
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভাবনীয় অগ্রগতি এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের সুবাদে দীর্ঘজীবী মানুষের সংখ্যা বাড়লেও তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখনো চরম উপেক্ষিত। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক টানাপড়েন এবং নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির মতো চেনা খবরগুলোর আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে এক নীরব সামাজিক ব্যাধি। বর্তমান নগর জীবনে জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের একাকিত্ব এবং মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাহীনতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
গত কয়েক দশকে দেশের অর্থনৈতিক অবয়বে বড় পরিবর্তন এসেছে। আমাদের চিরচেনা যৌথ পারিবারিক ঐতিহ্য ভেঙে একক পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে উচ্চশিক্ষা কিংবা উন্নত জীবিকার অন্বেষণে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশের বিদেশ পাড়ি দেয়ার প্রবণতা। এই বাস্তবতায় বৃদ্ধ মা-বাবারা একপ্রকার বাধ্য হয়েই নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছেন। আধুনিক ফ্ল্যাট কালচারের চার দেয়ালের যান্ত্রিকতায় তারা আজ গৃহবন্দী। কর্মব্যস্ত সন্তান ও ডিজিটাল ডিভাইসে মগ্ন নাতি-নাতনিদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সময় মেলে না। চিকিৎসকদের মতে, এই তীব্র একাকিত্ব প্রবীণদের মধ্যে গভীর বিষণ্নতা, আলঝেইমার্স ও হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
আমাদের ধর্মীয় অনুশাসন ও আবহমান বাংলার লোকজ মূল্যবোধে মুরুব্বিদের সর্বোচ্চ সম্মান ও সুরক্ষার নির্দেশ রয়েছে; অথচ আধুনিক নগর সভ্যতায় সেই আত্মিক বন্ধন ও নৈতিকতার চাদরটি দিন দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে। উন্নত বিশ্বে জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ডে-কেয়ার সেন্টার, সামাজিক ক্লাব কিংবা মনস্তাত্ত্বিক সেবা কেন্দ্রের সুব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশে এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা এখনো অপর্যাপ্ত। তা ছাড়া আমাদের সমাজে বৃদ্ধাশ্রম ধারণাকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়, যার ফলে অনেক পরিবার সামর্থ্য থাকার পরও তাদের জন্য কোনো সামাজিক মেলবন্ধনের ব্যবস্থা করতে পারে না। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সমবয়সী সঙ্গ এবং সম্মানজনক পরিবেশ।
একটি জাতি কতটা সভ্য ও প্রগতিশীল, তা নিরূপিত হয় তার শিশু ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার স্তরের ওপর ভিত্তি করে। কেবল আইন প্রণয়ন করে কিংবা সন্তানের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা করলেই প্রশাসনের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রতিটি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও জেলা পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে প্রবীণবান্ধব পার্ক, কল্যাণকেন্দ্র এবং কমিউনিটিভিত্তিক বিনোদনকেন্দ্রের পরিধি বাড়ানো সময়ের দাবি। পাশাপাশি বার্ধক্যজনিত রোগ নিরাময়ে বিশেষায়িত জেরিয়াট্রিক কেয়ার বা চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি।
যারা একসময় নিজেদের জীবনের সেরা সময় দিয়ে পরিবার ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে অবদান রেখেছেন, শেষ বয়সে এসে পরম যত্ন ও মানসিক শান্তি পাওয়া তাদের মৌলিক অধিকার। আজ যদি আমরা এই মানবিক সঙ্কট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নিই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক সহানুভূতিহীন পরিবেশ অপেক্ষা করছে। রাজনৈতিক কোলাহলের ঊর্ধ্বে উঠে আসুন আমরা ঘরের প্রবীণ মানুষটির প্রতি আন্তরিক হই এবং তাদের জীবনের শেষ অধ্যায়কে সশ্রদ্ধ ভালোবাসায় সুন্দর করে তুলি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








