মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

(প্রথম পর্ব)
নির্বাচন কমিশন
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করতে একটি নিরপেক্ষ ও দক্ষ নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের বিকল্প নেই। কিন্তু দেশের বিদ্যমান সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনের অন্যান্য সদস্যদের নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে দেয়া হয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতি স্বাধীনভাবে তা করার ক্ষমতা রাখেন না। কারণ সংবিধানের ৪৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতি অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন। সুতরাং, ইসি গঠনে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পছন্দ ও প্রভাব এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। বলাবাহুল্য, দেশের বেশ কয়েকটি ইসি গঠনে এমন দৃষ্টান্ত আছে। চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার যে অভূতপূর্ব বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে তার পেছনে যে কারণ ছিল; এর মূলে নিহিত ছিল কালিমালিপ্ত ইসি ও সংস্থাটির দ্বারা পরিচালিত জাতীয় নির্বাচন। এসব প্রহসনের নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক দুষ্টচক্র ও মাফিয়া গোষ্ঠী বারবার অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে জনগণের ওপর শোষণ-নির্যাতন-জুলুম-দুর্নীতির মাধ্যমে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র ভূলুণ্ঠিত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে আগস্ট বিপ্লব রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে আসে। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের বহু উদ্যোগ নিলেও আজকাল তার কোনো প্রাসঙ্গিকতা অনুভূত হচ্ছে না। যেমন ইসির কথা ধরা যাক। ইসি সংস্কার কমিশন ও পরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ইসি সংস্কার নিয়ে যুগান্তকারী সুপারিশ করলে প্রায় সব রাজনৈতিক দল তা গ্রহণ করে। তা বাস্তবায়নের রূপরেখা হিসেবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ জারি করে। এর ভিত্তিতে ২০২৬ সালে ফেব্রুয়ারিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। স্মরণযোগ্য, গণভোটের প্রশ্নটি ছিল নিম্নরূপ : 
‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’
(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।’ (প্রাসঙ্গিক না হওয়ায় অন্যান্য প্রশ্নগুলো উল্লেখ করা হয়নি) দেশের ভোটারদের প্রায় ৭০ শতাংশ এ প্রশ্নের ইতিবাচক সম্মতি দেয়া সত্ত্বেও বিএনপি সরকার তার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করছে না যা সবাই অবহিত।
এবারে দেখা যাক, জুলাই জাতীয় সনদে নির্বাচন গঠন সম্পর্কে কী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। এতে বলা হয় যে, ‘নির্বাচন কমিশন নিয়োগ : বিদ্যমান সংবিধানের ১১৮ (১) অনুচ্ছেদ সংশোধনপূর্বক এরূপ বিধান করা হবে যে, (ক) প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত সংখ্যক নির্বাচন কমিশনারগণের সমন্বয়ে বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকবে। আইনের দ্বারা নিম্নরূপে গঠিত একটি বাছাই কমিটির মাধ্যমে উপযুক্ত প্রার্থী বাছাই করা হবে : (১) জাতীয় সংসদের স্পিকার (যিনি এ বাছাই/সিলেকশন কমিটির প্রধান হবেন), (২) ডেপুটি স্পিকার (যিনি বিরোধী দল হতে নির্বাচিত হবেন), (৩) প্রধানমন্ত্রী, (৪) বিরোধী দলের নেতা এবং (৫) প্রধান বিচারপতির প্রতিনিধি হিসাবে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি।
এই বাছাই/সিলেকশন কমিটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনারদের নিয়োগের উদ্দেশ্যে বিদায়ী ইসির প্রধান ও অন্যান্য কমিশনারগণের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন পূর্বে সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইনের দ্বারা (যেখানে নির্বাচন কমিশনার হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতা, প্রার্থী অনুসন্ধানের পদ্ধতি, প্রাধিকার ও কর্মপদ্ধতির উল্লেখ থাকবে) নির্ধারিত পদ্ধতিতে ‘ইচ্ছাপত্র’ ও প্রার্থীর সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি আহ্বান করাসহ কমিটির নিজস্ব উদ্যোগে উপযুক্ত প্রার্থীর অনুসন্ধানকার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
(খ) অনুসন্ধানে প্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের ‘জীবন বৃত্তান্ত’ স্বচ্ছপ্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই করত সর্বসম্মতিক্রমে তাদের মধ্য হতে একজনকে সিইসি এবং নির্ধারিত প্রতিটি পদের বিপরীতে একজন করে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবেন এবং রাষ্ট্রপতি তাদের কার্যভার গ্রহণের তারিখ হতে পরবর্তী ৫ বছরের জন্য নিয়োগ দান করবেন।
(গ) স্পিকারের তত্ত্বাবধানে জাতীয় সংসদ সচিবালয় এই কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে।
(ঙ) ১১৮(৫) অনুচ্ছেদ এর সাথে এরূপ যুক্ত হবে : ‘এতদ্ব্যতীত জাতীয় সংসদ কর্তৃক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারগণের জবাবদিহিতার জন্য আইন প্রণয়ন ও আচরণ বিধি প্রণীত হবে।’
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের এ প্রস্তাবের সাথে ৩০টি দলের সবাই একমত পোষণ করে। এমনকি বিএনপি কয়েকটি বিষয়ে ভিন্নমত  (নোট অব ডিসেন্ট) দিলেও এ বিষয়ে কোনো ভিন্নমত না দিয়ে সবার সাথে একমত প্রকাশ করেছে। এমতাবস্থায় আশা করা যায় যে, জাতীয় সংসদে কয়েক মাসের মধ্যে যে সংবিধান সংশোধনী বিল আসতে যাচ্ছে তাতে ইসি গঠনের বিষয়ে জনগণের কাছে সরকারি দল বিএনপির দেয়া অঙ্গীকার রক্ষা করা হবে।

Advertisement

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা
আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টিসহ বিরোধী দলগুলোর চাপে ১৯৯৬ সালের ২১ মার্চ বিএনপি সরকার সংসদে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের লক্ষ্যে সংসদে একটি বিল উত্থাপন করে। ২৬ মার্চ বিলটি সংসদে আলোচিত হয়। সারা রাত আলোচনার পর ২৭ মার্চ সকালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী হিসেবে বিলটি গৃহীত হয়। এতে বিধান রাখা হয়, রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিগণের মধ্যে যিনি সবশেষে অবসরপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং যিনি সংবিধান অনুযায়ী উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্য তাকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন। তবে শর্ত থাকে যে, যদি উক্তরূপ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি পাওয়া না যায় অথবা তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে অসম্মত হন, তাহলে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিগণের মধ্যে যিনি সর্বশেষে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির অব্যবহিত পূর্বে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন।
যদি কোনো অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে পাওয়া না যায় অথবা তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে অসম্মত হন, তাহলে রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারকগণের মধ্যে যিনি সর্বশেষে অবসরপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং যিনি সংবিধান অনুযায়ী উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্য তাকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন। যদি উল্লিখিত দফাসমূহের বিধানাবলিকে কার্যকর করা না যায়, তা হলে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের অধীন তার স্বীয় দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
সংবিধানের এই সংশোধনে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু হওয়ার পর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়; তা নিয়ে তেমন কোনো প্রশ্ন বা বিতর্ক দেখা যায়নি। ২০০৭ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি সরকার তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে পাওয়ার সুবিধার্থে সংবিধান সংশোধন করে প্রধান বিচারপতির চাকরির মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে ৬৭ বছর নির্ধারণ করে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলো এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলে বিচারপতি কে এম হাসান প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশ করেন। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রপতি দ্বিতীয় বা তৃতীয় অপশন বিবেচনায় না নিয়ে চতুর্থ অপশন নিয়ে নিজে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলো আরো কঠোর অবস্থান নিলে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। সামরিক বাহিনীর সমর্থনে ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। ওই সরকার ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে। বিতর্কিত সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার সরকার গঠন করে। 
২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টের ফুল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে রায় দেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবলিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধান পরিপন্থী; তাই তা বাতিল করা হলো। তবে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আগামী দশম সংসদ নির্বাচন ও একাদশ সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভিত্তিতে হতে পারে। এরপর ২০১১ সালের ৩০ জুন তারিখে জাতীয় সংসদ কর্তৃক সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে পরপর তিনটি নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। যেগুলো দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ২০২৪ সালের বিপ্লবের পরে সংবিধান সংস্কার কমিশন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের প্রস্তাব করে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে গভীরভাবে আলোচনার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন কাঠামো, প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টা নিয়োগে প্রস্তাব করে যে, ‘সংসদের মেয়াদ অবসান হওয়ার ৩০ দিন পূর্বে আইনসভার নিম্নকক্ষের স্পিকারের তত্ত্বাবধানে এবং সংসদ সচিবালয়ের ব্যবস্থাপনায়—  ১. প্রধানমন্ত্রী, ২. বিরোধীদলীয় নেতা, ৩. স্পিকার, ৪. ডেপুটি স্পিকার (বিরোধী দলের) এবং ৫. সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি— (যদি সংসদে আসন সংখ্যার বিবেচনায় একাধিক দল দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের অবস্থানে থাকে তাহলে সে সব দলের মধ্য থেকে নির্বাচনে সর্বোচ্চ পরিমাণে ভোটপ্রাপ্ত দলটি দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল হিসেবে বিবেচিত হবে) মোট পাঁচ সদস্য সমন্বয়ে একটি ‘নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাছাই কমিটি’ গঠিত হবে। কমিটির যেকোনো বৈঠক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সভাপতিত্ব করবেন স্পিকার। 
কমিটি গঠিত হওয়ার পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কমিটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলো এবং জাতীয় সংসদের স্বতন্ত্র সদস্যদের কাছ থেকে সংবিধানের ৫৮গ অনুচ্ছেদে বর্ণিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির নামের প্রস্তাব আহবান করবেন। এক্ষেত্রে প্রতিটি দল একজন এবং একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য একজন মাত্র ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করতে পারবে।
(৫) রাজনৈতিক দলগুলো এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সংসদ সচিবালয়ে তাদের প্রস্তাবিত নাম দাখিল করবেন।
(৬) পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কমিটির সদস্যরা সভায় মিলিত হয়ে নিজেদের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত এবং রাজনৈতিক দলগুলো ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কাছে হতে প্রস্তাবিত নামগুলো নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বাংলাদেশের যে সব নাগরিক সংবিধানের ৫৮গ অনুচ্ছেদ এর অধীনে উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্য তাদের মধ্য হতে একজনকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নেবেন। একই সাথে তিনি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হবেন।
(৭) বাছাই কমিটি গঠিত হওয়ার পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার মধ্যে এই পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কোনো ব্যক্তিকে চূড়ান্ত করা সম্ভব না হলে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা পদের জন্য ৫৮গ অনুচ্ছেদে বর্ণিত শর্ত অনুসরণপূর্বক সংসদের সরকারি দল/জোট পাঁচজন উপযুক্ত ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করবে। সেই সাথে প্রধান বিরোধী দল/জোট পাঁচজন উপযুক্ত ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করবে। এছাড়া সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল দু’জন উপযুক্ত ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করবে। যদি সংসদে আসন সংখ্যার বিবেচনায় একাধিক দল দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের অবস্থানে থাকে তাহলে সে সব দলের মধ্যে নির্বাচনে সর্বোচ্চ পরিমাণ ভোটপ্রাপ্ত দলটি দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল হিসেবে বিবেচিত হবে। উপর্যুক্ত প্রক্রিয়ায় প্রাপ্ত নামগুলো স্পিকার জনসাধারণের অবগতির জন্য প্রকাশ করবেন।
(৮) উপর্যুক্ত চ-এ বর্ণিত সময় অতিবাহিত হওয়ার পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরকারি দল/জোটের প্রস্তাবিত পাঁচ ব্যক্তির নামের তালিকা হতে প্রধান বিরোধী দল/জোট যেকোনো একজনকে বেছে নিবে; অনুরূপভাবে প্রধান বিরোধী দল প্রস্তাবিত পাঁচ ব্যক্তির নামের তালিকা হতে সরকারি দল যেকোনো একজনকে বেছে নেবে। দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রস্তাবিত মোট দু’জনের নামের তালিকা হতে সরকারি দল/জোট যেকোনো একজনকে বেছে নেবে। প্রধান বিরোধী দল/জোট যেকোনো একজনকে বেছে নেবে। এ পদ্ধতিতে প্রাপ্ত নামগুলোর মধ্য হতে  যেকোনো একজনের ব্যাপারে যদি প্রস্তাবকারী দলগুলোর মধ্য ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তিনি পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে মনোনীত হবেন, অথবা কোনো একজনের ব্যাপারে কমিটির পাঁচজন সদস্যের মধ্যে যদি চারজন সদস্য একমত হন; তাহলে তিনি পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মনোনীত হবেন।
(৯) যদি উপর্যুক্ত পদ্ধতিতে কোনো একজনের বিষয়ে প্রস্তাবকারী পক্ষগুলো একমত হতে না পারে তাহলে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিচার বিভাগের দু’জন প্রতিনিধি বাছাই কমিটিতে সদস্য হিসেবে যুক্ত হবেন। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কারো নাম প্রস্তাব করতে পারবেন না। উক্ত দু’জন প্রতিনিধির মধ্যে একজন আপিল বিভাগের বিচারপতি হবেন। সেই সাথে একজন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হবেন। উক্ত দু’জন বিচার বিভাগীয় প্রতিনিধিকে মনোনীত করতে- ১. সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি, ২. কর্মরত প্রধান বিচারপতি এবং ৩. আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি সমন্বয়ে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠিত হবে।
(১০) এ পর্যায়ে সাত সদস্যবিশিষ্ট উক্ত বাছাই কমিটির সদস্যরা পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্পিকারের তত্ত্বাবধানে গোপন ব্যালটে ‘র‌্যাংকড চয়েজ’ বা ক্রমভিত্তিক ভোটিং পদ্ধতি প্রয়োগ করে ওই সংক্ষিপ্ত তালিকা হতে যেকোনো একজনকে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নেবেন।
(১১) উপর্যুক্ত যেকোনো পদ্ধতিতে মনোনীত ব্যক্তিকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাষ্ট্রপতি পরবর্তী ৯০ দিনের জন্য প্রধান উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেবেন। তবে শর্ত থাকে, সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় তিনি শপথ গ্রহণ করবেন না।
(১২)  উপর্যুক্ত পদ্ধতিগুলোর মাধ্যমেও যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বেছে নেয়া সম্ভব না হয়; তাহলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুসরণ করতে হবে। তবে শর্ত থাকে যে, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বেছে  নেয়া যাবে না।
(১৩) কোনো কারণে প্রধান উপদেষ্টার পদ শূন্য হলে রাষ্ট্রপতি কোনো সময় ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য পূর্ববর্তী র‌্যাঙ্কড চয়েজ বা ক্রমভিত্তিক ভোটিং পদ্ধতিতে দ্বিতীয় স্থানে থাকা বয়সে জ্যেষ্ঠতম ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেবেন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বয়সে জ্যেষ্ঠতম ব্যক্তি দায়িত্ব গ্রহণে অসম্মতি জানালে অথবা দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে র‌্যাঙ্কড চয়েজ বা ক্রমভিত্তিক ভোটিং পদ্ধতিতে পরবর্তী স্থানে থাকা ব্যক্তি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য নিযুক্ত হবেন। এ পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা পদে পরিবর্তন হলেও পূর্বতন উপদেষ্টা পরিষদ বহাল থাকবে। তবে উপদেষ্টা পরিষদের কোনো পদ শূন্য হলে নবনিযুক্ত প্রধান উপদেষ্টা সেই শূন্যপদ পূরণের অধিকার রাখবেন।
(১৪) নিয়োগলাভের পর প্রধান উপদেষ্টা উপর্যুক্ত বাছাই কমিটির সঙ্গে পরামর্শক্রমে সংবিধানের ৫৮গ অনুচ্ছেদে বর্ণিত উপযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্য হতে অনধিক পনেরো জন ব্যক্তিকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের জন্য বেছে নেবেন। একই সাথে রাষ্ট্রপতি তাদের নিয়োগ প্রদান করবেন।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর পরিপ্রেক্ষিতে যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় তাতে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রশ্নও ছিল যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রশ্নে গণভোটে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার ইতিবাচক সম্মতি জ্ঞাপন করে। 
ঐকমত্য কমিশন নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে যে সুপারিশ করেছে তার সাথে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ২৫টির বেশি রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করে। বিএনপি নীতিগতভাবে একমত প্রকাশ করলেও প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের কয়েকটি ধাপের ব্যাপারে তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল। তাদের সাথে আরো কয়েকটি ছোট দল একাত্মতা পোষণ করে। এতদসত্ত্বেও গণভোটের প্রশ্নে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রশ্নটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সুতরাং ‘নোট অব ডিসেন্ট’ সত্ত্বেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গণভোটে প্রশ্ন থাকায় এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে যে দলই ক্ষমতায় যাক তা মানতে বাধ্য হবে।
চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর এসব পরিবর্তনের বৈধতা নিয়ে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। ওই বছরের শেষ দিকে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ নাগরিক হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেন। পরে একই বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ আরো কয়েকজন পৃথক রিট দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর এক ঐতিহাসিক রায় দেন। আদালত পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদকে সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করেন। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল এবং সংবিধানের ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়। হাইকোর্টের এসব রায়ের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে কয়েকটি পক্ষ আপিল বিভাগে ‘লিভ টু আপিল’ দায়ের করে। তার পরিপ্রেক্ষিতে টানা কয়েক দিনের শুনানি শেষে ৯ জুলাই, ২০২৬ আপিল বিভাগ সব আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। এর মধ্য দিয়ে সাংবিধানিক বিতর্কের কয়েকটি বিষয়ের আইনি ফয়সালা হয়ে গেল। 
এদিকে জাতীয় সংসদে সংবিধান সংস্কার ও সংশোধন প্রসঙ্গে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। এখন দেখা যাক, বিএনপি বিরোধী দলের মতকে উপেক্ষা করবে নাকি জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সাংবিধানিক বিতর্কের অবসান ঘটাতে আন্তরিকতার পরিচয় দেবে।  
লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব  “
ayubmiah@gmail.com