প্রধানমন্ত্রী, তারেক রহমান
রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নয়া দিগন্ত

কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষির উন্নয়ন, পানির সঙ্কট নিরসন ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণকে গুরুত্ব দিয়ে একাধিক পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের আরো ৪৬টি বন্ধ কলকারখানা চালু, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, পরিবারগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে ফ্যামিলি কার্ড এবং উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। 

Advertisement

একইসাথে পদ্মা ও তিস্তা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগের কথা জানিয়ে পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজশাহীসহ আশপাশের অঞ্চলের পানিসঙ্কট মোকাবেলার আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় এসব পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেন তিনি। এ সময় দেশের ১৫টি চিনিকল জোনের ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষির জন্য ১২ কোটি টাকার প্রণোদনা বিতরণ কার্যক্রমেরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। কম্পিউটারের বোতাম চেপে চাষিদের মোবাইল অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের আরো ৪৬টি বন্ধ কলকারখানা চালুর লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। এসব কারখানা চালু হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এ জন্য দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ উৎসাহিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।

কৃষকদের সহায়তায় কৃষক কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে কৃষকদের সার, বীজ ও কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণে সহায়তা, ফসলের বিমা, ব্যাংকঋণ এবং আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষির উৎপাদন ও কৃষকের সক্ষমতা বাড়াতে এসব উদ্যোগ সহায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াতে ফ্যামিলি কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এ কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি পরিবারের নারীদের নেতৃত্বে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ করার পরিকল্পনা রয়েছে। নারী ও শিশুদের জন্য পৃথক শয্যা এবং ডায়ালাইসিসের সুবিধা চালুর বিষয়টিও পরিকল্পনায় রয়েছে বলে জানান তিনি। এতে উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের পানিসঙ্কটের প্রসঙ্গ তুলে পদ্মা ও তিস্তা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে রাজশাহীসহ আশপাশের অঞ্চল এবং প্রায় ১৪টি জেলা উপকৃত হতে পারে। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়েও আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি। 

প্রকল্পটির নির্মাণকাজ দ্রুত শুরুর বিষয়ে সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরলেও জনসভায় এর নির্দিষ্ট সময়সীমা, অর্থায়ন ও কারিগরি পরিকল্পনার বিস্তারিত জানাননি প্রধানমন্ত্রী।

জনসভায় কিছু কলকারখানায় অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা এবং দেশের একটি গোষ্ঠীকে বিদেশ থেকে অর্থায়নের বিষয়ে অভিযোগও তোলেন প্রধানমন্ত্রী। তবে বক্তব্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর পরিচয় তুলে ধরা হয়নি। 

এ ছাড়া ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের আন্দোলনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি নিহতদের পরিবারের কর্মসংস্থান, জুলাই আন্দোলনে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগের কথা বলেন।

বন্ধ শিল্পকারখানা চালু ও নিম্নআয়ের মানুষের সহায়তায় গুরুত্ব রিজভীর
জনসভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী রাজশাহীর বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকল, টেক্সটাইল মিল, জুট মিল ও রেশম কারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়ার কথা জানান। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু হলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি ফিরবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

রাজশাহীর পদ্মা নদীর বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে রিজভী বলেন, নদীতে এখন পানির প্রবাহ নেই; আগের সেই পদ্মা আর নেই। তিনি বলেন, রাজশাহী কৃষিজমিতে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। এখানে আখ, সবজিসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হয়। পাশাপাশি চিনিকল, টেক্সটাইল মিল, জুট মিল ও রেশমশিল্পের সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনেকগুলো বন্ধ পড়ে আছে।

রিজভী বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে কাজ করছে। এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করা সম্ভব হলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। একইসাথে রাজশাহীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গতি ফিরবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

রাজশাহীর উন্নয়নে একগুচ্ছ দাবি ভূমিমন্ত্রীর
জনসভায় ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু রাজশাহীর উন্নয়নে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন এবং শাহ মখদুম বিমানবন্দর আধুনিকায়নের দাবি জানান। পাশাপাশি কৃষিপণ্য রফতানির সুযোগ সৃষ্টি, শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ও কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

ভূমিমন্ত্রী বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথে রাজশাহীর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তারা ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে একাধিকবার বক্তব্য দিয়েছেন। খালেদা জিয়ার শাসনামলে রাজশাহীকে ‘গ্রিন সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে মিজানুর রহমান মিনু বলেন, তার নেতৃত্বে দেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে এবং বাংলাদেশ নতুন নেতৃত্বের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। রাজশাহীর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি এ অঞ্চলের উন্নয়নে আরো উদ্যোগ নেয়ার প্রত্যাশা জানান।

পদ্মার ওপর ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ভূমিমন্ত্রী বলেন, ফারাক্কার বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা, কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। 

রাজশাহী একসময় দেশের খাদ্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত সরকারের সময়ে এ অঞ্চলের কৃষি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষিপ্রধান রাজশাহীর উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাসেবা আধুনিক ও সহজলভ্য করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ভূমিমন্ত্রী বলেন, এ অঞ্চলের মানুষের উন্নত চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া দরকার। পাশাপাশি রাজশাহীতে একটি শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনায় নেয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

শাহ মখদুম বিমানবন্দর আধুনিকায়ন এবং সেখান থেকে কার্গো বিমান চালুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মিজানুর রহমান মিনু বলেন, রাজশাহীর কৃষিপণ্য বিদেশে রফতানির সুযোগ তৈরি হলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। এ জন্য কৃষিপণ্য রফতানির উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। একইসাথে কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং রাজশাহী বাইপাস সড়ক প্রকল্পসহ চলমান ও প্রস্তাবিত উন্নয়ন উদ্যোগ এগিয়ে নেয়ার ওপর গুরুত্ব দেন ভূমিমন্ত্রী।

দেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম থেকে সাম্প্রতিক আন্দোলন পর্যন্ত রাজশাহীর মানুষের ত্যাগের কথা উল্লেখ করে ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহত তরুণদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে তার নেতৃত্বে দেশের উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে বলেও আশা প্রকাশ করেন ভূমিমন্ত্রী।

৩৮ হাজার ৯৭০ আখচাষির জন্য ১২ কোটি টাকার প্রণোদনা
দেশের ১৫টি চিনিকল জোনের ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষির জন্য মোট ১২ কোটি টাকা প্রণোদনা বরাদ্দ করেছে সরকার। মঙ্গলবার রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় কম্পিউটারের বোতাম চেপে এ অর্থ চাষিদের মোবাইল অ্যাকাউন্টে পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, কম্পিউটারে বোতাম চাপার কয়েক মিনিটের মধ্যে আখচাষিদের অ্যাকাউন্টে সরকারের দেয়া সহযোগিতার অর্থ পৌঁছে যাবে। আখচাষিদের সহায়তায় বরাদ্দ দেয়া এ অর্থ আখ চাষে সহায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পরে ১৫ জন আখচাষির হাতে প্রণোদনার চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। তারা হলেন আবু সাঈদ চান, আবদুল আউয়াল মালেক, আবদুল মান্নান মণ্ডল, এমাজ উদ্দিন, মো: কাহার, গোলাম রাব্বানী, সবিতা রানী, জালাল উদ্দিন মৃধা, জিয়াউল হক, মহিদুল ইসলাম, আবদুল মাজেদ, নিরান্দ কুমার ঘোষ, শামীমুর রহমান, রীমা খাতুন ও রফিকুল ইসলাম।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটনের পরিচালনায় জনসভায় বক্তব্য দেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরসহ দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা। এ সময় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত পরিকল্পনা এবং রাজশাহীর উন্নয়নে উত্থাপিত দাবিগুলোর বাস্তবায়নই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বন্ধ কলকারখানা চালু, কৃষকদের সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের মতো উদ্যোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে এসব পরিকল্পনার সুফল। রাজশাহীর কৃষি, যোগাযোগ, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে ঘোষণাগুলো কতটা বাস্তব রূপ পায়, তা নজরে থাকবে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষের।