মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর এক অভিজাত হোটেলে উন্মোচিত হয় আমার বাবার গবেষণা  গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী : ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’। বাবার চার বছরের গবেষণার ফসল এ গ্রন্থ। বহু দিন ধরে বইটির ভাবনা মনে লালন করলেও ২০২০ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে লেখার কাজে মনোনিবেশ করেন। কিন্তু ততদিনে তিনি প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। সেই ব্যাধির ধকল সামলে উঠতে না উঠতে আবার দেখা দেয় প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সার। চিকিৎসাধীন ২০২৪ সালের আগস্টে লন্ডনের একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের প্রাক্কালে বইটির শেষ মুহূর্তের সম্পাদনা সম্পন্ন করেন। একই বছরের ডিসেম্বরে চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি প্রকাশকের হাতে তুলে দেয়া হয়। আজকের এ নিবন্ধের মূল উপজীব্য হলো, গ্রন্থটির গঠনশৈলীর অন্তরালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দু’টি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে বাবার যে  অনুচিন্তা, তা পাঠকের সামনে উন্মোচন করা।
বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের অনুষ্ঠানে লেখক ও গবেষক অধ্যাপক আলী রীয়াজ মন্তব্য করেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী : ইটস্ হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিক্স’ নামক প্রামাণ্য দলিলটি মোটামুটি দু’টি অংশে বিভক্ত একটি গ্রন্থ হিসেবে দেখা যেতে পারে। প্রথম অংশে ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় অংশে ইসলামী আন্দোলনের বিকল্প মডেলগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। অধ্যাপক রীয়াজ উল্লেখ করেন, আমার বাবা সচেতনভাবে গ্রন্থটি এভাবে দু’টি অংশে ভাগ করার পরিকল্পনা করেননি। তারপরও তার পর্যবেক্ষণটি ছিল অত্যন্ত অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ। আমার বাবা প্রায়ই বলতেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১৯৭১ এবং ইসলাম—দু’টিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ ছিল, একটিকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্যটির গুরুত্ব খর্ব করা যায় না। অন্যভাবে বললে, একাত্তরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য স্বীকার করার অর্থ এ নয় যে. দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে ইসলামের অবস্থানকে অস্বীকার করতে হবে; ঠিক তেমনি ইসলামের গুরুত্ব অনুধাবন করার অর্থ একাত্তরে জামায়াতের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা ধামাচাপা দেয়া বা এড়িয়ে যাওয়া নয়। উভয় প্রশ্নের মোকাবেলা করা প্রয়োজন, আমার বাবার এ বিশ্বাসই হয়তো তার গ্রন্থটির কাঠামোকে প্রভাবিত করেছে, যদিও সচেতনভাবে এমন কাঠামো পরিকল্পনা করেননি।
সুতরাং, এ ঐতিহাসিক দলিলটির প্রথম অংশকে মোটামুটিভাবে একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা এবং স্বাধীনতার পর সেই ভূমিকার সাথে যথাযথভাবে বোঝাপড়া করতে দলটির ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা হিসেবে বর্ণনা করা যায়। আলোচনার প্রাসঙ্গিকতায় বাবা বারবার ফিরে এসেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেই সুযোগগুলোর কথায়, যেখানে দলটি বাংলাদেশের জনগণের কাছে নিঃশর্তভাবে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। তার কাছে এটি ছিল একই সাথে একটি নৈতিক দায়িত্ব এবং রাজনীতির একটি মৌলিক প্রয়োজন। যে দল একটি দেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিল, অতীতের সেই অবস্থানের মুখোমুখি না হয়ে সেই দেশকে নেতৃত্ব দেয়ার প্রত্যাশা করতে পারে না। তবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করায় ক্ষমা চাওয়া এবং ফৌজদারি অপরাধের দায় স্বীকার করার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করেছেন তিনি। তার প্রস্তাবিত ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি ছিল একাত্তরে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে— যুদ্ধকালীন নৃশংসতায় দলটির সম্পৃক্ততার অভিযোগের দায় স্বীকার করা নয়। এ ক্ষেত্রে জামায়াতের অস্বীকৃতির অবস্থানকে তিনি সম্পূর্ণরূপে সমর্থন করেছেন।
বাবার দৃষ্টিতে, ১৯৯৪ সালে উচ্চ আদালতে অধ্যাপক গোলাম আযমের নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়া এবং ২০০১ সালে চারদলীয় জোটে থেকে ক্ষমতার অংশীদার হওয়া—এ দু’টি ঘটনা ছিল জামায়াতের জন্য নিজেদের অতীত মুছে ফেলার সবচেয়ে বড় শক্তি অর্জনের মুহূর্ত। কিন্তু অধ্যাপক গোলাম আযমের পক্ষ থেকে এসেছিল কেবল শর্তসাপেক্ষ ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান। আর ২০০১ সালের পর আমার বাবার সহায়তায় যে ক্ষমা প্রার্থনার বিবৃতি প্রস্তুত করা হয়েছিল, তা কখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি ২০০৫ সালে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদে ওই প্রস্তাবটি বিপুল ভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়। জামায়াতের ভুলটি ছিল এখানে— ১৯৯৪ সালের আইনি বিজয় এবং ২০০১ সালের নির্বাচনী সাফল্যকে তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতার সেই অতীতের সাথে জাতীয় মীমাংসা বা পুনর্মিলন হয়ে যাওয়ার প্রমাণ বলে ধরে নিয়েছিল।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে বাবার বিশ্লেষণটি মূলত জামায়াতের সেই হাতছাড়া সুযোগগুলোর সুদূরপ্রসারী মাশুল তুলে ধরেছে। তার পর্যবেক্ষণ ছিল, অতীতের ভুলের জন্য অনুসূচনা প্রকাশ করা হলে পুরো ইতিহাসের পথরেখা বদলে যেতে পারত। তিনি তৎকালীন বেশ কয়েকজন শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়েছেন, যাদের স্পষ্ট মত ছিল, জামায়াত যদি সময়মতো ক্ষমা চাওয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দেখাত, তবে এ বিচারপ্রক্রিয়া হয়তো কখনো অনুষ্ঠিত হতো না।
গ্রন্থটির পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে স্থান পেয়েছে ইসলামী ভাবধারার রাজনীতি ও সংস্কারের ভবিষ্যৎ ভাবনা। তিউনিসিয়া, তুরস্ক ও মরক্কোর মতো দেশগুলোর ইসলামী আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি আলোচনার মাধ্যমে আমার বাবা মূলত এটি খতিয়ে দেখেছেন, জনপরিসরে ইসলামী মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটানোয় জামায়াতের অনুসৃত পন্থা সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি কি না। তিনি ধর্মীয় দাওয়াত ও রাজনৈতিক আন্দোলনকে পরস্পর থেকে পৃথক রাখার জোর সুপারিশ করেছিলেন। তার যুক্তি ছিল, ইসলামের প্রতি অনুগত থাকার অর্থ এই নয় যে, একটি নির্দিষ্ট দলীয় কাঠামো বা রাজনৈতিক কৌশলের সাথে স্থায়ীভাবে আবদ্ধ থাকতে হবে। তিনি মূলত সমাজ কাঠামোর নিচ থেকে উপরের দিকে রূপান্তরের প্রস্তাব দিয়েছিলেন; যেখানে শিক্ষা, গবেষণা, সমাজসেবা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার মাধ্যমে সামাজিক পর্যায়ে পরিবর্তন নিয়ে আসা সম্ভব। আর সমাজ থেকে উৎসারিত সেই পরিবর্তনের জোরালো দাবি পরবর্তীতে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল না করতে সরকারি নীতিনির্ধারণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ দু’টি মৌলিক সঙ্কট চিহ্নিত করতে না পারার পেছনের মূল গলদটি আমার বাবা বইয়ের শুরুতে উন্মোচন করেছেন। তার মতে, জামায়াত একনিষ্ঠ কর্মী বাহিনী তৈরি করতে পারলেও স্বাধীনচেতা চিন্তাবিদ কিংবা আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার উপযোগী নেতৃত্ব তৈরি করতে পারেনি। কর্মীদের নিষ্ঠা, কষ্টসহিষ্ণুতা ও ত্যাগ স্বীকারের প্রতি তার পূর্ণ শ্রদ্ধা ছিল; কিন্তু অন্ধ সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, রুটিন সভা আর গতানুগতিক কর্মসূচির নিগড়ে মেধাকে বন্দী রাখার নীতির বিরুদ্ধে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। জ্ঞানচর্চাকে অবহেলা করা, মুক্তচিন্তার বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শ গ্রহণে অনীহা এবং দলীয় গণ্ডির বাইরে থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়নে অনাগ্রহ প্রকাশের যে ব্যাধি জামায়াতে আছে, তার তিনি তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছেন। জামায়াতের এ কাঠামোগত দুর্বলতা মূলত গ্রন্থটির দুই অংশের যোগসূত্র। যে সাংগঠনিক কাঠামো জামায়াতকে একাত্তরের মুখোমুখি হতে বাধা দিয়েছিল, সেই একই কাঠামো একটি ভিন্ন ভবিষ্যৎ কল্পনা করতেও সীমাবদ্ধ করেছে। আমার বাবা তাই চেয়েছিলেন, দলটি যেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অন্তরে ধারণ করে এবং রাজনীতিতে ইসলামের ভূমিকাকে এক আধুনিক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ মাত্রায় পৌঁছে দেয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ইসলাম— উভয় অনুষঙ্গ সমান গুরুত্বপূর্ণ—আমার বাবার এ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ২০১৯ সালে তিনি জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেন। গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তার জামায়াত ত্যাগের পেছনে দু’টি মৌলিক কারণ ছিল : প্রথমত, জামায়াত যেভাবে সমাজকে ইসলামীকরণের চেষ্টা করছিল, তা তার কাছে অকার্যকর এবং বাস্তবতাবিচ্ছিন্ন মনে হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজেদের ভূমিকার সুরাহা করতে জামায়াতের ধারাবাহিক ও চরম ব্যর্থতা। পরবর্তীতে তিনি আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) উপদেষ্টার পদ থেকেও ইস্তফা দেন। কারণ, দলটি ইসলামী মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। যে দলটির সূচনালগ্ন থেকে তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামের অপার তাৎপর্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হওয়ায় গভীরভাবে হতাশ হয়েছিলেন।
সবশেষে ২০১৭ সালের একটি স্মৃতির কথা উল্লেখ করতে চাই, যখন বাবা আমাদের অধ্যাপক তারিক রমাদানের কাছে নিয়ে যান। আলাপচারিতায় তিনি একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন— যে দেশে ৯০ শতাংশের বেশি জনগোষ্ঠী মুসলিম, সেখানে ইসলামী মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্বের দাবিদার কোনো রাজনৈতিক দলকে অবশ্যই নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, কেন তারা ১০—১২ শতাংশের বেশি ভোট আকর্ষণ করতে পারে না? তার পর্যবেক্ষণটি মূলত আমার বাবার বইয়ে ফুটে ওঠা দু’টি প্রধান উদ্বেগকে একই সুতোয় গেঁথে দিয়েছে। একাত্তরে নিজেদের ভূমিকার মুখোমুখি হতে না পারায় জামায়াত সেইসব মানুষ থেকে দূরে সরে গেছে, যারা হয়তো একদিন তাদের পাশে দাঁড়াতে পারতেন। আবার ঠিক একইভাবে, ইসলামী ভাবধারার রাজনীতিকে সময়োপযোগী করে সাজাতে না পারায় বিকল্প ভাবনার এক বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক রূপরেখা দিতেও ব্যর্থ হয়েছে। নিছক সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ বলে জামায়াত রাজনৈতিক সমর্থন পেয়ে যাবে— এমন ধারণা ছিল ভিত্তিহীন। দলটির জন্য একই সাথে দু’টি বিষয় অর্জন করা অপরিহার্য ছিল—একদিকে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে হৃদয়ে ধারণ করা এবং অন্য দিকে তাদের ইসলামের উপলব্ধি কীভাবে এ দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে তা প্রমাণ করা। 
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং দ্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি

Advertisement