আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস
আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস। সংগৃহীত

জনগণের তথ্য জানার অধিকার সুসংহত করা, সরকারি কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো এবং তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

এ বছর বাংলাদেশে দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘পরিবেশ রক্ষায় ডিজিটাল যুগে তথ্যের অধিকার নিশ্চিতকরণ’।

জাতিসঙ্ঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) নির্ধারিত বৈশ্বিক আলোচনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশে এ প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

দিবসটি উপলক্ষে আজ বিকেল ৩টায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে তথ্য কমিশন বাংলাদেশের অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

এছাড়া দিবসের প্রতিপাদ্য ও তথ্য অধিকার বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে প্রচারমূলক কার্যক্রম নেয়া হয়েছে।

তথ্যবিবরণীতে দেশের ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে প্রতিপাদ্য বার্তা স্ক্রল আকারে প্রচারের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

প্রতিবছর ২৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস পালিত হয়। ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলন ২০১৫ সালে দিনটিকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। পরে ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদও ২৮ সেপ্টেম্বরকে ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে ফর ইউনিভার্সাল অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

তথ্য পাওয়ার অধিকার একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। নাগরিকরা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি সেবা, উন্নয়ন প্রকল্প, বাজেট, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানতে পারলে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাদের সচেতনতা বাড়ে।

একইসাথে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশে নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ প্রণয়ন করা হয়েছে।

এ আইনের আওতায় নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নাগরিকরা বিভিন্ন সরকারি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা তথ্য চাওয়ার সুযোগ পান।

তথ্য কমিশন আইনটি বাস্তবায়ন ও তথ্য অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তথ্য কমিশনের ওয়েবসাইটেও তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়ন ও এ বিষয়ে বিভিন্ন কার্যক্রমের তথ্য প্রকাশ করা হয়।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্য অধিকার নতুন মাত্রা পেয়েছে। সরকারি বিভিন্ন দফতর ও প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন সেবা এবং ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডারের মাধ্যমে নাগরিকরা আগের তুলনায় দ্রুত তথ্য পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

ফলে জনগণের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পৌঁছে দেয়ার পাশাপাশি তথ্যের নির্ভুলতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও সময়োপযোগিতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে পরিবেশ সংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে জনগণের সহজ প্রবেশাধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদী, জলাশয়, বন, বায়ু, পানি, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো বিষয়ে সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য নাগরিকদের সচেতনতা বাড়াতে পারে।

একইসাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিকল্পনা ও কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতেও এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের ফলে তথ্য পাওয়ার সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনগণের মধ্যে তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি হয়ে পড়েছে।

ইউনেস্কো বলছে, ডিজিটাল যুগে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের সর্বজনীন প্রবেশাধিকার আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তথ্যের সহজলভ্যতা স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।

একইসাথে তথ্যের কার্যকর প্রবেশাধিকার অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবেলায়ও ভূমিকা রাখতে পারে।

তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারি দফতরগুলোর ওয়েবসাইটে নিয়মিত ও হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ, নাগরিকদের জন্য সহজ ভাষায় তথ্য উপস্থাপন এবং তথ্য প্রদানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ, নারী, তরুণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং ডিজিটাল সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী যাতে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পেতে পারে, সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তথ্যের অবাধ প্রবাহের সাথে দায়িত্বশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ।

নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আইনে সংরক্ষিত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হয়।

তাই তথ্য প্রকাশ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইন, জনস্বার্থ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।

তথ্য অধিকার শুধু সরকারি তথ্য পাওয়ার একটি আইনগত সুযোগ নয়; এটি নাগরিকের সচেতনতা, অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের অন্যতম মাধ্যম।

সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে নাগরিকরা সরকারি সেবা সম্পর্কে জানতে পারেন, নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন এবং বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারেন।

গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও তথ্য অধিকারের গুরুত্ব ব্যাপক। সাংবাদিকরা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনুসন্ধান, গবেষণা ও প্রতিবেদন তৈরির সময় নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর নির্ভর করেন।

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যপ্রকাশের সংস্কৃতি শক্তিশালী হলে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের জন্য তথ্য যাচাই এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলো তুলে ধরা সহজ হয়।

বিশ্বব্যাপী তথ্যের সর্বজনীন প্রবেশাধিকারকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সাথে যুক্ত করা হয়েছে। ইউনেস্কো জানিয়েছে, ২৮ সেপ্টেম্বরের এই দিবসের উদ্দেশ্য হলো তথ্যের সর্বজনীন প্রবেশাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এ অধিকার বাস্তবায়নে আইন ও নীতির কার্যকর প্রয়োগকে উৎসাহিত করা।

আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; বরং নাগরিকের তথ্য জানার অধিকারকে আরো কার্যকর করার আহ্বান।

ডিজিটাল প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহার, পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ এবং তথ্যের দ্রুত বিস্তারের এই সময়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, তথ্যের সঠিক ব্যবহার শেখানো এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরো শক্তিশালী করা এ দিবসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। বাসস