
দাসপ্রথা নেই। তবু পৃথিবীতে দাস আছে। তাদের জড়িয়ে রাখা হয়েছে আশার শেকলে। এই দাসদের বলা যায় ‘শ্রমদাস’। এরা পাচারের শিকার, আশার শেকলে বন্দী। আশায় বন্দী হয়ে পাচারকারীদের পাল্লায় পড়েন তারা। শেকলে জড়িয়ে যাওয়া এই তরুণদের কেউ নেহায়েত দরিদ্র, ভিটেমাটি ছাড়া অন্য কিছু নেই তাদের। কারো হয়তো সহায় আছে, সম্বল আছে। কিন্তু হাতে কোনো কাজ নেই। অথবা কাজের দক্ষতা নেই। সকাল-বিকেল কাজের খোঁজে ঘোরেন তারা। সন্ধ্যায় ঘরে ফেরেন হতাশা নিয়ে। তাদের সামনে যদি একটি কাজের সুযোগ আসে, অথবা উন্নত জীবনের আশা তুলে ধরা হয়, তাহলে এই আশায় মজে যাওয়াটা স্বাভাবিক।
যার ভিটে আছে কিন্তু জমি নেই, উন্নত জীবনের আশায় তিনি এই ভিটেটাও বিক্রি করেন। যার জমি আছে, তারা সেগুলো বিক্রি করেন। তুলে দেন ‘দালাল’দের হাতে। দালালরা যা বলেন, বিদেশের মাটিতে ভালো কাজ জোগাড় করে রেখেছেন তারা, বেতন অনেক।
একরকম কথা দিয়ে শুরু হয়। কিছু টাকা বাগিয়ে নেয়ার পর কথা পাল্টে যায়, আয়-ইনকাম বেশি করতে চাইলে ঝুঁকিও নিতে হবে বেশি। একটু ঝুঁকি নিতে পারলে ইউরোপের কোনো দেশে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা যাবে। একবার ইউরোপ যাওয়া মানে আগামী ‘তিন পুরুষের’ গতি হয়ে যাওয়া। ইউরোপ যেতে হলে অনেক টাকার দরকার হয়। তবে কম টাকায় পাঠানোর একটি ব্যবস্থাও আছে তাদের হাতে।
কম টাকায় সেই ‘ব্যবস্থা’টিই হলো ফাঁদ। বলা হয়— ভূমধ্যসাগরের ফুরফুরে বাতাসে কাঠের নৌকায় করে ভাসতে হবে তাদের। তারপর এক পলকে ‘স্বপ্নের ইউরোপ’। এই ‘ফুরফুরে বাতাস’ যে কতটা ফুরফুরে সেটি এখন অজানা নেই। ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপ যেতে চাওয়াদের যে কী হাল হয়, সেটিও তারা জানেন। তারপরও পিছপা হন না। তারা ঝুঁকি নিতে চান!
কারণ ‘বাইচান্স’ যদি লেগে যায় কপালে। অনেকে তো পৌঁছে। সেটিই আশার কথা, ভরসার কথা। বাইচান্স যদি ইউরোপে ঢুকে যেতে পারেন, তাহলেই ‘তিন পুরুষ’-এর ভাগ্য নিশ্চিন্ত। ভূমধ্যসাগরে ভাসতে ভাসতে ইউরোপ পৌঁছেছেন, এমন লোক একেবারে কম নয়। তারা সেখানে গিয়ে ভালো আছেন, টাকাপয়সা ইনকাম করছেন। পরিবার-পরিজনকে ভালো রাখছেন। এ কারণেই ‘বাইচান্স’ এর আশা জেঁকে বসে তাদের ঘাড়ে। এই আশাকেই পুঁজি করে নিচ্ছে প্রতারক ও পাচারকারী চক্র।
কয়েক দিন আগে একটি সংবাদ সম্মেলন করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। এতে জানানো হয়েছে ভয়াবহ তথ্য। নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতে হবে বলে সম্প্রতি ৩০ জনকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিল প্রতারক চক্র। এদের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে। পঙ্গু অবস্থায় ফিরে এসেছেন একজন। ২১ বছর বয়সী এই তরুণের নাম রাজন। ফিরে আসা রাজনের বাবার দায়ের করা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বের করে এনেছে এসআরবি। রাশিয়ায় নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ দেয়ার কথা বলে রাজনের কাছ থেকে নেয়া হয় সোয়া আট লাখ টাকা। রাশিয়ায় পৌঁছার পর রাজনসহ ৩০ জনকে তুলে দেয়া হয় ওই দেশের সেনাবাহিনীর হাতে। তাদেরকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয় ২১ দিন। তারপর সরাসরি পাঠিয়ে দেয়া হয় ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সামনের সারিতে। ওখানে তাদেরকে ব্যবহার করা হয়েছিল টোপ হিসেবে, ইউক্রেন বাহিনীর অবস্থান শনাক্ত করতে। ইউক্রেনের ড্রোন উড়ে এসে আঘাত করে তাদের। আঘাতে দুই পাসহ কোমরের নিচের অংশ অবশ হয়ে যায় রাজনের। ওয়াকিটকিতে রাশিয়ান আর্মির সাহায্য চান তিনি। কিন্তু তাকে উদ্ধার করতে আসেনি কেউ। কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করে বুকে ভর দিয়ে জখমে অচল দুই পা টেনে এগিয়ে যান। চার দিনে চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রুশ সেনা ক্যাম্পে পৌঁছান। ওই চার দিনে একফোঁটা পানিও খেতে পাননি তিনি। ক্যাম্পে পৌঁছার পর চিকিৎসা পাননি। অস্ত্র ও ব্যাগ ফেলে আসায় তাকে মারধর করা হয়। মারধর শেষে ক্যাম্পের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে আহত অবস্থায় পালিয়ে যান। দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফিরে আসেন ২৩ আগস্ট।
এমন ঘটনা এবারই যে প্রথম এমন নয়। রাশিয়ায় গিয়ে বাংলাদেশীদের যুদ্ধ করার খবর পাওয়া যাচ্ছে কয়েক বছর থেকে। রণক্ষেত্র থেকে কেউ কেউ লাইভ ভিডিও করে ছেড়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বাংলাদেশী একজন রীতিমতো ‘ওয়ার ব্লগার’ হিসেবে পরিচিতিও পেয়ে গেছেন। তার ব্লগেই দেখা গেছে লাশের স্তূপ। এসব স্তূপের মধ্যে আছে বাংলাদেশীদের লাশও। ব্লগে দেখে, ভয়াবহ তথ্য জেনে-বুঝেও কেন মানুষ রাশিয়ার যেতে রাজি হয়?
রাজি হবে না কেন, বাংলাদেশে তো কাজের ঠিকঠাক ক্ষেত্র নেই, পরিবেশ নেই। লাখ লাখ তরুণ পড়াশোনা করছে। পড়া শেষে হতাশার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে। হাবুডুবু খেতে থাকা কারো সামনে যদি উদ্ধার পাওয়ার মতো খড়কুটো হাজির করা হয়, সেটিকেও আঁকড়ে ধরতে চাওয়া স্বাভাবিক।
এই খুব স্বাভাবিক বিষয়টি আমরা জানি এবং বুঝি। কিন্তু সব বুঝেও সঙ্কট সমাধান কী করে হয়, সেই পথে হাঁটি না। এ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার গরজও দেখা যায় না নীতিনির্ধারকদের।
রাশিয়ায় সাম্প্রতিক রোমহর্ষক ঘটনা সামনে এনেছে এসআরবি। এ নিয়ে এখন আলোচনা হচ্ছে। কিছু দিন পর হয়তো আলোচনা থেমে যাবে। কিন্তু পাচার কি থামবে?
হ্যাঁ, এই পাচারও থেমে যেত, যদি নীতিনির্ধারকরা বিষয়টিকে গভীরভাবে নিতেন। একদিকে জনবলকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতেন। কাজ নিয়ে প্রবাসে যাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতেন, তাহলে প্রতারকদের প্রতারণা করার উপায়ও বন্ধ হয়ে যেত।
প্রশ্ন দেখা দিতে পারে— সব দায়-দায়িত্ব কি রাষ্ট্রের? না, রাষ্ট্রে যারা বসবাস করেন, তাদেরও দায়িত্ব আছে। যারা কলকারখানা ও শিল্পায়ন করেন, তাদেরও ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। একটি উদ্যোগে অনেক কাজের সংস্থান হয়। কিন্তু বাংলাদেশের উদ্যোগগুলোতেও উদ্যম দেখা যাচ্ছে না। কী কারণ?
ঘুরেফিরে দায় গিয়ে বর্তায় নীতিনির্ধারকদের ওপরই। আসলে উদ্যোগের ঠিকঠাক পরিবেশ এখানে নেই। একজন উদ্যোক্তা স্বাধীনভাবে কিছু করতে চাইলে তাকে পদে পদে হোঁচট খেতে হয়। এখানে উদ্যোগ নেয়াটাই যেন ‘অপরাধ’! নতুন কোনো উদ্যোক্তা হয়তো ভাবেন, অল্প কিছু পুঁজি খাটিয়ে একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন। কিন্তু গড়তে গিয়ে লাইসেন্স করতে হয় তাকে। দরকার হয় এটা-সেটার অনুমতির। ‘অনুমতি’র পদ্ধতিটা এমন জটিল করে রাখা হয়েছে যে, কিছু ক্ষেত্রে অনুমতি চাইতে গেলেও অনুমতির দরকার হয়। অনুমতি যারা দেবেন, তাদের সবাই সাধু হয়ে টেবিলে বসে থাকেন না! টেবিলের তলায় ঝুড়ি পেতে রাখেন। এভাবে একজন-দুজনের ঝুড়িতে কিছু করে রাখতে গিয়ে উদ্যোগের ঝুড়িটাই খালি হয়ে যায়। দফতর থেকে দফতরে ঘুরে মানসিক শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসে তাদের। হতাশ উদ্যোক্তাকেও তখন দেশের বাইরে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে হয়। বেছে নিতে হয় একা গায়ে-গতরে খেটে খাওয়ার পথ। এভাবেই আমাদের ‘ব্রেইন’গুলো ‘ড্রেইন’ হয়ে যায়। যাদের ব্রেইনে ঘাটতি আছে, তাদের শ্রমগুলোও বাতাসে মিলিয়ে যায়। কেউ কেউ বন্দী হয় দাসত্বে।
মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার এখন আগের মতো নেই। বাজার ছোট হয়ে এসেছে। তার ওপর চলছে সঙ্ঘাত। এই সঙ্ঘাতে বাংলাদেশী শ্রমিকদের প্রাণহানির খবরও আসছে। এভাবে প্রাণের হানি হতে থাকলে আমাদের উপায় কী হবে? সঙ্কট সামাল দিতে নীতিনির্ধারকরা কি কিছু ভেবে রেখেছেন? নতুন কোনো সংস্থানের জুত-জোগাড় কি করতে পারছেন?
যদি করা না হয়, তাহলে পাচারকারীরা সুযোগ নেবে, সেটিই স্বাভাবিক। হতাশায় হাবুডুবু খাওয়া যতদিন থাকবে, ততদিন ‘আশার শেকল’ পেতে রাখবে তারা।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








