মতামত
মতামত। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আধুনিক চিকিৎসাসেবার যে প্রমিত রূপ নির্ধারিত, তা শুধু হাসপাতালের চাকচিক্য বা দামি যন্ত্রপাতিতে সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক মানদণ্ড পরিমাপ করা হয় সেবার সহজলভ্যতা, রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসার গুণগত মান এবং রোগমুক্তিতে ব্যক্তির আর্থিক সক্ষমতার ওপর। তথ্যপ্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এই যুগে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করতে হলে আমাদের চিরাচরিত ধারণার বাইরে এসে আমূল কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে নজর দিতে হবে। মূলত সবার জন্য সমতা, নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন এবং সর্বজনীন আর্থিক নিরাপত্তা— এ চার স্তম্ভের ওপর একটি আদর্শ স্বাস্থ্যকাঠামো দাঁড়িয়ে থাকে। এর অর্থ হলো ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের সমমানের নিরাময় পাওয়ার অধিকার থাকবে, চিকিৎসার ঝুঁকি শূন্যে নামিয়ে আন্তর্জাতিক প্রটোকল মানা হবে এবং ডিজিটাল ডাটাবেজের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।
বৈশ্বিক এই সূচকে যখন আমরা দেশের বর্তমান চিত্র পরখ করি, তখন একই সাথে অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতার এক মিশ্র রূপ ভেসে ওঠে। বাংলাদেশ গত দুই দশকে মা ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাস এবং গড় আয়ু বৃদ্ধির সাফল্য দেখিয়েছে। তবে বৈশ্বিক কাঠামোর সাথে তুলনা করলে কিছু মৌলিক জায়গায় এখনো বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। দেশের বড় শহরগুলোতে বিশেষায়িত নিরাময় কেন্দ্র গড়ে উঠলেও প্রান্তিক বা তৃণমূল পর্যায়ে মানসম্মত ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব এখনো স্পষ্ট। এর বাইরে সবচেয়ে বড় সঙ্কট হলো চিকিৎসায় রোগীর নিজস্ব পকেট থেকে খরচের উচ্চ হার, যা বর্তমানে প্রায় ৭০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যনীতি অনুযায়ী, চিকিৎসায় সরকারি অনুদান বা বীমা ব্যবস্থার সুদৃঢ় কাঠামো থাকা জরুরি, যেন সাধারণ মানুষকে হাসপাতালের বিল মেটাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হতে না হয়।
এ ব্যবধান ঘোচাতে আমাদের স্বাস্থ্য খাতে কৌশলগত বিনিয়োগ ও নীতিমালার আধুনিকায়ন প্রয়োজন। বাংলাদেশ যদি চিকিৎসাসেবার আন্তর্জাতিক স্তরে পাকাপাকিভাবে পৌঁছাতে চায়, তবে দ্রুত কিছু কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প নেই। প্রথমত, সরকারি বাজেটে এই খাতের বরাদ্দ বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশের প্রতিটি নাগরিককে একটি জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা কাঠামোর আওতায় আনা জরুরি, যাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত হয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা স্বয়ংসম্পূর্ণ করে শহর ও গ্রামের সেবার বৈষম্য দূর করতে হবে। একই সাথে, সরকারি ও বেসরকারি— উভয় খাতের চিকিৎসালয়গুলোতে সেবার মান এবং ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন তদারকি সেল গঠন করা এখন সময়ের দাবি। 
লেখক : সাংবাদিক