
সম্প্রতি জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দু’টি বড় ঘটনা ঘটেছে। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে নতুন স্থায়ী সদস্য হতে ব্যগ্র স্বঘোষিত বিশ্বগুরু ভারতের আশার গুড়ে বালু ঢেলে দিয়েছেন। ভারতের নাম ওঠার আগেই আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বহীনতার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিশ্বের নজর ঘুরিয়ে দিয়েছেন ভিন্ন দিকে। এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির আসরে একটি মাস্টারস্ট্রোক। কিন্তু তার চেয়েও অভাবনীয় এক ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছেন নেপালের তরুণ প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ, যিনি সচরাচর বালেন শাহ নামে পরিচিত।
বালেন শাহ এমন এক বলিষ্ঠ, সাহসী ও তাৎপর্যপূর্ণ বক্তৃতা পেশ করেন যা মুহূর্তে পুরো বিশ্বের মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে।
জাতিসঙ্ঘের এই সেশনে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট অর্থাৎ পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প, দ্বিতীয় পরাশক্তি চীনের শি জিনপিং, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর নেতারা এবং খোদ আমেরিকাকে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে দৃশ্যমানভাবে পর্যুদস্ত করার পথে থাকা ইরানের নেতা মাসুদ পেজেশকিয়ান ভাষণ দেন। ভাষণ দেন মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষুদ্র কিন্তু আমেরিকাকে নিয়ন্ত্রণের মতো অমিত শক্তিশালী দেশ ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও।

ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের বক্তব্য ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে, হচ্ছে। সেটি প্রত্যাশিত শুধু নয়, এর কারণও বোধগম্য। যুদ্ধরত দুই দেশের নেতাদের বক্তব্যে আশাবাদের কোনো আলো দেখা যাবে কি না, নাকি আরো যুদ্ধ, মৃত্যু ও ধ্বংসের বার্তা দেবেন, জানার আগ্রহ ছিল বিশ্বের সব সচেতন মানুষের। কিন্তু হতাশ করেছেন ট্রাম্প। তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে নিয়োজিত বিশ্বসভায় দাঁড়িয়ে সদম্ভে হিংসার বাণী ঘোষণা করেছেন। একটি স্বাধীন দেশ, একটি প্রাচীন সভ্যতাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার নির্লজ্জ হুমকি দিয়েছেন। অন্য দিকে পেজেশকিয়ান শান্তির কথা, আলোচনায় আগ্রহের কথা বলেছেন। অবশ্য তার দেশের শর্তে। আন্তর্জাতিক সব আইনকানুন লঙ্ঘন করে আমেরিকা ও ইসরাইলের সম্পূর্ণ অন্যায় ও অবৈধ হামলার শিকার ইরানের শান্তির প্রতি অঙ্গীকার ইতিবাচকভাবে দেখেছে বিশ্ব।
নেতানিয়াহুকে নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি, যেটি হয়েছে তাকে বলা যায় সমালোচনা। সেটি তার পৈশাচিক প্রতিহিংসা, জিঘাংসা, গণহত্যা ও নির্বিচার মিথ্যাচারের পরিণতিতে সৃষ্ট ঘৃণার কারণে। তার বক্তৃতা প্রায় সব দেশের প্রতিনিধি বর্জন করেন। একরকম ফাঁকা অডিটোরিয়ামে বক্তব্য রাখেন তিনি। সেখানেও বলেছেন, গাজায় গণহত্যার যে অভিযোগ করা হচ্ছে সেটি শুধু অসত্যই নয়, শতাব্দীর সেরা মিথ্যা। সমালোচনায় এসব প্রসঙ্গই ছিল মুখ্য। এসব ঘটনায় ইসরাইল বিশ্ববাসীর কাছে কতটা ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছে তা স্পষ্ট হয়ে যায়।
আরো অসংখ্য দেশের প্রভাবশালী, প্রবীণ, প্রাজ্ঞ নেতা ভাষণ দেন সাধারণ পরিষদে। তারা সেভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেননি। আলোচনায় আসেননি। তবে আলোচনায় এসেছেন তরুণ বালেন্দ্র শাহ, যিনি তারুণ্যের গণ-অভ্যুত্থানের পর গত মার্চে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসেন।
এবারের অধিবেশনে বালেন্দ্র শাহ ছিলেন সবচেয়ে কম বয়সী রাষ্ট্রনেতা। নেপালের ইতিহাসেও সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী তিনি।
তো নেপালের মতো গ্লোবাল সাউথের একটি ছোট, গরিব ও ভূরাজনৈতিক প্রভাবশূন্য দেশের প্রতিনিধি, এতটা গুরুত্ব পাচ্ছেন কেন? কারণ মাত্র ৩৬ বছরের এই তরুণ নেতার ভাষণে এমন কিছু ছিল, যা উপেক্ষা করার উপায় নেই। শুরু থেকেই তার বক্তব্য উপস্থিত বিশ্বনেতাদের এবং বিশ্ব মিডিয়াসহ আগ্রহী সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি কথা বলেন মাত্র ১৪ মিনিট। এইটুকু সময়ের মধ্যে তিনি কী এমন কথা বললেন যা মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হলো? সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে পাঠকদের জানিয়ে রাখি, জাতিসঙ্ঘের ওয়েবসাইটে বালেন্দ্রর ভাষণ দেখেন লাখ লাখ মানুষ। শুধু তাই নয়, এই ভাষণ নিয়ে সারা বিশ্বে শত শত ভিডিও কনটেন্ট, নিউজ ও বিশ্লেষণমূলক ভিডিও তৈরি ও সম্প্রচার হয়েছে, যা টিকটক, ফেসবুক ও ইউটিউবে লাখ লাখ ভিউ পেয়েছে।
তার ভাষণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, এই জেন-জি (এবহ-ত) নেতা প্রথাগত কূটনৈতিক গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি ও স্পষ্ট ভাষায় বিশ্বনেতাদের সামনে জলবায়ু সঙ্কট ও বৈশ্বিক বৈষম্যের সমালোচনা করেছেন। তুলে ধরেছেন মানবিক আবেদন ও সুচিন্তিত প্রস্তাব।
বলা দরকার, বালেন্দ্র নিজে একজন প্রকৌশলী এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের ওপর তার উচ্চতর ডিগ্রি আছে। স্বাভাবিকভাবেই ভাষণে তার জানাশোনার প্রতিফলন ঘটেছে।
মূলত পুরো ভাষণটি ছিল দুর্দান্ত ও সাহসী। ভাষাশৈলী ছিল সমৃদ্ধ ও যুক্তির মেধায় শাণিত। কিছু বক্তব্য ছিল চৌম্বক গুণসম্পন্ন যা উদ্ধৃত হওয়ার মতো। পৃথিবীর মানুষ যেমন কিছু বাণী সব কালে মনে রাখে। যেমন আব্রাহাম লিঙ্কনের গেটিসবার্গ ভাষণ, যা তিনি শুরু করেন এভাবে—
‘আজ থেকে চার কুড়ি সাত বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষরা এই মহাদেশে একটি নতুন জাতি গঠন করেছিলেন, যা স্বাধীনতার ভাবনায় জন্ম নিয়েছিল এবং এই প্রতিজ্ঞায় উৎসর্গীকৃত ছিল যে, সব মানুষকে সমান করেই সৃষ্টি করা হয়েছে।’
যেমন চিরন্তন বাণী হয়ে আছে ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’-খ্যাত মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের সেই স্বপ্নের কথা, যখন তিনি উচ্চারণ করেন, ‘যখন আমরা স্বাধীনতাকে ঝঙ্কৃত হতে দেবো, যখন আমরা প্রতিটি গ্রাম এবং প্রতিটি পাড়া, প্রতিটি রাজ্য এবং প্রতিটি শহর থেকে এটিকে প্রতিধ্বনিত করব, তখন আমরা সেই দিনের আগমন ত্বরান্বিত করতে পারব যখন ঈশ্বরের সব সন্তান— কালো মানুষ এবং সাদা মানুষ, ইহুদি এবং অ-ইহুদি, প্রোটেস্ট্যান্ট এবং ক্যাথলিকরা— হাত ধরাধরি করে সেই পুরনো নিগ্রো আধ্যাত্মিক গানটি গাইতে পারবে— ‘অবশেষে মুক্ত! অবশেষে মুক্ত! সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমরা অবশেষে মুক্ত!’
বালেন্দ্রকে লিঙ্কন বা কিংয়ের সাথে তুলনা করছি না। শুধু তার বক্তব্যের ওজন বোঝানোর জন্য উল্লেখ করছি।
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে দাঁড়িয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য জলাবায়ু অর্থায়নের গুরুত্ব প্রসঙ্গে বালেন্দ্র বলেন, জলবায়ু অর্থায়নকে আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধায় পরিণত করা উচিত নয়, যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে তাদের সাহায্যের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করতেই বছরের পর বছর পার করতে হয়। ‘যখন কোনো বাড়িতে আগুন লাগে, তখন আমরা সেই পরিবারকে সাহায্যের জন্য ৫০টি ফর্ম পূরণ করতে বলি না। আমরা সরাসরি পদক্ষেপ নিই।’ জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রকৃত অর্থ এটিই হওয়া উচিত।
অথবা ধরুন এই কথাটি, ‘তারা যুদ্ধের জন্য ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করে, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ পৌঁছে দিতে পারে, অথচ গরিব দেশের কৃষকের যখন সারের দরকার হয়, তখন তা সময়মতো পৌঁছে না।’
বালেন্দ্রর এরকম গুটিকয়েক বক্তব্যই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটররা হাইলাইট করেছেন। এগুলো হয়ে উঠেছে তাদের ফোকাসের মূল জায়গা।
সুতরাং পাঠক বুঝতে পারছেন, একজন তরুণ নেতা কিসের জোরে বিশ্বের মনোযোগ নিজের দিকে টেনে নিলেন। কিভাবে তার ভাষণ বিশ্বজুড়ে এত ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেল।
তবে এর বাইরেও কিছু কারণ আছে। তিনি আমলাদের লিখে দেয়া ভাষণের কপি দেখে পাঠ করেননি। সরাসরি ও তাৎক্ষণিক বক্তৃতা দিয়েছেন ঝরঝরে ইংরেজিতে, কোনোরকম জড়তা ছাড়াই।
তার জোরালো ও বাস্তবসম্মত যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য শ্রোতাদের, বিশেষ করে তরুণদের মুগ্ধ করে। বৈশ্বিক এই বড় মঞ্চে বক্তব্য দেয়ার সময়ও তার চোখে ছিল কালো আয়তাকার সানগ্লাস, যা তার নিজস্ব সিগনেচার বলা যায়। মাথায় ছিল ঐতিহ্যবাহী নেপালি টুপি এবং পরনে কালো ব্লেজার। তার এই ভিন্নধর্মী সজ্জা তরুণরা পছন্দ করে।
নেপালের তরুণ প্রধানমন্ত্রী কোনো নীতিকথা বা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে ভাষণ শুরু করেননি। তিনি কথা শুরু করেন নিজ দেশের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় হতাহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে। এতে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। শ্রোতারা কান খাড়া করেন।
নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়কে তিনি ‘হিমালয় সুনামি’ হিসেবে আখ্যা দেন। দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেন, কিভাবে কম কার্বন নিঃসরণকারী দেশ (মাত্র ১ শতাংশ) হওয়ার পরও নেপালকে বড় দেশগুলোর ভুলের কারণে মারাত্মক মাশুল দিতে হচ্ছে এবং তিনি বড় দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ ও জলবায়ু ন্যায্যতার (ঈষরসধঃব ঔঁংঃরপব) দাবি জানান।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় নেপাল, ভারত ও চীনকে এক হয়ে হিমালয় অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গবেষণাগার (ঐরসধষধুধহ ঈষরসধঃব জবংরষরবহপব গবপযধহরংস) তৈরির যে প্রস্তাব বালেন্দ্র দিয়েছেন, পরিবেশবাদী ও পরিবেশ বিশ্লেষকরা সেটির দারুণ প্রশংসা করছেন। তাদের ভিডিওতে এ বিষয়টি হাইলাইট হচ্ছে বিশ্বজুড়ে।
সবশেষে ভিন্ন প্রসঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণ শেষ করেন একটি হিন্দি শ্লোক উচ্চারণ করে। শ্লোকটি এরকম—
‘ভগবান পশুপতিনাথলে বিশ্বকো কল্যাণ গরুন।
য়ো বিশ্ব বুদ্ধলে দেখায়েকো বাটোমা হিন্ডন সকোস।’
অর্থাৎ— ভগবান পশুপতিনাথ বিশ্বের কল্যাণ করুন। এই পৃথিবী যেন বুদ্ধের দেখানো পথে চলতে পারে।
একই সাথে হিন্দু দেবতা পশুপতির আশীর্বাদ কামনা এবং বৌদ্ধগুরু ভগবান বুদ্ধের পথ অনুসরণের আকাক্সক্ষা তুলে ধরার মধ্য দিয়ে বালেন্দ্র প্রমাণ রাখলেন, তিনি নিছক কোনো বাস্তুবিদ নন, দূরদর্শী ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন রাজনীতিকও।
নেপালের জনসংখ্যার দু’টি বড় অংশ হিন্দু ও বৌদ্ধ। উভয় সম্প্রদায়ের মানুষকে, নেপালের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে তিনি একটি শ্লোকে তুষ্ট করলেন।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে এক দিকে আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক সমস্যা-সঙ্কটের উপস্থাপন, সমাধানের দাবি তুলে ধরার পাশাপাশি বিশ্বমোড়লদের সীমাবদ্ধতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার এই যে দুরন্ত সাহস, এর চেয়ে একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আর কী চাইতে পারে তার দেশ!
আমরা বালেন্দ্রর মধ্যে এক স্বাধীনচেতা বিশ্বনেতার ছায়া দেখছি। যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত
mujta42@gmail.com
_GDN_970x90px_English.gif&w=2048&q=75)








