মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

কেউ মানুক আর না মানুক, এটিই সত্যি যে, পাকিস্তানের রাজনীতি এমন একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খাচ্ছে, যিনি গত তিন বছর ধরে রাওয়ালপিন্ডির আডিয়ালা জেলে বন্দী। এই বন্দীর নাম ইমরান খান। ১৮ আগস্ট পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানকে দুই দিনের মধ্যে ইসলামাবাদে আল শিফা হাসপাতালে স্থানান্তরের আদেশ দেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের এই আদেশ উপেক্ষা করে শাহবাজ শরিফ সরকার ইমরান খানকে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (পিআইএমএস) ঘুরিয়ে এনে আবার আডিয়ালা জেলে আটকে রাখে। পাকিস্তানের খায়বার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সুহাইল আফ্রিদি ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফের নেতা। সুহাইল আফ্রিদি ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে ইসলামাবাদের উদ্দেশে লংমার্চের ঘোষণা দেন। কেন্দ্রীয় সরকার লংমার্চ প্রতিহত করতে তেহরিক-ই-ইনসাফের সাথে আলোচনা শুরু করে; কিন্তু সুহাইল আফ্রিদি বলেন, ইমরান খান যদি বলেন, লংমার্চ বন্ধ করো, তবেই আমরা তা বন্ধ করব। কেন্দ্রীয় সরকার রাজি হয়নি। আলোচনা ব্যর্থতার জন্য সুহাইল আফ্রিদিকে দায়ী করে খায়বার পাখতুনখাওয়াতে গভর্নর শাসন জারির সিদ্ধান্ত নেয়। গভর্নর শাসনের অর্থ সুহাইল আফ্রিদির সরকারের অবসান। তবে লংমার্চ শেষ হয়নি। ১১ অক্টোবর শাহবাজ শরিফ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকেন এবং সুহাইল আফ্রিদিকে সন্ত্রাসীদের সহায়তাকারী আখ্যা দিয়ে গভর্নর শাসন ও জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্ত নেন। পাকিস্তানের কোনো প্রদেশে গভর্নর শাসন জারি হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়, তবে গভর্নর শাসনের সাথে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস খুবই বেদনাদায়ক। 
১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে মুসলিম লীগ পরাজিত হয় এবং যুক্তফ্রন্টের এ কে ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রী হন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার এ কে ফজলুল হককে দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে বরখাস্ত করে এবং ইস্কান্দার মির্জার মাধ্যমে গভর্নর শাসন জারি করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব আলী খানকে গভর্নর করা হয়। তাকে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেয়া হয়। তিনি সামরিক অভিযান চালাতে অস্বীকৃতি জানালে জেনারেল টিক্কা খানকে গভর্নর করা হয়। টিক্কা খান অপারেশন শুরু করেন, কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে না পারায় জেনারেল এ এ কে নিয়াজিকে গভর্নর করা হয়, যিনি ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার পরও পুরনো ভুল থেকে শিক্ষা নেয়া হয়নি। ১৯৭৩ সালে বেলুচিস্তানের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ মেঙ্গলের সরকারকে বরখাস্ত করে প্রদেশে গভর্নর শাসন জারি করা হয়। আকবর বুগতিকে গভর্নর করা হয়, তবে মাত্র ১০ মাস পর তিনি প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে খোদা হাফেজ বলে দেন। ১৯৭৫ সালে ভুট্টোর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী হায়াত মুহাম্মাদ খান শেরপাওকে পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ওলি খান ও তার সহযোগীদের ওপর দায় চাপিয়ে প্রদেশে গভর্নর শাসন জারি করা হয়। আইএসআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল সাইয়েদ গাওসকে গভর্নর করা হয়; কিন্তু তিনি পরিস্থিতি সামলাতে পারেননি। বেলুচিস্তান ও খায়বার পাখতুনখাওয়া আজো ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ৫০ বছর আগে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৭৩ সালে গভর্নর হওয়া আকবর বুগতিকে ২০০৬ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দেশদ্রোহী ঘোষণা করা হয় এবং বেলুচিস্তানের পাহাড়ি এলাকায় হত্যা করা হয়। আতাউল্লাহ মেঙ্গল এবং ওলি খানকে দেশদ্রোহীদের সহায়তাকারী আখ্যা দেয়া প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ১৯৭৯ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাস অত্যন্ত নির্মম। এই ইতিহাস বলে, ২০১৮ সালে ইমরান খানও সামরিক জেনারেলদের কাঁধে চড়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। যখন ওই জেনারেলদের সাথে মতপার্থক্য হলো, তখন তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে শাহবাজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসানো হয়। জেনারেলদের ধারণা ছিল, যেভাবে অতীতে নওয়াজ শরিফের মতো রাজনীতিবিদরা জেলে যাওয়ার পর সমঝোতা করে কখনো সৌদি আরব এবং কখনো ব্রিটেন চলে যেতেন, ইমরান খানও তেমনই বেশি দিন জেলে থাকতে পারবেন না। নওয়াজ শরিফের মতো ইমরান খানও সমঝোতা করবেন এবং দেশের বাইরে চলে যাবেন। কিন্তু ইমরান খান নওয়াজ শরিফ হতে অস্বীকৃতি জানান।
শাহবাজ শরিফের সরকার ইমরান খানকে মুক্ত করার ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত নয়। এমনকি তাকে হাসপাতালে স্থানান্তর করতেও প্রস্তুত নয়। যদি সুপ্রিম কোর্টের ১৮ আগস্টের রায়ের ওপর আমল করা হতো, তাহলে না খায়বার পাখতুনখাওয়াতে গভর্নর শাসন জারি হতো, আর না লংমার্চ হতো। সুহাইল আফ্রিদির লংমার্চ ইমরান খানের মুক্তির জন্য; কিন্তু শাহবাজ শরিফও একটি লংমার্চ শুরু করে দিয়েছেন। এ লংমার্চ পাকিস্তানকে এক বেসামরিক স্বৈরশাসনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শাহবাজ শরিফ সরকারের বক্তব্য হচ্ছে, তারা যা কিছু করছে তা সংবিধানের ভেতরে থেকেই করছে। সংবিধান তো তাদের সুপ্রিম কোর্টের আদেশ পালনের নির্দেশ দেয়; কিন্তু যেখানে সংবিধান তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে তারা সংবিধানকে উপেক্ষা করে চলে। ইমরান খানও এমন কিছুই করতেন। ইমরান খান শাহবাজ শরিফসহ তার বহু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জেলে ঢুকিয়েছিলেন। আমার মতো একজন সাংবাদিকের ওপর ৯ মাস পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছিলেন। তবে একটি পার্থক্য আছে। গ্লোবাল ডেমোক্রেসি ইনডেক্সে ইমরান খানের সরকার হাইব্রিড রেজিমের (মিশ্র শাসনব্যবস্থা) অধীনে অন্তর্ভুক্ত ছিল; কিন্তু আজ শাহবাজ শরিফের সরকারকে ‘অথোরিটারিয়ান রেজিমের (কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা) অন্তর্ভুুক্ত করা হয়েছে। খায়বার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নর শাসন ও জরুরি অবস্থা এমন একসময়ে জারি করা হলো, যখন ভারত ও আফগানিস্তানের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক চরম উত্তেজনাপূর্ণ। ভারত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করে পাকিস্তানের নদীগুলোর গতিপথ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার নতুন প্রকল্প শুরু করেছে। আফগানিস্তানের সীমান্ত পথ ব্যবহার করে খায়বার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।
কয়েক মাস আগে পর্যন্ত পাকিস্তানের শাসকরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়ে খুব গর্ব করছিলেন, কারণ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিদিন তাদের প্রশংসা করছিলেন। পরে ট্রাম্প ইরানের সাথে সরাসরি আলোচনা শুরু করেন। পাকিস্তান সৌদি আরব ও তুরস্কের সাথে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। পাকিস্তান সরকারের দাবি, তারা যেকোনো মূল্যে সৌদি আরবকে রক্ষা করবে। সৌদি আরবকে অবশ্যই রক্ষা করা উচিত, তবে পাকিস্তানের সরকারের উচিত আগে নিজের ঘর সামলানো। গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০২৬-এ পাকিস্তান প্রথম স্থানে চলে এসেছে। সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার জন্য শাহবাজ শরিফের সরকারকে সব রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। এমন বার্তা দেয়া উচিত নয় যে, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে খায়বার পাখতুনখাওয়ায় নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। এই নীতির মাধ্যমে প্রদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না। শাহবাজ শরিফের সরকার ইমরান খান ফোবিয়ায় বন্দী হয়ে গেছে। এ বন্দী সরকার পাকিস্তানকে বেসামরিক স্বৈরশাসনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। সরকারকে ইমরান খান ফোবিয়া থেকে মুক্ত হতে হবে এবং বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ওয়াজেদের পরিণতি থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ১২ অক্টোবর, ২০২৬ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর
ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com 

Advertisement

হামিদ মীর : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট