের মতে, ‘অভিযাত্রী’ কমিউটার ট্রেনের যাত্রীসেবার মান আরো উন্নত করা গেলে যাত্রীসংখ্যা এবং আয়- দু’টিই আরো বাড়তে পারে।
সম্ভাবনা কাজে লাগানোর দাবি
ঢাকা-গোপালগঞ্জ সরাসরি রেল যোগাযোগ চালুর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের একটি প্রত্যাশা পূরণ হলেও অব্যবস্থাপনার কারণে সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে মনে করছেন যাত্রীরা। তাদের দাবি, নির্ধারিত সময়ে ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করা, কর্মজীবীদের সুবিধাজনক সময়সূচি নির্ধারণ, টিকিটে আসন নম্বর সংযোজন, আসন বণ্টনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, প্রয়োজনীয় স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়া, যাত্রীবান্ধব বগি নিশ্চিত করা এবং ট্রেন ও স্টেশনে নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন। যাত্রীদের মতে, এসব ব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে ‘অভিযাত্রী’ শুধু গোপালগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের বাহনই হবে না; একই সাথে গোপালগঞ্জ ও আশপাশের জেলার বিপুলসংখ্যক কর্মজীবী মানুষের ঢাকায় দৈনিক যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করে রাজধানীর ওপর বাড়তি চাপ কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।








