মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর একটি। যুদ্ধবিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত। শিল্পভিত্তি ছিল দুর্বল, খাদ্য উৎপাদন অনিশ্চিত, বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট তীব্র এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সদ্য গঠিত। সেই বাংলাদেশ আজ আর নেই। কৃষি উৎপাদন বেড়েছে, তৈরী পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে, প্রবাসী আয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠেছে, যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর বিস্তার ঘটেছে এবং জীবনযাত্রার বহু সূচকে উন্নতি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি তার সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়েছে? 
সমস্যা শুধু সম্পদের অভাব নয়। আমাদের রয়েছে বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, উর্বর মাটি, মিঠাপানি, কৃষির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার, তৈরী পোশাক শিল্প, বিপুল প্রবাসী শ্রমশক্তি এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থানও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন হলো, এসব সম্পদের কতটা আমরা দক্ষতা, সততার সাথে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করছি।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে বাজেট ও উন্নয়ন ব্যয়ের আকার বেড়েছে, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু অর্থ ব্যয় করলেই উন্নয়ন হয় না। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন রাষ্ট্রীয় ব্যয় উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ, বিনিয়োগ ও মানুষের জীবনমান দীর্ঘমেয়াদে উন্নত করে। তাই প্রশ্ন শুধু অর্থ ব্যয়ের নয়, সেই অর্থ কতটা জনকল্যাণ ও উৎপাদনশীল সম্পদে রূপান্তরিত হলো, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
এই জায়গাতেই উন্নয়নের অন্যতম বড় অন্তরায় হিসেবে সামনে আসে সততার সঙ্কট। দুর্নীতি শুধু ঘুষ বা সরকারি অর্থ আত্মসাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি ক্রয়, টেন্ডার, ব্যাংকঋণ, ভূমি, কর প্রশাসন, লাইসেন্স, আমদানি-রফতানি, নির্মাণ, নিয়োগ, বাজারব্যবস্থা ও সেবা প্রদানসহ বহু ক্ষেত্রে এর বিস্তার ঘটেছে। যখন যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতার পরিবর্তে রাজনৈতিক যোগাযোগ, অর্থ, প্রভাব বা সিন্ডিকেট সুবিধা পাওয়ার প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে, তখন অর্থনীতি দক্ষতা হারায়। এর ফলে সৎ উদ্যোক্তা নিরুৎসাহিত হন এবং অদক্ষ কিন্তু প্রভাবশালী গোষ্ঠী সুবিধা অর্জন করে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, দুর্নীতি এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির রূপ নিয়েছে। রাষ্ট্রের কোনো স্তরে দায়িত্বশীল একটি অংশ ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের সুযোগ হিসেবে দেখে; ব্যবসার একটি অংশ প্রতিযোগিতার পরিবর্তে প্রভাব ও সিন্ডিকেটের ওপর নির্ভর করে; রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি অংশ অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে ক্ষমতার উৎস হিসেবে ব্যবহার করে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে সমাজের অন্য স্তরেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে অনিয়মের সাথে আপস স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়। এর ফলে দুর্নীতির অর্থনৈতিক ক্ষতি তার প্রত্যক্ষ আর্থিক মূল্যের চেয়েও অনেক বড় হয়ে ওঠে।
দুর্নীতির আন্তর্জাতিক সূচক বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা দেয়। Transparency International-এর ২০২৫ সালের Corruption Perceptions Index-এ বাংলাদেশ ১৮২টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ১৫০তম অবস্থানে এবং ১০০-এর মধ্যে ২৪ পয়েন্ট পেয়েছে। এই সূচক বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নিম্ন অবস্থান, রাষ্ট্রীয় সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দুর্বলতার গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কেত। 
এই দুর্নীতির অর্থনৈতিক মূল্য বহন করেন মূলত সাধারণ মানুষ। একজন কৃষক,  একজন প্রবাসী শ্রমিক, একজন গার্মেন্টসকর্মী, প্রত্যেকে নিজের শ্রম দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করেন। বিপরীতে কেউ যদি ক্ষমতা, প্রভাব, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক আধিপত্যের জোরে অবৈধভাবে সেই সম্পদ বিদেশে সরিয়ে দেন, তাহলে সেটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের ভিত্তিটাও ধসিয়ে দেয়। দেশপ্রেম শুধু জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত বা রাজনৈতিক বক্তৃতার বিষয় নয়। দেশের সম্পদকে আমানত হিসেবে রক্ষা করা, জনগণের অর্থ অপচয় না করা, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে ব্যক্তিগত সুবিধার উৎসে পরিণত না করাও দেশপ্রেম। রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষমতাবান মানুষের দেশপ্রেমের পরীক্ষাও অর্থনৈতিক আচরণের মধ্যেই হওয়া উচিত। 
রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের রাজনীতির একটি অংশ যদি জনসেবার পরিবর্তে অর্থনৈতিক রেন্ট বা অবৈধ সুবিধা অর্জনের পথে যায়, তাহলে রাজনীতি ও অর্থনীতির সুস্থ সম্পর্ক নষ্ট হয়। রাজনীতি তখন নীতি ও জনকল্যাণের প্রতিযোগিতা না হয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা বিলি-বণ্টনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়।
চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট ও টেন্ডার কারসাজি তাই শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এগুলো অর্থনীতির উৎপাদনশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত। 
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিনিয়োগের ওপর। একজন বিদেশী বিনিয়োগকারী শুধু বাংলাদেশের শ্রমশক্তি, বাজার বা ভৌগোলিক অবস্থান দেখেন না; তিনি দেখেন আইনের শাসন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতার পরিবেশ, চুক্তির নিরাপত্তা এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রকৃত ব্যয়। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশভিত্তিক বেসরকারি খাত বিশ্লেষণেও দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে ব্যবসা ও বিনিয়োগের বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দুর্নীতি, অনিশ্চয়তা ও দুর্বল সুশাসন বাংলাদেশের যে পরিমাণ বিদেশী ও দেশীয় বিনিয়োগ আকর্ষণ করার সক্ষমতা রয়েছে, তার তুলনায় বিনিয়োগ কমিয়ে দিচ্ছে। বিনিয়োগকারী যদি দেখেন, বিনিয়োগ করতে এসে তাকে অদৃশ্য খরচ, প্রভাব ও অনিশ্চয়তার মোকাবেলা করতে হবে, তাহলে তিনি অন্য গন্তব্য বেছে নিতে পারেন। ফলে সুশাসন শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়; এটি সরাসরি বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার প্রশ্ন।
বাংলাদেশের সমস্যা নীতির অভাব নয়; বরং নীতি বাস্তবায়নে সততা ও সক্ষমতার ঘাটতি। একটি ভালো কর্মসূচি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার হাতে পড়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে পারে। প্রয়োগের দুর্বলতায় ভালো আইন অকার্যকর হতে পারে। অপচয় ও অনিয়মে বড় বাজেট কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে। ফলে বাস্তবায়ন কাঠামোর সংস্কারই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার প্রধান শর্ত। অর্থাৎ বাংলাদেশের উন্নয়নে এখন কর্মসূচির চেয়ে বেশি প্রয়োজন কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।
এখানে সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া যায়। তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো বাংলাদেশের মতো নয় এবং তাদের মডেল হুবহু অনুসরণযোগ্যও নয়। কিন্তু তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, মানবসম্পদ, উৎপাদনশীলতা ও জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসনকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তির সাথে যুক্ত করেছিল। 
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো, সততা ও জবাবদিহিকে অর্থনৈতিক নীতির অংশ করা। সরকারি ক্রয়ে প্রকৃত প্রতিযোগিতা, প্রশাসনে মেধার মূল্যায়ন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাতে জবাবদিহি এবং আইনের সমান প্রয়োগ কোনো বিলাসিতা নয়; এগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের অবকাঠামো। যেমন সড়ক, বন্দর, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল অবকাঠামো ছাড়া আধুনিক অর্থনীতি এগোতে পারে না, তেমনি কার্যকর প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নও সম্ভব নয়।
ইসলামের ‘আমানত’ ও ‘আদল’-এর ধারণার সাথেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও জনগণের সম্পদ ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এগুলো আমানত। আমানত রক্ষা মানে শুধু আত্মসাৎ না করা নয়, জনগণের সম্পদ সর্বোচ্চ দক্ষতা, ন্যায় ও কল্যাণের সাথে ব্যবহার করা। তাই সততা, জবাবদিহি ও দেশপ্রেমকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বাইরে রাখা যায় না। রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায় ও আমানতের ধারণা যত শক্তিশালী হবে, অর্থনৈতিক সম্পদের অপচয় ও অন্যায় বণ্টনের সুযোগ তত সঙ্কুুচিত হবে।
বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে এবং বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত। ভারতের সাথে ভৌগোলিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, বাণিজ্য, ট্রানজিট ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। বাংলাদেশেরও রয়েছে পানি, সীমান্ত, বাজার, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও সমুদ্রসম্পদ নিয়ে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ। প্রতিবেশীর স্বার্থ থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা একটি দেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
অতএব বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক নীতির মৌলিক লক্ষ্য হওয়া উচিত— অভ্যন্তরীণ শক্তি বাড়িয়ে দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো। যে রাষ্ট্র নিজের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুশাসন আনতে পারে না, সরকারি সম্পদ রক্ষা করতে পারে না এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তার আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অবস্থানও দুর্বল হয়। ভূগোল নিজে শক্তি নয়; শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার সাথে যুক্ত ভূগোলই কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়।
জুলাই চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান এই আলোচনাকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করেছে। এর মধ্যে ছিল ন্যায়, সুযোগের সমতা, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তন নিজে অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটায় না। ব্যক্তি বা সরকার পরিবর্তনের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতির পরিবর্তন করতে হবে। টেন্ডার-সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি, ব্যাংকিং অনিয়ম, প্রশাসনিক দুর্নীতি, কর ফাঁকি ও বাজার কারসাজির পেছনে যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা তা দূর করতে হবে। 
বাংলাদেশের জন্য তাই প্রয়োজন একটি সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় সংস্কারনীতি। জুলাইয়ের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে যদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ দেয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশের মানবসম্পদ, কৃষি, শিল্প, সমুদ্র, বাজার ও ভৌগোলিক অবস্থান, সবই শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে। তখন উন্নয়ন শুধু জিডিপির পরিসংখ্যান হবে না; তা হবে একটি সৎ, দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের বাস্তব রূপ। 
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
Mizan12bd@yahoo.com

Advertisement