
অপরাধের জগতে সম্প্রতি তালিকায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক নাম কিশোর গ্যাং। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহর ও শহরতলিতে গ্যাং কালচার মারাত্মক সামাজিক উদ্বেগ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠেছে। শহর শহরতলি, পাড়া-মহল্লায় এই উঠতি মাস্তান বাহিনীর প্রকাশ্য খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ চমকে দিয়েছে সমাজ জীবনকে। ঢাকার মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরাসহ বিভিন্ন জেলা শহরে এদের তাণ্ডবে সন্ত্রস্ত জনজীবন। প্রাণঘাতী অস্ত্রে সজ্জিত গ্রুপগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক দলের বড় ভাই কালচার এবং আইনি কাঠামোর দুর্বলতা সমস্যা আরো গভীর করেছে।
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা সবাই মূলত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর যুবক। যে বয়সে এদের হাতে থাকার কথা পাঠ্যবই, যাওয়ার কথা স্কুলে, সেই বয়সে তাদের হাতে মারাত্মক অস্ত্র। স্কুলে যাওয়ার পরিবর্তে এরা বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ, দখল, চাঁদাবাজি ও খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ছে। শুরুতেই এটি সামাল দিতে না পারলে ভবিষ্যতে গোটা সমাজব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে। এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা সচরাচর নির্দিষ্ট এলাকা বা মহল্লায় নিজেদের অস্তিত্বের কথা জানান দেয় চাঁদাবাজি খুন খারাবি বা দখল বাণিজ্যের মাধ্যমে। ব্যবহার করে চটকদার নাম। নিজেকে হিরো হিসেবে জাহির করার অদম্য আকাঙ্ক্ষায় এরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক আশ্রয় প্রশ্রয়ের কারণে এসব গ্যাং আইন ও পুলিশের থোড়াই পরোয়া করে।
পারিবারিক অসচেতনতা, অভিভাবকের শৈথিল্য এবং সন্তান কাদের সাথে মিশছে সে বিষয় খোঁজখবর না রাখা এর অন্যতম কারণ। অন্য দিকে আছে স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব ও প্রশ্রয়। ‘বড় ভাই’রা তাদের স্বার্থসিদ্ধি, মিছিলে সভায়-লোক বাড়ানো বা ক্ষমতা ও প্রভাবের মহড়া দেওয়ার জন্য এদের ব্যবহার করে। এই বয়সে শিশু কিশোরেরা মূলত খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে পছন্দ করে। দুর্ভাগ্যক্রমে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, পার্ক, শিশু-কিশোর সংগঠন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অভাবে পড়াশুনার একঘেয়েমি থেকে রক্ষা পেতে এরা গ্যাং কালচারের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
আকাশ সংস্কৃতি, নেতিবাচক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিশোর অপরাধ চিত্রায়ন, সহিংস টিভি সিরিয়াল, গেম বা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে গ্যাং লাইফস্টাইলকে মহিমান্বিত করার দৃশ্য কিশোরদের কল্পনাপ্রবণ মনকে আলোড়িত করে। তারা এসবে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ে। কিশোরদের হাতে সেলফোন বিশেষ করে আইফোন, তাদের এ পথে আরো একধাপ এগিয়ে দেয় অন্ধকার জগতের জানালা খুলে দিয়ে। একবার এ পথে পা বাড়ালেই পকেট মানি বা নেশার অর্থ জোগাড় করার জন্য ছিনতাই, চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ে। এটা প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় উপায় হচ্ছে পারিবারিক সচেতনতা ও কাউন্সেলিং, সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা, তাদের বন্ধুবান্ধব ও ইন্টারনেট চ্যাটিং এর ওপর নজর রাখা। সবচেয়ে জরুরি গডফাদার বা বড় ভাই কালচারের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে জিরো টলারেন্স। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দলগুলোর আপসহীন হওয়া প্রয়োজন।
অনেক সময় দেখা যায় পুলিশ এদের গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে। যেহেতু এরা কিশোর, এদের ব্যাপারে আইন নমনীয়। কিছুদিন পুনর্বাসন কেন্দ্রে রেখে আবার ছেড়ে দেয়। এরা বেরিয়েই আবার আগের কাজে ফিরে যায়। এজন্য পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোকে মানবিক এবং সংশোধনী কর্মসূচিভিত্তিক হওয়া দরকার। এসব কেন্দ্রে চারিত্রিক ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটানো দরকার, যেন একজন কিশোর অপরাধী নিজের অপরাধ বুঝতে পারে। এ থেকে দূরে থাকতে উৎসাহী হয়। স্কুল, কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাঙ্গনে নিয়মিত খেলাধুলা, ধর্মীয় আচার ব্যবহার, চিত্রাঙ্কন ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে একজন শিশুকে ইতিবাচক হিসেবে গড়ে তোলার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ ও বৃহৎ পরিসরে রাষ্ট্রীয় সমন্বিত ভূমিকার বিকল্প নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, UNICEF-সহ সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এ ব্যাপারে সম্পৃক্ত করা জরুরি। সংশোধন কেন্দ্রগুলোতে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাগত শিক্ষা যেমন— ইলেক্ট্রনিক, অটোমোবাইল মেকানিক, কম্পিউটার শিক্ষা, দর্জিবিজ্ঞান, কাঠের কাজসহ বিভিন্ন জীবনমুখী শিক্ষার সুযোগ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। একই সাথে এসব কিশোরের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে যথাযথ কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ভুলে গেলে চলবে না, এসব কিশোর আমাদের পরিবার ও সমাজেরই অংশ। এদের সমাজচ্যুত করা নয় বরং সুস্থ সামাজিক জীবনে ফিরিয়ে আনাই আমাদের সবার দায়িত্ব।
সমাজের প্রচলিত ধারণা শিশু-কিশোররা শুধু স্কুল এবং পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। এর ফাঁকে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সৃজনশীল কর্মযোগ ইত্যাদি থেকে তাদের অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। একই সাথে বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে একটি সমন্বিত সৃজনশীল নাগরিক সমাজ তৈরির ভিত্তি দুর্বল করার আয়োজন তো আছেই। শিশু অপরাধ রোধ করতে হলে এ সবের পুনর্বিন্যাস দরকার।
শিশুু আইন ২০২৩ অনুসারে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু। প্রাণঘাতী কোনো অপরাধের জন্য তাকে কঠোর শাস্তি দেয়া যায় না। আইনের এই দুর্বলতার ফাঁকে কিশোর গ্যাংয়ের দাপট আরো অপ্রতিহত হয়ে ওঠে। ভারত, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এই আইনের পরিবর্তন করেছে। এ আইনে ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী কোনো কিশোর যদি খুন, ধর্ষণ বা মারাত্মক কোনো অপরাধ করে বসে, তবে তার শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা যাচাই করে নিয়মিত আদালতে বিচার করার বিধান তৈরি করা হয়েছে। এসব দেশে অপরাধের গভীরতা ও প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে কিশোরদের ফৌজদারি আদালতে বিচারের বিধান রয়েছে। এর বিপরীতে ১৮ বছর বয়সী একজন কিশোরকে দেয়া হয়েছে ভোটাধিকার, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের মতোই ভালো মন্দ ভাবনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার। পরস্পর সাংঘর্ষিক এই আইনের সংশোধন প্রয়োজন। কিশোর গ্যাং রুখতে হলে প্রয়োজন সামাজিক অভিভাবকত্ব। প্রয়োজন তাদের অবসর সময়কে সৃজনশীলতার রূপান্তরের আয়োজন, সৃজনশীল সুস্থ শিক্ষার ব্যবস্থা।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ
shah.b.islam@gmail.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








