জামায়াত আমির
রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে হাফেজ শিক্ষার্থীকে সম্মাননা তুলে দিচ্ছেন ডা: শফিকুর রহমান এমপি। নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘মেধাবী ও সৎ মানুষ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যত বেশি প্রবেশ করবে, সমাজ তত বেশি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যাবে। আর মেধা ও চরিত্র উপেক্ষিত হলে সেই সমাজ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। বর্তমানে বাংলাদেশ এমনই এক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য মাদরাসা শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায়ও নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে হবে। দেশপ্রেমিক, সৎ ও আদর্শ নাগরিক গড়ে তুলতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।’

Advertisement

সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি এসব কথা বলেন। তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশন পরিচালিত বিভিন্ন শাখার ১ হাজার ৭৫৯ জন হাফেজ শিক্ষার্থীকে ক্রেস্ট, সনদ, পাগড়ি/স্কার্ফ ও অ্যাওয়ার্ড ব্যাগ প্রদান করা হয়। একই সাথে তাদের পিতা-মাতাকেও বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা, অবজ্ঞা ও ষড়যন্ত্র চলছে। সরকারি আলিয়া মাদরাসাগুলো ভুতুড়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এমপিওভুক্ত মাদরাসাগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। শিক্ষার সিলেবাস সংকুচিত করা হয়েছে। এখন আবার কৌশলে মাদ্রাসাগুলোকে স্কুলে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘যারা মাদরাসার অনুষ্ঠানে গিয়ে নিজেদের ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসেবে উপস্থাপন করেন, তারাই আবার মাদরাসা শিক্ষার নীতিনির্ধারণের সময় ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেন। তাদের বক্তব্য ও কার্যক্রমের মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া কঠিন।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘মাদরাসার শিক্ষার্থীরা এখন শুধু ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তারা সিভিল প্রশাসন, চিকিৎসা, প্রকৌশল, পুলিশ প্রশাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও কূটনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছেন। প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রেও তারা এগিয়ে যাচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘পবিত্র কোরআন হিফজ করতে অসাধারণ স্মরণশক্তি ও মেধার প্রয়োজন হয়। অনেক অভিভাবক সন্তানদের হিফজ শিক্ষায় পাঠালেও সবাই পুরো কোরআন মুখস্থ করতে পারে না। যারা সফলভাবে হিফজ সম্পন্ন করেন, তারা পরবর্তী সময়ে সাধারণ শিক্ষায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রেও মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারেন।’

মাদরাসা শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, আখলাক ও আধ্যাত্মিকতার শিক্ষা দেয়া হয়। ফলে তারা মেধা অর্জনের পাশাপাশি আল্লাহভীরু ও সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পান। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ ধরনের মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন।’

শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘যারা নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষাকে অবহেলা করছেন, তারা সমাজকে সুন্দর করার পরিবর্তে এমন একটি ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চান, যেখানে শিক্ষিত হয়েও মানুষ লুটপাট, চুরি, চাঁদাবাজি, দখল বাণিজ্য ও অর্থ পাচারের সাথে জড়িয়ে পড়ে।’

তিনি অভিযোগ করেন, একশ্রেণির মানুষ নিজেদের সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়ে দেশে দেশপ্রেমের কথা বলেন। অথচ তারা দেশকে নিজেদের আয়-রোজগারের ক্ষেত্র এবং দেশের মানুষকে প্রজা হিসেবে বিবেচনা করেন। এ ধরনের মানসিকতা পরিবর্তনে কোরআনের শিক্ষা, চর্চা ও শাসনের প্রয়োজন রয়েছে।

তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের প্রশংসা করে জামায়াত আমির বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির দেশব্যাপী প্রায় ১২৫টি শাখা রয়েছে। এসব শাখার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে শুধু শাখা বাড়ালেই হবে না, শিক্ষার মানোন্নয়নও অব্যাহত রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘তানযীমুল উম্মাহর তুলনা অন্য মাদরাসার সাথে নয়, আপনাদের তুলনা আপনাদের নিজেদের সাথে। যে উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছে, সেই উদ্দেশ্য কতটুকু অর্জিত হয়েছে, তা পর্যালোচনা করেই পরবর্তী কর্মসূচি ও পরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে।’

অনুষ্ঠানে এক হাজার ৭৬১ জন হাফেজ ও হাফেজার অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশে কোরআনের হাফেজদের পাশাপাশি হাফেজাদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। এটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। একজন মা কোরআনের আলোয় আলোকিত হলে তার মাধ্যমে পুরো পরিবার আলোকিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

তিনি বলেন, মা হচ্ছেন পরিবারের মূল সমন্বয়কারী ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি। মায়েরা কোরআনের শিক্ষায় শিক্ষিত হলে তাদের সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যরাও এর সুফল পাবেন। তিনি বিশেষভাবে নারী হাফেজাদের জন্য দোয়া করেন এবং অর্জিত শিক্ষাকে সমাজ গঠন ও মানবকল্যাণে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।

রাসূলুল্লাহ সা:-এর ত্যাগ ও সংগ্রামের কথা তুলে ধরে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘মহানবী (সা.) তার জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে উম্মাহর শান্তি ও সম্মানের জন্য কাজ করেছেন। আল্লাহর দেয়া জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সাহস ও বিচক্ষণতা তিনি মানবতার কল্যাণে উৎসর্গ করেছেন। কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের ত্যাগের বিনিময়ে দুনিয়ায় শান্তি নেমে আসুক। সাধারণ মানুষ শান্তি ও সম্মান উপভোগ করুক। কুরআন হচ্ছে সেই শান্তি ও সম্মান প্রতিষ্ঠার দলিল।’

কোরআনের শিক্ষা সমাজে যত বেশি বিস্তৃত হবে, মানুষ তত বেশি উপকৃত হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একটি সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনে কোরআনের আদর্শ অনুসরণের বিকল্প নেই।’

১ম অধিবেশনে বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার অধ্যক্ষ ড. মাওলানা শাহজাহান আল-মাদানীর সভাপতিত্বে, বিশেষ অতিথি ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হাফেজ ড. এ বি এম হিযবুল্লাহ, অধ্যক্ষ মাওলানা সাইয়্যেদ কামালুদ্দিন আব্দুল্লাহ জাফরি, তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল ড. মাওলানা হিফজুর রহমান, উত্তর বাড্ডা কামিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল ড. আনোয়ার হোসাইন মোল্লা, হাফেজ মুরতুজা হাসান ফয়জি মাসুম, হাফেজ ক্বারী হাবিবুল্লাহ বেলালী, অধ্যক্ষ মাহমুদুল হাসান ফেরদৌস প্রমুখ।