প্রধানমন্ত্রী, দুর্গাপূজা
রংপুরে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে সব ধর্ম-মতের মানুষকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এসময় তিনি বলেন, ‘বিগত হাজার বছর ধরে যেমন আমরা প্রত্যেকটি ধর্মের মানুষ এদেশে শান্তিতে একসাথে বসবাস করেছি, আগামী হাজার বছরেও আমরা একসাথে শান্তিতে বসবাস করতে চাই।’

Advertisement

দুর্গাপূজা উপলক্ষে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে রংপুর ধর্মসভা রাধা গোবিন্দ মন্দির পরিদর্শন শেষে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।   

সবাইকে একসাথে চলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে এই নবমীর দিনে দেশের সকল মানুষের কাছে, সকল ধর্মের মানুষের কাছে আমার প্রত্যাশা থাকবে, আসুন আমরা আমাদের প্রত্যাশিত সেই বাংলাদেশ করার জন্য একসাথে কাজ করি। আমরা আমাদের সন্তানদের শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করি, আমরা আমাদের দেশের মানুষের স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করি, আমরা আমাদের দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করি। আমরা দেশে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য যেভাবে প্রয়োজন আমরা সেভাবেই কাজ করি সকলে মিলে।’

একটি মহল চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের সাথে একটি কথা বলতে হয়, কিছুদিন যাবত আমরা দেখছি, আমরা যেই ঐক্যটি তৈরি করতে চাচ্ছি, বর্তমান সরকার যে ঐক্যটিকে তৈরি করতে চাচ্ছে, বর্তমান সরকার সকলকে নিয়ে যেখানে চলতে চাইছে, আমরা দেখছি একটি মহল বিভিন্ন রকম বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। আজকে পরিষ্কারভাবে আমি সকলের উদ্দেশে একটি কথা বলতে চাই, বিশেষ করে যারা বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছেন— আমরা দেখেছি অতীতে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সেই ফলাফলটা খুব শুভ হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ সেই ফলাফলটিকে বা সেই লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যটিকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। ঠিক একইভাবে আমরা দেখেছি চব্বিশের যে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, সেই গণঅভ্যুত্থানকেও কোনো কোনো মহল বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। সেটাও জনগণ ভালোভাবে নিচ্ছে না। এর পরিণতিও ভালো হবে না।’ 

বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি সকলকে সাথে নিয়ে, গণতান্ত্রকামী সকল জনগণকে সাথে নিয়ে, গণতন্ত্রকামী জনগণের পক্ষ থেকে বলতে চাই যে, চব্বিশের ছাত্র-জনতার যে গণঅভ্যুত্থান, সেটিকে দয়া করে আপনারা কেউ বিতর্কিত করবেন না। আপনাদের যদি কিছু বলার থাকে, জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়ে সংসদ গঠন করেছে, সেই সংসদে জনগণ তাদের প্রতিনিধিদেরকে পাঠিয়েছে। আপনাদের যদি কিছু বলার থাকে, যদি কিছু তুলে ধরার থাকে, আসুন আমরা সংসদে সেই কাজটি করি। সেই বিতর্ক করি, সেই সিদ্ধান্তটি জনগণের পক্ষে, জনগণ রাষ্ট্রের পক্ষে যেটি ভালো হবে সেই সিদ্ধান্ত আমরা গ্রহণ করি।’ 

‘আমরা অতীতের মতো এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি না করি, যাতে করে জনগণের যে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আছে, জনগণের যে সন্তানদের যে শিক্ষা আছে, স্বাস্থ্য সুবিধা আছে, জনগণের ব্যবসা-বাণিজ্য চাকরি-বাকরি আছে, এগুলো যাতে কোনভাবে ব্যাঘাত না ঘটে এ দেশে। বর্তমানে জনগণ দেশে একটি স্থিতিশীলতা চায়, জনগণ চায় শান্তিতে থাকতে, জনগণ চায় নিরাপদে থাকতে এবং বর্তমান সরকার তার জন্যই কাজ করছে,’ বলেন প্রধানমন্ত্রী। 

দেশের সব এলাকার জন্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সমভাবে হবে- প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘সকল এলাকার উন্নয়ন আমরা সমানভাবে, রাষ্ট্রের যে অর্থনৈতিক অবস্থা আছে তার উপরে বিবেচনা করে, আমরা সকল এলাকার সমবণ্টন করে সকল এলাকায় সমানভাবে উন্নয়ন করতে চাই। সে কারণে রংপুর মহানগরের উন্নয়নের জন্য এরই মধ্যে গত দুই সপ্তাহ আগে একনেক মিটিংয়ে ১৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।’

রংপুরের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘লোকাল গভমেন্টের মাধ্যমে জেলা পরিষদকে দিয়ে আমরা এই জেলার এই জেলার রংপুর জেলার উপজেলাগুলোতে, ইউনিয়নগুলোতে গ্রামের মানুষের প্রয়োজনে যে ইনফ্রাস্ট্রাকচার দরকার, ব্রিজ-কালভার্ট দরকার, স্কুল-কলেজ দরকার, সেগুলো ইনশাআল্লাহ আমরা পর্যায়ক্রমে গড়ে তুলব, যাতে মানুষ সকল প্রকার রাষ্ট্রের সকল সুযোগ-সুবিধা পেতে পারে। এই কাজগুলো যদি করতে হয়, তাহলে আমাদের সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে। এই কাজগুলো যদি করতে হয়, তাহলে আমাদের ভেতরের ভেদাভেদকে ভুলে থাকতে হবে। এই কাজগুলো যদি করতে হয়, আমাদেরকে একসাথে হাত ধরে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’

স্বাধীনতা যুদ্ধে সকল ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমরা যখন যুদ্ধ করে এই দেশটিকে স্বাধীন করেছিলাম তখন কিন্তু আমরা কোনো ধর্ম দেখিনি। প্রত্যেকটি মানুষ বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন মতের, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছিল। ঠিক একইভাবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে যখন বিভিন্ন সময় গণতন্ত্র হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল তখন এই দেশের মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাজপথে নেমে এসেছিল। যে মানুষগুলো নেমে এসেছিল সেই মানুষগুলোর ভেতরেও সকল ধর্মের মানুষই ছিল, সকল মত, সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ ছিল।’ 

মুক্তিযুদ্ধের মতোই চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে ধর্ম-বর্ণ সবাই মিলে অংশগ্রহণ করেছিল উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের কাঁধে যে স্বৈরাচার চেপে বসেছিল, এ দেশের ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে। আমরা যদি সেই গণঅভ্যুত্থানের রাজপথের দৃশ্য দেখি, তাহলে দেখব সেই দৃশ্যের মধ্যে আমরা এই বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল ধর্মের মানুষের সম্মেলন সেখানে হয়েছিল। সকল মানুষকে আমরা দেখেছিলাম দল, মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি ধর্মের মানুষ, প্রতিটি পেশার মানুষ সেই রাজপথে সেদিন নেমে এসেছিল তাদের অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। অর্থাৎ এই দেশ হাজার বছর ধরে সকল ধর্মের মানুষকে নিয়ে এগিয়ে চলছে।’

সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা জানিয়ে নিরাপদ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সবার সহযোগিতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিটা ধর্মের মানুষ আমরা যাতে আগামী হাজার বছর সুন্দরভাবে শান্তিতে একসাথে থাকতে পারি সেই প্রত্যাশা রাখছি। একটি নিরাপদ, একটি আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ার সহযোগিতা চেয়ে চাই।‘ 

মতবিনিময় সভা উপস্থাপন করেন রংপুর জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এমপি, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, আইসিটি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ট্রাস্টের ট্রাস্টি স্বপন ভট্টাচার্য, মন্দির কমিটির সভাপতি পার্থ বোস প্রমুখ। 

এসময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুসহ স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় বিএনপির নেতৃবৃন্দ। 

এর আগে সকাল ১০টায় তিনি একটি বেসামরিক বিমানে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। পরে সোয়া ১০টায় তিনি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ লেখা বাসে করে রংপুরের উদ্দেশে রওনা দেন। সড়কের দুই পাশে হাজার হাজার মানুষ তাকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান। 

পাগলাপীরে পথসভায় তিনি সদর উপজেলা ক্যাম্পাস পাগলাপীরে সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেন। ৩৫ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে তার লাগে দুই ঘণ্টারও বেশি। বেলা ১২টায় পৌঁছান রংপুর ধর্মসভা রাধা গোবিন্দ মন্দিরে। সেখানে তাকে শুভেচ্ছা জানান স্থানীয় সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান সামু, রংপুর বিভাগীয় কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন, ডিআইজি মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ, ডিসি ইসরাত জাহান, জেলা পরিষদ প্রশাসক সাইফুল ইসলাম, এসপি মোজাম্মেল হকসহ মন্দির কর্তৃপক্ষ। 

পরে বেলা ১টার কিছুটা পরে তিনি মন্দির ত্যাগ করে সৈয়দপুর বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেন। সেখান থেকে তিনি রাজশাহীর উদ্দেশে বিমানে রওনা দেন। 

প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে উৎসবের নগরীতে পরিণত হয় রংপুর।