মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

সম্প্রতি সরকার ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ-২০২৬’ জারি করেছে, যা দেশের লাখ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েছে। নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের এই মহতি উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে নতুন গেজেটের অনুচ্ছেদ ৫(খ) অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের (Pay Fixation) যে সূত্র ব্যবহার করা হয়েছে তার ফলে মাঠপর্যায়ে একটি বড় ধরনের গাণিতিক অসঙ্গতি ও বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে। বেতন কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যা য়, এই রূপান্তর পদ্ধতির কারণে জুনিয়র বা নতুন কর্মচারীদের তুলনায় প্রবীণ ও অভিজ্ঞ কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে কম বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাচ্ছেন, যা পেশাগত সন্তুষ্টির ক্ষেত্রে নেতিবাচক হতে পারে। 
গেজেটের নিয়মানুযায়ী, একজন কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন থেকে তার স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপ বিয়োগ করে প্রাপ্ত পার্থক্যকে নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের সাথে যোগ করা হচ্ছে এবং তা নতুন স্কেলের পরবর্তী উচ্চতর ধাপে নির্ধারণ করা হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এ নিয়মটিকে যৌক্তিক মনে হলেও এর অভ্যন্তরীণ গাণিতিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে অদ্ভুত বৈপরীত্য। সাধারণত যেকোনো নতুন বেতন স্কেলে অভিজ্ঞতার বয়স ও ইনক্রিমেন্টের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে আর্থিক প্রাপ্তির অনুপাত বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু নতুন এই স্কেলে হচ্ছে ঠিক তার উল্টো, ইনক্রিমেন্টের সংখ্যা যত বেশি অর্থাৎ চাকরিজীবী যত সিনিয়র, তার বেতন বৃদ্ধির হার শতাংশের হিসাবে তত কম।
বাস্তব উপাত্তের দিকে তাকালে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। ২০১৫ সালের স্কেলের ১১ হাজার টাকা মূল স্কেলের (১৩তম গ্রেড) ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, যে কর্মচারীর ইনক্রিমেন্ট সংখ্যা মাত্র  ১, নতুন বেতন স্কেলে তার বেতন বৃদ্ধির হার প্রায় ১১৮ শতাংশ (১.১৮)। অথচ একই গ্রেডে ১৮টি ইনক্রিমেন্ট পাওয়া একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ কর্মচারীর ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধির হার নেমে এসেছে মাত্র ৫৪.৫ শতাংশে (০.৫৪)। একইভাবে ১১ হাজার ৩০০ টাকা মূল স্কেলের (১২তম গ্রেড) ক্ষেত্রে প্রথম ইনক্রিমেন্টধারীর বেতন বৃদ্ধির হার যেখানে ১১৫ শতাংশ, সেখানে ১৮তম ইনক্রিমেন্টধারী সিনিয়রের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৫২ শতাংশ।
এই প্রবণতা কেবল নিচের গ্রেডগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নবম গ্রেডের (২২ হাজার টাকা মূল স্কেল) মতো উচ্চতর পদেও একই অসঙ্গতি দৃশ্যমান। নবম গ্রেডে প্রথম ইনক্রিমেন্ট পাওয়া কর্মকর্তার বেতন বৃদ্ধির হার যেখানে শতভাগ (১.০০), সেখানে ১৮টি ইনক্রিমেন্ট পাওয়া জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪১.৯ শতাংশে (০.৪১); অর্থাৎ মেধা ও শ্রম দিয়ে যিনি দীর্ঘ বছর ধরে রাষ্ট্রে সেবা দিয়ে নিজের বেসিক ধাপটি উচ্চে নিয়ে গেছেন, নতুন স্কেল পুনর্নির্ধারণে তিনি শতাংশের হিসাবে চরমভাবে পিছিয়ে পড়ছেন।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক অসঙ্গতিটি দৃশ্যমান হয় যখন দেখা যায়, গেজেটের ৫(খ) অনুচ্ছেদের মারপ্যাঁচে পড়ে বিগত সময়ে কম ইনক্রিমেন্ট পাওয়া অপেক্ষাকৃত জুনিয়র ব্যক্তি এবং বেশি ইনক্রিমেন্ট পাওয়া সিনিয়র ব্যক্তি নতুন বেসিক সমান হয়ে যাচ্ছেন।  উদাহরণস্বরূপ ১১ হাজার টাকা স্কেলে (১৩তম গ্রেড) যে ব্যক্তি মাত্র একটি ইনক্রিমেন্ট পেয়েছিলেন (২০১৫ সালের স্কেলে ১১ হাজার ৫৫০ টাকা) এবং যিনি দু’টি ইনক্রিমেন্ট পেয়েছিলেন (১২ হাজার ১৩০ টাকা), ২০২৬ সালের পে-স্কেলে এসে উভয়েরই নতুন বেসিক সমান; অর্থাৎ ২৫ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারিত হচ্ছে। একইভাবে সাড়ে ১২ হাজার টাকা স্কেলে (১১তম গ্রেড) প্রথম ইনক্রিমেন্টধারী (১৩ হাজার ১৩০ টাকা) এবং দ্বিতীয় ইনক্রিমেন্টধারী (১৩ হাজার ৭৯০ টাকা), উভয়েরই নতুন স্কেলে বেসিক দাঁড়াচ্ছে ২৬ হাজার ৩০০ টাকা। এমনকি ১৬ হাজার টাকা স্কেলে (দশম গ্রেড) দ্বিতীয় ও তৃতীয় ইনক্রিমেন্টধারীদের ক্ষেত্রেও নতুন বেসিক একই (৩৫ হাজার ৩০০ টাকা) হচ্ছে। গ্রেড ১৩ থেকে গ্রেড ৯ পর্যন্ত এরকম ম্যাচিং হয়েছে প্রতিটি গ্রেডে সাত জোড়া করে। জ্যেষ্ঠতার এই অবমূল্যায়ন ও সরাসরি লঙ্ঘন কর্মচারীদের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। 
এই জটিল সমস্যার একটি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং স্থায়ী সমাধান হতে পারে, বিগত সময়ে কর্মচারীদের অর্জিত বা প্রাপ্ত ইনক্রিমেন্ট সংখ্যাকে ভিত্তি ধরে সদ্য গেজেটেড পে-স্কেলে ঠিক সমসংখ্যক ইনক্রিমেন্ট দেয়া; অর্থাৎ পুরনো স্কেলে একজন কর্মচারী যতটি ইনক্রিমেন্ট ভোগ করছিলেন, নতুন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের সাথে ঠিক ততটি ইনক্রিমেন্ট যোগ করে তার মূল বেতন নির্ধারণ করা। যদি এই ‘সমসংখ্যক ইনক্রিমেন্ট রূপান্তর’ নীতি প্রয়োগ করা হয়, তবে জুনিয়র ও সিনিয়রের বেতন এক হয়ে যাওয়ার এই গাণিতিক অসঙ্গতি পুরোপুরি দূর হবে। একই সাথে সিনিয়রের অভিজ্ঞতার আর্থিক মূল্য ও জ্যেষ্ঠতার যথাযথ সম্মান অক্ষুণ্ন থাকবে।
একটি কল্যাণমুখী ও দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য জ্যেষ্ঠতা এবং অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন অপরিহার্য। বেতন স্কেলের মূল উদ্দেশ্যই হওয়া উচিত জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সবার জন্য সমতার নীতি নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান গাণিতিক মডেলটি জুনিয়র ও সিনিয়রের মধ্যকার আনুপাতিক ব্যবধানকে সঙ্কুুচিত ও ম্লান করে দিচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে প্রবীণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম হতাশা ও বঞ্চনা বোধের জন্ম দিতে পারে।
প্রজ্ঞাপনের এই গাণিতিক অসঙ্গতি দূর করা সময়ের দাবি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচিত বাস্তব রূপান্তরের এসব পরিসংখ্যানগুলো আবার খতিয়ে দেখা। অভিজ্ঞতার বয়স ও ইনক্রিমেন্টের সংখ্যার সাথে সঙ্গতি রেখে এবং জ্যেষ্ঠতার ধাপগুলোকে যথাযথভাবে আলাদা রাখতে কর্মচারীদের পূর্বতন ইনক্রিমেন্টের সংখ্যা অক্ষুণ্ন রেখে নতুন স্কেলের বেতন নির্ধারণের সূত্রটি সংশোধন করা প্রয়োজন। তবেই নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর প্রকৃত সুফল বৈষম্যহীনভাবে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরের কর্মচারীর কাছে পৌঁছাবে এবং প্রশাসনের গতিশীলতা বজায় থাকবে। 
লেখক : ব্যাংকার

Advertisement

safiul.ju@gmail.com