মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

আফগান জাতি বছরের পর বছর ধরে লড়াই করে টিকে আছে। এ লড়াই কখনো আগ্রাসী শক্তির উৎখাতে, কখনো চাপিয়ে দেয়া নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে। অদম্য সাহস ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে তারা রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির পথে এগিয়ে চলেছে। এ লড়াই কেবল অভ্যন্তরীণ গোত্রীয় কোন্দলের বিরুদ্ধে নয়; বরং ব্রিটিশ, রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে। হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুর জীবন, সহায়-সম্পত্তি, কোটি কোটি মানুষের বাস্তুভিটা, উপত্যকাজুড়ে ফলের ক্ষেত জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে গেছে; কিন্তু আফগান জাতি মাথা নত করেনি। 
তিন পরাশক্তিকে নাকে খত দিয়ে বিদায় নিতে বাধ্য করেছে। আফগানিস্তানের মাটিতে কেবল সোভিয়েত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই সম্মিলিতভাবে প্রায় ৪০ হাজারের কাছাকাছি সামরিক ও বেসামরিক কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। অ্যাংলো-আফগান যুদ্ধে (১৮৩৯-৪২) ব্রিটিশ ও ভারতীয় বাহিনীর প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার সদস্য আফগান যোদ্ধাদের হাতে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যান। অন্য দিকে যুগ যুগ ধরে চলা এই যুদ্ধগুলোতে যোদ্ধা ও বেসামরিক নাগরিক মিলিয়ে আফগানিস্তানের নিজের ২০ লক্ষাধিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। 
আফগানদের সীমাহীন ধৈর্য, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করার মনস্তাত্ত্বিক সাহস এবং বাইরের শক্তির আধিপত্য মেনে না নেয়ার শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য আফগানিস্তানকে বারবার ইতিহাসের বড় বড় সাম্রাজ্যের জন্য একেকটি কবরে পরিণত করেছে। ধর্মীয় বিশ্বাস আফগানদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান মনস্তাত্ত্বিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে যুগযুগ ধরে।
দীর্ঘ যুদ্ধ, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ধকল কাটিয়ে আফগানিস্তান বর্তমানে অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও কৃষি খাতের ওপর ভর করে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পথে এগিয়ে চলেছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের মে মাসের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী, নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও দেশটিতে ৪.৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাইকা, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তা ছাড়াই কাবুল কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু অর্থনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছে। এতে বিশ্ববাসী বিস্ময়ে হতবাক। 
দেশটির বর্তমান সরকার মূলত বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভর না করে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় (যা ২০২৫ সালে জিডিপির ১৯.৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে) এবং কয়লা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ রফতানির মাধ্যমে নিজেদের খরচ ও প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন করছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে বড় কোনো আন্তর্জাতিক ব্যাংক আফগানিস্তানের সাথে লেনদেন করতে না পারায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ বাস্তবায়ন করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। তারপরও আফগান সরকার থেমে নেই।
চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে, ২৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ কোশ টেপা খাল খনন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প (যেমন— কাজাকি, পাশদান, পরান্দা বাঁধ নির্মাণ), আনারের মতো কৃষিপণ্যের আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন, কুওনার নদী থেকে সরাসরি দারুনতা বাঁধে পানি স্থানান্তর, ট্রান্স-আফগান রেলওয়ে (উজবেকিস্তান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান) সড়ক নির্মাণ, ১০ প্রদেশে বিদ্যুৎ সাবস্টেশন নির্মাণ, ইরানের সাথে খাফ-হিরাত রেললাইন এবং তুর্কমেনিস্তানের সাথে তোরাগুন্ডি লাইনের আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ। কিছু রেললাইন ইতোমধ্যে চালু হয়ে গেছে, ফলে আফগানিস্তানের লজিস্টিক বা পরিবহন খরচ অনেক কমে গেছে। পাকিস্তানের সীমান্ত জটিলতার কারণে আফগানিস্তান এখন ইরান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর মাধ্যমে সহজেই ভারত, চীন ও ইউরোপে পণ্য পৌঁছাতে পারছে, যা তাদের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সাহায্য করছে।
আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি (৭.৬ শতাংশ) এবং দারিদ্র্যের মতো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে কোশ টেপা খালের মতো মেগা অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুট তৈরি এবং আনারের মতো কৃষিপণ্যের আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ নির্দেশ করে, দেশটি স্বনির্ভর ও উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক উন্নতির পথে রয়েছে। আফগানিস্তানের নিজস্ব রাজস্ব বাজেট থেকে ১৩ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে দেশের ১০টি প্রদেশে ১৬টি নতুন বিদ্যুৎ সাবস্টেশন নির্মাণের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রকৌশলীদের দ্বারা তৈরি এই সাবস্টেশনগুলো চালু হলে দেশের প্রায় ১০ লাখ পরিবার এবং এক হাজার ১০০টি শিল্প-কারখানা সরাসরি ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ পাবে। 
দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যুৎ বিতরণের জন্য বড় ধরনের অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। উজবেকিস্তানের অর্থায়নে এবং আফগান প্রকৌশলীদের সহায়তায় প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প চলমান রয়েছে, যা ২০২৭ সালের এপ্রিলের মধ্যে শেষ হবে। আফগানিস্তান বর্তমানে তার ভঙ্গুর বিদ্যুৎ খাতকে স্বনির্ভর করতে অভ্যন্তরীণ উৎস— বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর ব্যাপক জোর দিচ্ছে। একই সাথে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সচল রাখতে তারা আঞ্চলিক সংযোগ ও আমদানির ওপরও বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে।
আফগানিস্তানের বর্তমান অর্থনীতির সবচেয়ে বড় এবং গেম-চেঞ্জার প্রকল্প হলো কোশ টেপা খাল। এটি উত্তর আফগানিস্তানের একটি কৃত্রিম নদী প্রকল্প, যা আমু দরিয়া থেকে পানি আনবে। খালটি প্রায় ২৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১০০ মিটার চওড়া। এই মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের খননকাজ প্রায় ৯৮ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। প্রায় দুই হাজার ভারী যন্ত্রপাতি ও আফগান প্রকৌশলীদের সহায়তায় এর কাজ রেকর্ড গতিতে এগিয়ে চলছে। খালটি সম্পূর্ণরূপে চালু হলে আফগানিস্তানের প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ হেক্টর মরুভূমি কৃষিজমিতে রূপান্তরিত হবে। এর ফলে গম ও অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদনে দেশটিকে আর আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে না, যা তাদের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে।
কৃষি খাত আফগানিস্তানের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এবং বর্তমানে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রফতানি অনেক বেড়েছে। আফগানিস্তান বিশ্বের অন্যতম সেরা আনার উৎপাদনকারী দেশ। বছরে দেশটিতে প্রায়  ছয় লাখ টন আনার উৎপাদন হয়। আগে আফগানিস্তান শুধু কাঁচা ফল রফতানি করত। বর্তমানে দেশটিতে বিশেষত হেরাত প্রদেশে আধুনিক জুস ও কোল্ড স্টোরেজ ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। প্রক্রিয়াজাত এই আনারের জুস আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি লিটার চার ডলার পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ২০২৩ সাল থেকে আফগানিস্তান সফলভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কার্বোনেটেড আনারের জুস (যেমন— ‘ঝযবভধ’ ব্র্যান্ড) রফতানি শুরু করেছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হালাল সার্টিফাইড আফগান জুসের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

Advertisement

খনিজসম্পদের ভাণ্ডার
আফগানিস্তানে যে পরিমাণ খনিজসম্পদ রয়েছে তা বিস্ময়কর। শুধু খনিজসম্পদ বিক্রি করেই আফগানিস্তান একটি সাহায্যনির্ভর দেশ থেকে এশিয়ার অন্যতম ধনী ও স্বনির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সাহায্য বন্ধ হওয়ার পর বর্তমানে খনিজসম্পদই দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজস্বের প্রধানতম উৎস হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, আফগানিস্তানের মাটির নিচে আনুমানিক তিন হাজার বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের খনিজসম্পদ রয়েছে। খনিজগুলোর মধ্যে— লিথিয়াম, তামা, লোহা, কয়লা, জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও মূল্যবান পাথর অন্যতম। খনি খাত থেকে বার্ষিক আয় বর্তমানে প্রায় ৭০ কোটি মার্কিন ডলার, যা তাদের মোট অভ্যন্তরীণ রাজস্বের একটি বড় অংশ।
বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং স্মার্টফোনের ব্যাটারির জন্য লিথিয়াম অপরিহার্য। আফগানিস্তানের গজনি ও নুরিস্তান প্রদেশে এত বিপুল লিথিয়ামের মজুদ রয়েছে, যা এককভাবে পুরো বিশ্বের লিথিয়ামের চাহিদা মেটাতে সক্ষম বলে ধারণা করা হয়। বলিভিয়ার পরেই এটি বিশ্বের বৃহত্তম মজুদ হতে পারে। লোগার প্রদেশের ‘মেস আয়নাক’ হলো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অবিস্ফোরিত তামার খনি। এখানে প্রায় ১১.৩ মিলিয়ন টন উচ্চমানের তামা মজুদ রয়েছে। বামিয়ান প্রদেশের হাজিগাক খনিতে এশিয়ার বৃহত্তম লোহার মজুদ রয়েছে। এখানে প্রায় দুই বিলিয়ন টন লোহা রয়েছে, যার মান উন্নত। উত্তর আফগানিস্তানের ‘আমু দরিয়া’ অববাহিকায় প্রায় ৮৭ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে। এ ছাড়া বাদাখশান ও পঞ্জশিরে রয়েছে বিশ্বখ্যাত পান্না রুবি, নীলকান্তমণি, সোনা এবং বিপুল মার্বেল পাথর।
আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত আমু দরিয়া অববাহিকা দেশটির খনিজ জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল। ২০২৫ সালজুড়ে আমু দরিয়া অববাহিকা থেকে উৎপাদিত তেল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে আফগান সরকার প্রায় ১৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। ২০২৫ সালে এই অববাহিকা থেকে প্রায় দুই লাখ ৬৮ হাজার ৯৮৯ টন অপরিশোধিত তেল উৎপাদন হয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ বাজারে তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিক্রি করা হয়। এর ফলে আফগানিস্তানের জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমেছে।

বৈশ্বিক কূটনৈতিক সম্পর্ক
আফগানিস্তানের বর্তমান ইসলামিক আমিরাত সরকারের সাথে বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দেশই বর্তমান আফগান সরকারকে আইনগতভাবে স্বীকৃতি দেয়নি, তবে অনেক দেশের সাথেই তাদের বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক সম্পর্ক সচল রয়েছে। অন্য দিকে চীন, রাশিয়া, ইরান এবং মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক দিন দিন আরো মজবুত হচ্ছে। 
উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং কাজাখস্তানের সাথে আফগানিস্তানের রেল, বিদ্যুৎ এবং খনিজ বাণিজ্য নিয়ে নিবিড় কূটনৈতিক সম্পর্ক সচল রয়েছে। রাশিয়া ও ইরানের সাথে আফগানিস্তানের গভীর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। পাকিস্তান, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে আফগানিস্তানের নিয়মিত কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক যাতায়াত রয়েছে। কাতার মূলত আফগানিস্তান ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে। চীন বিশ্বের একমাত্র দেশ, যারা আফগানিস্তানের বর্তমান সরকারকে পূর্ণ কূটনৈতিক মর্যাদা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে আফগানিস্তান অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলেছে। অভ্যন্তরীণ সম্পদের ব্যবহার, কৃষি সম্প্রসারণ, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাঁধ নির্মাণ করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, জুস প্ল্যান্ট স্থাপন, খনিজসম্পদ উত্তোলন আফগানিস্তানের চেহারা বদলে দিতে পারে। আফগান জাতি স্বনির্ভরতার ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে। 
লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
drkhalid09@gmail.com