মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

রোম যখন পুড়ছিল, সম্রাট নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। এই ঐতিহাসিক রূপক আমাদের মুখস্থ। ইতিহাস বা অলঙ্কার হিসেবেও পুরনো। কিন্তু এই সত্যটা পুরনো হলেও বারবার ফিরে আসে। উদাহণের প্রয়োজনে বার বার রোমের এই রূপকের দরকার হয় আমাদের। এখনো দরকার হচ্ছে। নতুন করে ‘রোম’ শহরে আগুন লাগেনি, তারপরও। তবে কোনো কারণে যেন আগুন লেগে না যায়, আগে থেকে সতর্ক থাকা ভালো। আসলে কেউ যদি ‘বাঁশি’ বাজাতে চান, সুর তোলেন, এতে সমস্যার কিছু নেই। কিন্তু বাঁশিটা যদি হয় ‘ডাকাতিয়া’, তাহলে ‘দিন-দুপুরে চুরি করে, রাত্তিরে তো কথা নাই।’
বাংলাদেশের বাতাসে যে বাঁশির সুর ভাসছে, সেটি শুনে দেখুন। পত্রিকার পাতা উল্টে দেখুন, এখন হট টপিক- বিমানবন্দর। ওই বন্দরের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদ করে কারাগারে যেতে হয়েছে মেজর (অব:) আখতারুজ্জামানকে। টপিকে আছে রাজধানীর কয়েকটা ঘটনা। রাড্ডার ঘটনায় পদত্যাগ করতে হয়েছে সংরক্ষিত নারী আসনের এক সংসদ সদস্যকে। অ্যাক্টিভিস্ট সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর। ফুটপাথে উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে ঘটে গেছে তুলকালাম। কাওরান বাজারে চাঁদাবাজি নিয়ে হই-হাঙ্গামা।
হাঙ্গামা চলছে, একটা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটা হাঙ্গামা আসছে। আর ‘কিশোর গ্যাং’ নামে ওই ভাইরাসের কূল-কিনারা করা যাচ্ছে না। কূল নেই, কিনার নেই সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। এই পরিস্থিতি এক দিনে তৈরি হয়নি। সরকার যখন ক্ষমতায় বসেছে, তখন থেকেই এসব ‘ভাইরাস’— এর দাওয়াই দিতে থাকলে অনেকটাই উপশমের পথ খুলে যেত। 
পুলিশের দেয়া তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই— এই ছয় মাসে সাতটি প্রধান অপরাধ শ্রেণীতে মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৭৫৬টি। এর আগের ছয় মাসের তুলনায় যা প্রায় আড়াই শতাংশ বেশি। একই সময়ে হত্যা, নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতন এবং এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচনের আগে তারা জনগণকে একটা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে বলে আশা দেখিয়েছিল; কিন্তু এই অল্প কয়দিনে ৪৬৪টি হত্যা মামলা এবং ৬৬৬টি ধর্ষণ মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, বছরের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই শত শত শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, আর পুলিশ সদর দফতরের তথ্য বলছে, দেশজুড়ে শিশু নিখোঁজের ঘটনা ছাড়িয়ে গেছে ১৫ হাজার। যদিও এর বেশির ভাগ উদ্ধার হয়েছে; কিন্তু যে দুই হাজার শিশু এখনো নিখোঁজ, তাদের মা-বাবার চোখের পানির হিসাব কি কোনো পরিসংখ্যানে লেখা থাকবে?
অপরাধ ঘটার পর পুলিশ আসামি ধরছে, গ্রেফতার করছে। এর মানে কি পুলিশ সফল? অপরাধী গ্রেফতার করাটাই কি তাদের সাফল্য? ঘটনার আগেই কেন অপরাধ থামিয়ে দেয়া যাচ্ছে না? অপরাধ করার পর পার পেয়ে যাওয়ার হাজারটা পথ খোলা থাকলে অপরাধীদের বেপরোয়া হয়ে ওঠা স্বাভাবিক। আর এই বেপরোয়া সময়কে সুযোগ হিসেবেও লুফে নিতে পারেন দিল্লিতে বসে থাকা শেখ হাসিনা। ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে, শহর-গ্রামের অলি-গলিতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ব্যানারে মিছিল। প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান যেখানে হয়, এর কাছাকাছি এলাকায়ও মিছিল করেছে তারা। এগুলো কি পুলিশের অজান্তে হচ্ছে? আমাদের গোয়েন্দারা কি এসবের খবর পান না? নাকি তারা জেগে ঘুমান!
সারা দেশের তুলনায় রাজধানী ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটু বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। রাজধানী হলো একটা দেশের ‘চেহারা’। অন্য কোনো দেশ থেকে এই চেহারাটাই দেখা যায়। তা ছাড়া রাজধানীতে থাকেন বিদেশী কূটনীতিকরা। এখানে অন্য পেশার কারণেও বসবাস করেন অনেক বিদেশী। তারা আমাদের দেশটাকে কিভাবে চিনবেন বা চেনেন? দেশের ‘চেহারা’ এই রাজধানীর চেহারা দেখেই। এখানে যদি ছিনতাই থাকে, রাহাজানি থাকে তাহলে এগুলোর শিকার তারাও হয়ে যেতে পারেন, হওয়ার রেকর্ড আছে। গণমাধ্যমে তারা যদি জমি দখল, রাজনৈতিক কোন্দল, চাঁদা তোলার জন্য ক্যাডারবাজির খবর দেখেন, তাদের মূল্যায়নও তৈরি হবে সেভাবেই। আমাদের রাজধানীতে গুলি করতে করতে ঢুকে যাওয়া হয় একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিওতে। এই ঘটনার জেরে পদত্যাগ করতে হয়েছে একজন এমপিকে। বেশ ভালো কথা। ঘটনার সাথে ওই এমপির কী যোগসাজশ ছিলো, সেটি বের করে সেই অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া যেত। তা না করে ‘আইন’ দেখানো হচ্ছে সালমান মুক্তাদির ও তার আত্মীয়দের বেলায়। এতে আমাদের সাইবার ও সাংস্কৃতিক জগতের জন্যও তৈরি হচ্ছে হুমকি। বাইরের দেশে নষ্ট হচ্ছে ভাবমর্যাদা। ভাবমর্যাদা গড়তে সময় লাগে, ভাঙতে না। মিরপুরে প্রসূতি হাসপাতাল গুঁড়িয়ে দিয়ে ‘ভাবমর্যাদা’র বারোটা বাজিয়ে দেয়া হয়েছে। নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে কেবল ‘ভাব’ কেন আমাদের কোনো ধরনের ‘মর্যাদা’ই দাঁড়ানোর কথা না।
যেসব দেশের ভাবমর্যাদা আছে বলে আমরা জানি, সেসব দেশের মর্যাদা এমনি এমনি আসেনি। টোকিও বা সিউলে মাঝরাতে একজন নারী একা হেঁটে যেতে পারেন। সেখানে পুলিশ প্রশাসনে আস্থা আছে মানুষের। কেবল তাদের দেশের মানুষের না, বাইরের মানুষেরও আস্থা আছে। আর এ কারণেই তারা উন্নত।
একটা দেশে শান্তি থাকলে, স্থিতিশীলতা থাকলে বিনিয়োগকারীরা আস্থা পায়। কিন্তু কোনো বিনিয়োগকারী শাহজালাল বিমানবন্দরে নামার পর যদি তার লাগেজ চুরি হয়ে যায়, তাহলে তো প্রথমেই তার আস্থাটা চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয়। আস্থা চুরির মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। নিজের লাগেজ ফিরে পেতে দেন-দরবার করতে হচ্ছে বিদেশীদেরও। আর আমাদের প্রবাসীদেরকে তো বিমানবন্দরে মানুষ বলেই বিবেচনা করা হয় না। একটা ফ্লাইটে বিরোধী দলের ৩৪ জন এমপি এলেন, তাদেরকেও হয়রানির মুখে পড়তে হলো, তাহলে বাকি থাকল কারা? 
এসব ব্যবস্থার সংস্কার করা যাদের দায়িত্ব, তারা নিরোর মতো বাঁশি বাজিয়েই যাচ্ছেন। এই বাঁশিতে কি জনগণের আস্থা আসবে? অথচ চব্বিশের পর তারা তো আশা রেখেছিল? আস্থা রেখেছিল।
একটা দেশ চালাতে টিমওয়ার্কের দরকার হয়। ফুটবলে জিততে এগারোজন খেলোয়াড়কেই সমান মন দিতে হয় মাঠে। খেলতে হয় বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে। একটি রাষ্ট্র চালাতেও প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ নাগরিক— সবাইকে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হয়। খেলায় একজন ফাউল করলে এর দায় পুরো দলের ওপর পড়ে।
চব্বিশের পর আমাদের তো ‘ফাউল প্লে’ হওয়ার কথা না। এর আগে দেখেছি সংসদীয় গণতন্ত্রের নাম করে স্বৈরতন্ত্রের বীভৎস বিস্তার। মানুষের আশা ছিল, নতুন দিনে এই লেবাস খুলে ফেলা হবে; কিন্তু সেটি হয়নি। আবার শুরু হয়েছে দখলবাজি, পেশিশক্তির দাপট,  ভাঙচুর। ধসে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষের ওপর আস্থা। আর রাজনীতি ধীরে ধীরে জাতীয় সংসদ থেকে চলে যাচ্ছে রাজপথের দিকে।
তাহলে কি ‘রোমে’ আগুন লেগে গেছে? না, সঙ্কট এতটা পরিণত হয়নি। তবে ‘রোম’ উষ্ণ হয়ে উঠছে। এই উষ্ণতাকে স্বাভাবিক তাপে ফিরিয়ে আনার পথ এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি। পরিস্থিতি নিয়ে তেমন হতাশ হওয়ারও কিছু নেই। এসব অনিয়ম শক্ত হাতে দমন করতে পারলে সব ঠিক হয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। এর জন্য চাই সদিচ্ছা ও দূরদর্শিতা।
মানুষেরই ভুল হয়, প্রশাসন যারা চালায় তারাও মানুষ। সরকারের ভুল হয়। দেশ চালানোর মতো এত বিশাল কাজে ভুল হওয়া আরো স্বাভাবিক; কিন্তু ভুলের ওপর অটুট থাকা আরো বড় ভুল। একটা ভুল চেপে রাখতে দমন ও পীড়নের পথ বেছে নেয়া আরো বড় ভুল।
ভুল স্বীকার ও শুধরে নিয়ে যে পদক্ষেপ নেয়া হয়, সেখানে ভুল হওয়ার শঙ্কা কম থাকে। আজকের এই বিশৃঙ্খলা আর ভুল থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। নদীর এক পাড় ভেঙে গেলেই সব শেষ হয়ে যায় না, ভাঙা পাড়ের পলি গিয়ে জমে অন্য পাড়ে। সেখানে জেগে উঠে চর। আমাদেরকেও ভুল ভেঙে জাগিয়ে তুলতে হবে নতুন সম্ভাবনার চর।

Advertisement

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত