মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

গত ৭ আগস্ট পবিত্র নগরী মক্কায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’, যা আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতীকী পদক্ষেপ। মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহরে একটি সামরিক জোট গঠন নিছক কাকতালীয় নয়।
এই চুক্তি হঠাৎ হয়নি। ভিত্তি তৈরি হয়েছিল এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, যখন রিয়াদে সৌদি আরব ও পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি (এসএমডিএ) স্বাক্ষর করে। সেই সময় থেকেই পাকিস্তানের সৈন্য, যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও আকাশ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৌদি আরবে মোতায়েন শুরু হয়। এক বছরের মধ্যে সেই দ্বিপক্ষীয় বন্ধন তুরস্ককে যুক্ত করে ত্রিপক্ষীয় কাঠামোয় রূপ নেয়। তিনটি দেশ এই প্রাথমিক সদস্য হলেও ভবিষ্যতে এই জোটের পরিধি বাড়তে পারে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেন, ‘জোটটি অন্যান্য দেশের জন্যও উন্মুক্ত থাকবে’। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে মিসরের নাম উঠে এসেছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, ‘কারিগরি বিষয়গুলোর সমাধান হলে মিসর চুক্তিতে যোগ দিতে পারে।’
এমন এক সময়ে মক্কা চুক্তিটি এলো, যখন চলমান কয়েকটি সঙ্কট নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা চলছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ; লেবানন, সিরিয়া ও দখলীকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের আগ্রাসী সামরিক দখলদারিত্ব ও হত্যাকাণ্ড এবং ইয়েমেনে হাউছিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের নিজের যুদ্ধ। 
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামো মূলত যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সঙ্ঘাত এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অননুমেয় পররাষ্ট্রনীতি আরব রাজতন্ত্রগুলোর মনে পুরনো নিশ্চয়তা নাড়িয়ে দিয়েছে। ওয়াশিংটন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, মিত্রদের নিরাপত্তা তাদেরই নিশ্চিত করতে হবে। এই বাস্তবতাই সৌদি আরবকে বিকল্প খুঁজতে বাধ্য করেছে।
মক্কা জোটে প্রতিটি দেশ এসেছে ভিন্ন প্রয়োজন নিয়ে। সৌদি আরবের বিশাল অর্থনৈতিক সক্ষমতা আছে (২০২৫ সালে সামরিক ব্যয় ৮৩.২ বিলিয়ন ডলার); কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবে বাইরের শক্তিনির্ভর। তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী এবং বায়রাক্তার ও আকিনজি ড্রোনসহ উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প। তবে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ইসরাইল-গ্রিস-সাইপ্রাসের শক্তিশালী জোটের মুখে আঙ্কারা নিজেই নিঃসঙ্গ বোধ করছে। আর পাকিস্তানের রয়েছে মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তি এবং বাস্তব যুদ্ধে অভিজ্ঞ বিশাল সেনাবাহিনী, বিনিময়ে পাকিস্তান খুঁজছে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতির জন্য অক্সিজেন ও ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগত সমর্থন।
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা, এক সদস্যের ওপর হামলা হলে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে, অনেকটা ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর ধাঁচে। তবে ন্যাটোর মতোই এখানেও স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধ ঘোষণার বাধ্যবাধকতা নেই; নির্দিষ্ট বাহিনী, বাজেট বা প্রতিক্রিয়ার বিস্তারিত এখনো অস্পষ্ট। বাস্তবায়নের জন্য গঠিত হচ্ছে মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি ও সৌদি আরবে একটি সচিবালয়। 
এই চুক্তির প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে সরাসরি দক্ষিণ এশিয়ায় আঘাত হেনেছে। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বৈরিতার পটভূমিতে ‘এক দেশ আক্রান্ত মানে তিন দেশ আক্রান্ত’ নীতি নয়াদিল্লির জন্য নতুন এক ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের ঠিক আগ মুহূর্তে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছেন বলে খবর এসেছে, যা স্পষ্টতই ইঙ্গিতবাহী। জেরুসালেম পোস্ট লিখেছে, এই চুক্তি ইসরাইল-ভারত সম্পর্ক আরো গভীর করবে। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে। 
ভারতের উদ্বেগ শুধু রাজনৈতিক নয়, কৌশলগতও। তুরস্ক-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা দ্রুত বাড়ছে, যার অধীনে রয়েছে আধুনিক সশস্ত্র ড্রোন, নিখুঁত লক্ষ্যভেদী অস্ত্র, আধুনিক করভেট যুদ্ধজাহাজ। মক্কা চুক্তির যৌথ উৎপাদন কাঠামোয় সৌদি অর্থায়ন যুক্ত হলে পাকিস্তানের সামরিক আধুনিকায়ন আরো ত্বরান্বিত হবে, যার প্রভাব পড়বে ভারতের পশ্চিম সীমান্তে। ভারত পাকিস্তানের সাম্প্রতিক যুদ্ধে যার নজির বিশ্ব দেখেছে। একই সাথে সৌদি আরবের সাথে ভারতের নিজস্ব গভীর সম্পর্ক— তেল সরবরাহ, গোয়েন্দা সহযোগিতা, ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর— এসবও এখন নতুন হিসাব-নিকাশের মুখে। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার যেকোনো সঙ্ঘাতে সৌদি আরবের পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়ানো ভারতের জন্য কূটনৈতিক ও কৌশলগত সামরিক চাপ তৈরি করবে।   
আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো পরিবর্তনের এই হাওয়ার প্রভাব বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও পড়েছে। গত ২৪ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং মুসলিম দেশগুলোর এই নিরাপত্তা জোটে অংশগ্রহণ অস্বাভাবিক কিছু হবে না। বিষয়টিকে সরকার ইতিবাচকভাবেই দেখছে।
তবে ‘আগ্রহ প্রকাশ’ আর ‘পূর্ণ সদস্যপদ’ এক জিনিস নয়। বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তির সুবিধা যেমন রয়েছে তেমনি ঝুঁকিও কম নয়। সৌদি আরব ও তুরস্কের সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্কের সম্প্রসারণ, সৌদি আরবের বিশাল বিনিয়োগের সম্ভাবনা, পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের নতুন মাত্রা, প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি অর্জনের সুযোগ, মুসলিম বিশ্বে কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালীকরণ ইত্যাদি সুবিধা পাবে। অন্য দিকে ভারতের দিক থেকে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হওয়া, জোটটি ইরানবিরোধী অবস্থান নিলে ইরানের সাথে সম্পর্ক জটিল হওয়ার আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা অংশীদারদের সাথে নীতিগত অমিল এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত কৌশলগত স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশের পরররাষ্ট্রনীতির মৌলিক দিক নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হতে পরে। 
এই জোট কূটনীতির সাথে রোহিঙ্গা সঙ্কটকেও যুক্ত করা জরুরি। জোটের তিন দেশকেই বাংলাদেশ বলতে পারে, মক্কা কাঠামো যদি মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হয়, তবে রোহিঙ্গা সঙ্কটও তার একটি মানবিক-নিরাপত্তা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। 
একই সাথে ভারতের উদ্বেগের বিষয়েও কৌশল নির্ধারণ জরুরি। ভৌগোলিক নৈকট্য ও ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার বাস্তবতায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে সহযোগিতা ও সতর্কতা দুটোরই প্রয়োজন আছে। মক্কা চুক্তির সাথে সম্পর্ক বাড়ালেও এটিকে কোনো দেশবিরোধী কৌশল হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না; বরং প্রতিবেশীদের সাথে পৃথক নিরাপত্তা সংলাপ অব্যাহত রাখতে হবে। ইরানের সাথেও সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখা প্রয়োজন। জোটটি ভবিষ্যতে ইরানবিরোধী অক্ষে রূপ নিলে বাংলাদেশকে সতর্কতার সাথে অংশগ্রহণের মাত্রা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের সাথে সহযোগিতা বাড়িয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের চেষ্টাও চালিয়ে যেতে হবে।
বাংলাদেশের স্বার্থের কেন্দ্রে আছে জ্বালানি নিরাপত্তা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৬৩ শতাংশ এসেছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাক থেকে, যার মধ্যে একাই সৌদি আরবের অংশ প্রায় ৩৫ শতাংশ। বিশ্বের এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এবং প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই জোট যদি সত্যিই সঙ্ঘাত প্রতিরোধ করে ও অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনে, তাহলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। কিন্তু এটি যদি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা বা পাল্টাপাল্টি উত্তেজনার জন্ম দেয়, তবে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেই তার আঘাত লাগবে। তাই ঢাকার কূটনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত আবেগ দিয়ে কোনো জোটকে সমর্থন করা নয়; বরং নৌপথ উন্মুক্ত রাখা, জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যকরণ এবং উত্তেজনা প্রশমনের কূটনীতিকে সমর্থন করা।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ এখনো এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক সদস্যপদের প্রস্তাব পায়নি। জোটের কোনো সদস্য এখনো বাংলাদেশের সদস্য হওয়া নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তাই এই মুহূর্তে বিষয়টি বাস্তব সিদ্ধান্তের চেয়ে কৌশলগত আলোচনার পর্যায়ে। ঠিক এই কারণে এখনই ভাবনা-চিন্তার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। তাৎক্ষণিক পূর্ণ সদস্যপদের বদলে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো পর্যবেক্ষক বা সহযোগী সদস্যের মর্যাদা নিয়ে সম্পর্ক শুরু করা। এতে সম্পর্কও গড়ে উঠবে, আবার স্বয়ংক্রিয় সামরিক দায়বদ্ধতাও এড়ানো যাবে। এর আগে চুক্তির সনদ, পারস্পরিক প্রতিরক্ষার শর্তাবলি, কমান্ড কাঠামো ও সঙ্কট-মোকাবেলার পদ্ধতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ জরুরি। এরপর জাতীয় স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া। 
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিছক কোনো সামরিক দলিল নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ছাতার সম্ভাব্য এক কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা, যার ঢেউ ইতোমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একই সাথে সুযোগ ও ঝুঁকির সমীকরণ। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বিচক্ষণ নীতি হবে এই চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান নয়, আবার তাড়াহুড়ো করে পূর্ণ সদস্যপদও নয়; বরং ধাপে ধাপে সহযোগিতা, সতর্ক পর্যবেক্ষণ, জাতীয় স্বার্থের নিরন্তর মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত অর্থাৎ পূর্ণ সদস্য পদের সিদ্ধান্ত। ভারত, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র বা চীন— কাউকে শত্রু না বানিয়ে, আবার কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে, জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক বহুমুখী কূটনীতি ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের পথ। 
লেখকদ্বয় : ড. মোহাম্মদ আবদুর রব : সাবেক অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং মো: গোলাম সারওয়ার : অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর, সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ অ্যান্ড থটস (কাস্ট)

Advertisement