
মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশকে জোরপূর্বক বিতাড়নের ইতিহাস নতুন নয়। সত্তর ও নব্বইয়ের দশকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। তৎকালীন জিয়া সরকারের বহুমুখী ও দৃঢ় কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় প্রথম দফায় স্বদেশ থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছিল। তবে সেই সময়ও একটি অংশ বাংলাদেশে থেকে যায়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চরম নৃশংসতা ও গণহত্যার মুখে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, গত ৯ বছরেও তাদের একজনকেও নিজ দেশ অর্থাৎ মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। এটি পতিত শেখ হাসিনা সরকারের পররাষ্ট্রনীতির এক চরম ব্যর্থতা।
১৯৫১ সালের আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশনে এখনো বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেনি। ফলে মানবিক কারণে সাহায্য-সহযোগিতা করলেও ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে রোহিঙ্গাদের ‘শরণার্থী’ হিসেবে মেনে নেয়নি। কিন্তু জাতিসঙ্ঘের অঙ্গসংগঠন ইউএনএইচসিআর রোহিঙ্গাদের মৌলিক সহায়তা দেয়ার আড়ালে শুরু থেকে একটি কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে। সংস্থাটি আন্তর্জাতিক অধিকারের দোহাই দিয়ে আশ্রিতদের সন্তর্পণে বাংলাদেশে আত্তীকরণের (আসিমিলেশন) চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সাথে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর একটি অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক রশি টানাটানি চলছে।
সম্প্রতি ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট কক্সবাজারের উখিয়া আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গাদের সংগঠন ‘ইউনাইটেড কাউন্সিল অন রোহিঙ্গা’ (ইউসিআর) এক বিশাল সমাবেশ ও মিছিলের আয়োজন করে। সেখানে গণহত্যার বিচার, নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তার পাশাপাশি মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি জানানো হয়েছে। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বার্তা ছিল পরিষ্কার— নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা ছাড়া মিয়ানমারে ফেরা টেকসই হবে না। দীর্ঘ ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও গণহত্যাকারীর বিচার কিংবা স্বদেশে ফেরার নিশ্চয়তা না পাওয়ায় তাদের ভেতরে ক্ষোভ ও হতাশা দিন দিন বাড়ছে।
অন্যদিকে, ৯ বছর পূর্তিতে ১৬টি দেশের কূটনীতিকদের যৌথ বিবৃতি এবং ব্রাসেলসভিত্তিক ‘আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপ’ (আইসিজি)-এর জুলাই মাসের কমেন্টারি ‘টাইম অব রিসেট : বাংলাদেশ’স অ্যাপ্রোচ টু দ্য রোহিঙ্গা’ বাংলাদেশের নীতি সংস্কারের ইঙ্গিত দেয়। উভয়পক্ষ ইঙ্গিত করছে, রাখাইনের বর্তমান সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নেই। তাই শুধু মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে আলোচনার অপেক্ষায় না থেকে বাংলাদেশকে একটি বাস্তবমুখী ও মধ্যমেয়াদি কৌশল গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে আইসিজি।
আইসিজির সুপারিশমালার মূল নির্যাস হলো :
নীতি পুনর্বিন্যাস : নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য রেখে বর্তমান বাস্তবতার আলোকে নীতির সমন্বয় ঘটানো।
আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ : রাখাইনের ৯০ শতাংশ এলাকা এবং বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নিয়ন্ত্রক এখন ‘আরাকান আর্মি’ (এএ)। আইসিজির মতে, রাজনৈতিক স্বীকৃতি না দিয়েও সীমান্ত নিরাপত্তা, বেসামরিক প্রতিরক্ষা ও মানবিক কারণে এই ‘ডি ফ্যাক্টো’ কর্তৃপক্ষের সাথে সীমিত যোগাযোগ রক্ষা করা দরকার।
স্বনির্ভরতা ও নিরাপত্তা : আন্তর্জাতিক ত্রাণ কমে আসায় অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে রোহিঙ্গা শোষণের পথ বন্ধ করতে নিয়ন্ত্রিত জীবিকা ও সুসংগঠিত ক্যাম্প ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে আশ্রয়শিবিরগুলো যেন আন্তঃসীমান্ত সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঘাঁটিতে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের ক্ষমতাকাঠামো পুরোপুরি বদলে গেছে। নেইপিডোর হাতে এখন রাখাইনের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ নেই। এ বাস্তবতায় শুধু মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভর করে বসে থাকা অকার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে। যদিও ২০২৬ সালের আগস্টে মিয়ানমার তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ফেরার উপযোগী নয়।
এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারের উচিত ‘এঙ্গেজ উইদাউট রেকোগনিশন’ (স্বীকৃতি না দিয়েও সম্পৃক্ততা) কৌশল গ্রহণ করা। অর্থাৎ, আরাকান আর্মিকে কোনো বৈধ রাষ্ট্রীয় সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে, রাখাইনের প্রভাবশালী পক্ষ হিসেবে তাদের সাথে সীমান্ত ও মানবিক বিষয়ে কেবল কৌশলগত চ্যানেল ব্যবহার করা।
বাংলাদেশ অতি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে রোহিঙ্গাবিষয়ক ১১ সদস্যের যে জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাদের জন্য একটি সমন্বিত রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো :
১. বহুমুখী কূটনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়
ক. পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় : নীতিনির্ধারণ ও কূটনীতির মূল কেন্দ্রে রাখতে হবে। সরাসরি রাজনৈতিক স্বীকৃতি এড়িয়ে বিশেষ চ্যানেলে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সরকারের সাথে বার্তা বিনিময় করতে হবে। একই সাথে চীন, ভারত, আসিয়ান ও জাতিসঙ্ঘের সাথে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
খ. স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সীমান্ত বাহিনী : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো রাজনৈতিক আলোচনায় যাবে না; তবে সীমান্ত নিরাপত্তা, অনুপ্রবেশ ঠেকানো, মানবপাচার রোধ এবং আশ্রয়শিবিরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।
গ. আরআরআরসি : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকে ৩৩টি ক্যাম্পের সমন্বয়, ডাটাবেজ হালনাগাদ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ত্রাণ বিতরণ তদারকি করবে।
ঘ. আন্তর্জাতিক সংস্থা : ইউএনএইচসিআরসহ জাতিসঙ্ঘের অন্যান্য সংস্থা মানবাধিকার ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পর্যবেক্ষণ করবে।
২. ‘তিন স্তরীয় যোগাযোগ’ (থ্রি-টায়ার এঙ্গেজমেন্ট) মডেল
বাংলাদেশকে একই সাথে তিনটি স্তরে যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে— ক. মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ (নেইপিডো), খ. রাখাইনের স্থানীয় কার্যকর কর্তৃপক্ষ (আরাকান আর্মি) এবং গ. জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক অংশীজন গোষ্ঠী।
৩. রোহিঙ্গাদের নিজস্ব প্রতিনিধিত্ব
মনে রাখতে হবে, যেকোনো আলোচনা থেকে রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের বাদ দেয়া যাবে না। নিজস্ব সিভিল সোসাইটি ও নেতৃত্বের মতামত নেয়া না হলে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে পিছিয়ে পড়বে।
মূল বার্তা ও সতর্কতা
ক্যাম্পের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে রোহিঙ্গা তরুণ-তরুণীদের একাংশ অপরাধমূলক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, যা সামাজিক ও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তাই জাতীয় কমিটির কাজ অত্যন্ত সংবেদনশীল। বাংলাদেশ যেন আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ করতে গিয়ে এমন কোনো চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি না দেয়, যা পরোক্ষভাবে তাদের সার্বভৌম রাজনৈতিক মর্যাদা দেয়। এই ঝুঁকি সম্পর্কে ঢাকাকে অতিশয় সতর্ক থাকতে হবে।
কূটনৈতিক সম্পর্কের বদলে সীমিত যোগাযোগ, সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি না দিয়ে বাস্তবসম্মত সম্পৃক্ততা এবং অধিকার রক্ষা করে টেকসই প্রত্যাবাসন, এই হতে হবে বাংলাদেশের মূল পররাষ্ট্রনীতি। বাংলাদেশ কোনোভাবে রোহিঙ্গাদের আত্তীকরণ মেনে নেবে না; বরং আন্তর্জাতিক মহলকে সাথে নিয়ে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে নিরাপদ ফেরা নিশ্চিত করতে সব ধরনের কৌশল সাজাতে হবে।
লেখক : নিরাপত্তা গবেষক








