
সামরিক কর্মকর্তার পোশাক কখনো রাজনৈতিক আনুকূল্য লাভের পাসপোর্ট কিংবা ব্যক্তিগত উন্নতির দর-কষাকষির হাতিয়ার হতে পারে না। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের, বিশেষ করে বেসামরিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি দফতরে কর্মরত সামরিক কর্মকর্তাদের মনে রাখতে হবে, তাদের আচরণ প্রতিটি সৈনিক, নাবিক ও বিমানসেনার ভাবমর্যাদা প্রভাবিত করে। একজন কর্মকর্তা নীতিবিচ্যুত হলে তা সততার সাথে দায়িত্ব পালনকারী হাজারো সদস্যের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি করতে পারে।
কর্তব্যটি স্পষ্ট : নিজের মর্যাদা বজায় রাখতে হবে, আইনসিদ্ধ ক্ষমতার সীমার মধ্যে থাকতে হবে, বেসামরিক সহকর্মীদের সম্মান করতে হবে এবং ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য ক্ষমতাবানদের তোষামোদ করার প্রলোভন থেকে দূরে থাকতে হবে। সৌজন্য অপরিহার্য; চাটুকারিতা মর্যাদাহানিকর। পেশাগত সহযোগিতা প্রয়োজন; দলীয় আনুগত্য বিপজ্জনক। ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিকে শুধু তার পছন্দের কথা শোনানো কোনো কর্মকর্তার যোগ্যতার পরিচয় নয়। এতে তিনি সেই স্বাধীন বিচারবোধ বিসর্জন দেন, যা তার পেশাগত প্রশিক্ষণকে মূল্যবান করে তোলে।
বেসামরিক পদে দায়িত্ব পালন করলেও একজন কর্মকর্তা সামরিক পেশার নৈতিক মানদণ্ড থেকে অব্যাহতি পান না। মন্ত্রণালয়, সরকারি কর্তৃপক্ষ, করপোরেশন কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় তাকে নিয়োগের নির্ধারিত দায়িত্ব ও এখতিয়ার মেনে চলতে হবে। সামরিক পদমর্যাদা কাউকে সীমাহীন প্রশাসনিক ক্ষমতা দেয় না। বেসামরিক কর্মচারীদের ভয় দেখানো, প্রতিষ্ঠিত নিয়ম পাশ কাটানো কিংবা দায়িত্বের সাথে সম্পর্কহীন বিশেষ সুবিধা দাবি করার জন্য সামরিক পরিচয় ব্যবহার করা গ্রহণযোগ্য নয়। সম্মান অর্জন করতে হয় দক্ষতা, ন্যায়পরায়ণতা ও সংযমের মাধ্যমে।
একইভাবে কোনো মন্ত্রী, রাজনৈতিক উপদেষ্টা বা প্রভাবশালী কর্মকর্তা একজন কর্মরত সামরিক কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগত সেবক, দলীয় যোগাযোগের মাধ্যম কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন না। সশস্ত্র বাহিনী বাংলাদেশের। দল, ধর্ম, মতামত কিংবা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সব নাগরিকের প্রতি তাদের দায়িত্ব রয়েছে। আইনসম্মত বেসামরিক কর্তৃত্ব অবশ্যই শ্রদ্ধা ও আনুগত্যের দাবিদার। সেই কর্তৃত্বেরও দায়িত্ব সামরিক প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার থেকে রক্ষা করা।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় এর বেদনাদায়ক সতর্কবার্তা রয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ২০০২ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া অপারেশন ক্লিন হার্টে অপরাধ দমনের জন্য ৪০ হাজারের বেশি সামরিক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। অভিযানটি চলেছিল ৮৫ দিন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ সময়ে ১০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয় এবং অস্পষ্ট পরিস্থিতিতে অন্তত ৫০ জন হেফাজতে মারা যান। পরবর্তী সময়ে সরকার অভিযান চলাকালে সংঘটিত কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তির ব্যবস্থা করে। এসব তথ্য দেখায়, বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ব্যর্থতা কাটানোর উদ্যোগ হিসেবে সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করলে প্রতিষ্ঠানটি কিভাবে গুরুতর অভিযোগ ও দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের মুখে পড়তে পারে। একইভাবে বিগত স্বৈরাচারী দুঃশাসনের সময় সেনাবাহিনীকে নীতিবহির্ভূত ও যথেচ্ছভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে দলীয় স্বার্থ হাছিলের জন্য এবং ধ্বংস করা হয়েছে সেনাবাহিনীর সার্বিক ভাবমর্যাদা।
এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হলে সততার সাথে দায় স্বীকার করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে অভিযান অনুমোদন করে এবং যে চাপ সৃষ্টি করে, তার দায় তাদের বহন করতে হবে। কর্মকর্তারাও নিজেদের সিদ্ধান্ত ও আচরণের দায় এড়াতে পারেন না। রাজনৈতিক নির্দেশ কিংবা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য— কোনোটিই নির্যাতন, বেআইনি হত্যা বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অজুহাত হতে পারে না। সশস্ত্র বাহিনীকে রক্ষা করতে হলে অন্যায় প্রতিরোধ এবং ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়ায় দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধ আড়াল করলে ক্ষতি আরো বিস্তৃত হয়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলিও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার দফতর জানায়, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে সহিংসতায় সর্বোচ্চ প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। তাদের অনুসন্ধানে তৎকালীন সরকার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ের প্রমাণ উঠে আসে। এই সংখ্যা সামগ্রিক সহিংসতার আনুমানিক হিসাব; এটি সেনাবাহিনীর কারণে নিহত মানুষের পৃথক হিসাব নয়। তবু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটি স্পষ্ট : রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহার মানুষের জীবন এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা— উভয়কেই ধ্বংস করতে পারে।
পিলখানা এক গভীর ক্ষতের নাম। ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর হত্যাকাণ্ডে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। এই সংখ্যার পেছনে ছিলেন স্বামী, পিতা, সন্তান ও সহকর্মী; ছিলেন এমন সব পরিবার, যাদের জীবন চিরদিনের জন্য বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। তাদের মৃত্যু যথাযথ স্মরণ, বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত এবং প্রমাণভিত্তিক ন্যায়বিচারের দাবি রাখে। একই সাথে নিজ বাহিনীর বাইরে কর্মরত কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা, কমান্ড ব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্য এবং সঙ্কট মোকাবেলার পদ্ধতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। দায় সতর্কতার সাথে নির্ধারণ করতে হবে; শোককে ব্যবহার করে অভিযোগকে প্রমাণের বিকল্প বানানো যাবে না।
ইতোমধ্যে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান করাকেই পেশাগত সাফল্য মনে করেন এমন কর্মকর্তাদের আরেকটি প্রজন্ম সামরিক প্রতিষ্ঠান বহন করতে পারে না। সুবিধাজনক পদায়ন, চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি, পদোন্নতি কিংবা প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষক— কোনোটিই হারানো মর্যাদার ক্ষতিপূরণ দিতে পারে না। রাজনৈতিক আশ্রয় বা পৃষ্ঠপোষকতা মোটেই কাম্য নয়। পৃষ্ঠপোষক ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেও একজন কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডের পরিণতি বহু বছর থেকে যেতে পারে।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের আচরণ অধঃস্তনদের কর্মপরিবেশ ও মূল্যবোধ নির্ধারণ করে। কমান্ডার তোষামোদকে পুরস্কৃত করলে অধঃস্তনরা অস্বস্তিকর সত্য গোপন করতে শেখেন। যোগ্যতার চেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ বেশি মূল্য পেলে পেশাগত মান দুর্বল হয়।
নেতৃত্বকে সত্যনিষ্ঠ প্রতিবেদন, সঠিক বিচারবোধ এবং যথাযথ মাধ্যমে সম্মানের সাথে উদ্বেগ প্রকাশের সাহসকে মূল্য দিতে হবে।
বেসামরিক প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব, ক্ষমতা ও তদারকির ব্যবস্থা সুস্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। সংবেদনশীল নির্দেশ নথিবদ্ধ করতে হবে। সরকারি অর্থ, নিয়োগ, ক্রয়, আটক কিংবা বলপ্রয়োগের সাথে সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত যথাযথ যাচাইয়ের আওতায় থাকতে হবে। কোনো নির্দেশ বেআইনি বলে মনে হলে কিংবা দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করলে কর্মকর্তা তার ব্যাখ্যা চাইবেন, আইনগত পরামর্শ নেবেন এবং প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ায় বিষয়টি উত্থাপন করবেন। আনুগত্যের নামে স্পষ্টত বেআইনি কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক করে তোলা যাবে না।
বেসামরিক নেতৃত্বকেও অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে। প্রশাসনিক ব্যর্থতা কাটাতে বারবার সামরিক সদস্যদের ব্যবহার করার পরিবর্তে বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দলীয় বক্তব্যের পক্ষে সামরিক সমর্থন চাওয়া, ব্যক্তিগত আনুগত্যকে পুরস্কৃত করা কিংবা কর্মকর্তাদের অনৈতিক দাবি পূরণের চাপে ফেলা বন্ধ করতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেয় এমন সরকার অকপট পেশাগত পরামর্শকে স্বাগত জানাবে, সেটি স্বস্তিকর না হলেও।
সশস্ত্র বাহিনীকেও বুঝতে হবে, আদেশ দিয়ে জনআস্থা সৃষ্টি করা যায় না। শৃঙ্খলাবদ্ধ সদস্যরা যখন মানুষের জীবন রক্ষা করেন, অধিকারকে সম্মান করেন, নিজেদের কাজের ব্যাখ্যা দেন এবং জবাবদিহি মেনে নেন, তখনই আস্থা গড়ে ওঠে। তাই প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার জন্য রাজনৈতিক অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা সংশোধনের সংকল্পও প্রয়োজন।
প্রত্যেক কর্মরত কর্মকর্তা, বিশেষ করে বেসামরিক দফতরে দায়িত্ব পালনকারীদের প্রতি আহ্বান দৃঢ় : পদমর্যাদা ধারণ করুন বিনয়ের সাথে, দায়িত্ব পালন করুন সাহসের সাথে। নিজের এখতিয়ার অতিক্রম করবেন না। তোষামোদের বিনিময়ে উন্নতি কেনার চেষ্টা করবেন না। কারো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য নিজের পোশাক ও পরিচয় ব্যবহার করতে দেবেন না। যে পরিবারগুলো ইতোমধ্যে অসহনীয় মূল্য দিয়েছে, তাদের কথা মনে রাখুন। যে নাগরিকদের আস্থা রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের ওপর অর্পিত, তাদের কথাও ভুলবেন না।
ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেন এই গৌরবময় প্রতিষ্ঠানের বুকে আরেকটি ক্ষত সৃষ্টি না করে। সরকার বদলায়, পদায়ন শেষ হয়। সেবার মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকতে হবে।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
hrmrokan@hotmail.com
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








