অ্যালবিনোস মাদাগাস্কারের সভাপতি,শ্বেতবর্ণতা, মাদাগাস্কার,ভয়াবহ বছর,বংশগত
তৃতীয় ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে রয়েছেন অ্যালবিনোস মাদাগাস্কারের সভাপতি ফালজেন্স সোয়া। দ্য গার্ডিয়ান

মাদাগাস্কারে  অ্যালবিনিজম বা শ্বেতবর্ণতার রোগী, বিশেষ করে শিশুদের ওপর হামলা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত শ্বেতবর্ণতা আক্রান্ত ১৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১০ জনই শিশু। তাদের বয়স ছিল নয় মাস থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। শ্বেতবর্ণতা আক্রান্ত মানুষ হত্যার দিক থেকে এটিই দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ বছর।

Advertisement

ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) জানায়, দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর তোলিয়ারার কাছে মে মাসের শেষ দিকে রাতে নিকোল সোআলারার ঘরে ঢোকে  তিন ঘাতক। তাঁর ১৮ মাসের মেয়ে লানদ্রিয়াকে ছিনিয়ে নেয় তারা। মেয়েটির শ্বেতবর্ণতা ছিল। হামলাকারীরা নিকোলের স্বামীকে কাঠের খণ্ড ও কুঠার দিয়ে আঘাত করে। পরে শিশুটিকে মায়ের কোল  থেকে টেনে নিয়ে পালিয়ে যায়।

কয়েক দিন পর এক ওঝার বাড়িতে লানদ্রিয়ার মাথা ছাড়া শরীর পাওয়া যায়। হতভাগ্য শিশুটির মাথা পাওয়া যায় কয়েক কিলোমিটার দূরের একটি বাড়িতে। প্লাস্টিকের ব্যাগে মোড়ানো অবস্থায় একটি স্যুটকেসে ছিল সেটি।

‘পরিস্থিতি খুবই সংকটপূর্ণ, খুবই নিষ্ঠুর,’ বলেন অ্যালবিনোস মাদাগাস্কারের সভাপতি ফালজেন্স সোয়া। তাঁর নিজেরও শ্বেতবর্ণতা রয়েছে। ২০২২ সালে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

অ্যালবিনিজম বা শ্বেতবর্ণতা হলো  জিনঘটিত বা বংশগত বিরল রোগ।  ত্বক, চুল ও চোখের রঙ সৃষ্টিকারী রঞ্জক ‌উপাদান মেলানিন খুব কম পরিমাণে তৈরি করে বা একেবারেই তৈরি করতে পারে না এই রোগীর শরীর। এই রোগ জন্মগত সমস্যা এবং সারিয়ে তোলা যায় না বা ওষুধও নেই। তবে সঠিক যত্ন-আত্তির মাধ্যমে এ রোগের  লক্ষণগুলো সামাল দেয়া সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য, সাব-সাহারান বা উপ-সাহারা আফ্রিকায় শ্বেতবর্ণতার হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। কোনো কোনো দেশে প্রতি ৪ হাজারের বেশি মানুষের  মধ্যে একজন এই রোগের শিকার হয়।

আফ্রিকার কয়েকটি দেশে শ্বেতবর্ণতা আক্রান্ত মানুষকে হত্যা, ধর্ষণ ও অঙ্গহানির শিকার হতে হয়। স্থানীয় কুসংস্কার অনুসারে, শ্বেতবর্ণতা রোগীদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধারণে কিংবা এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে তৈরি কবচ ধারণে ধনসম্পদ, রাজনৈতিক সাফল্য ও সৌভাগ্য আসে।

জাতিসঙ্ঘের স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞ মুলুকা-অ্যান মিত্তি-ড্রামন্ড ২০২১ সালে মাদাগাস্কারে শ্বেতবর্ণতা রোগী হত্যার খবর পেতে শুরু করেন। তিনি জানান, ২০২০ সালের শেষ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ২৮টির বেশি হামলার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। হামলাকারীদের মধ্যে আত্মীয়, স্থানীয় মানুষ, অন্য অঞ্চল থেকে আসা মানুষজন এবং গরু চোরও ছিল। অনেক ক্ষেত্রে শুধু মধ্যস্থতাকারীরা ধরা পড়ে। মূল পরিকল্পনাকারীরা থেকে যায় সবার চোখের আড়ালে।

শিশু হত্যার বিনিময়ে বড় অঙ্কের টাকাকড়ি দেয়া হয় বলে মানবাধিকারকর্মীরা জানান। অনেক সময় গোটা একটি চক্র এতে জড়িত থাকে। বিশেষ করে,  নির্বাচনের আগেভাগে হামলা বাড়ে বলেও অভিযোগ রয়েছে। গার্ডিয়ানকে দেয়া কয়েকটি সূত্রের দাবি, কিছু হত্যার পেছনে উচ্চপর্যায়ের রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

মাদাগাস্কার বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর অন্যতম। প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ দিনে ২ দশমিক ১৫ ডলারের কম আয় করে। খরা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি খাদ্যসংকট ও অপুষ্টিও পরিস্থিতি আরো খারাপ করেছে। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক কর্মকর্তা সাবিনা লাউবারের মতে, টিকে থাকার মরিয়া চেষ্টা মানুষকে ক্ষতিকর কুসংস্কারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

হামলা এখন শুধু প্রত্যন্ত এলাকায় নয়, শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ২০ বছর বয়সী ওদেত্তের চাচাতো ভাই ১৪ বছরের মার্সেলিনকে ফেব্রুয়ারিতে হত্যা করা হয়। মার্সেলিনেরও শ্বেতবর্ণতা ছিল। এরপর হামলার ভয়ে ওদেত্তে প্রায় এক ডজন মানুষের সাথে একটি ছোট কুঁড়েঘরে থাকছেন। তিনি বলেন, ‘আমি মার্সেলিনের মতোই শ্বেতবর্ণতা আক্রান্ত। তাই আমি খুব ভয় পাই।’

হত্যার শিকার ১৪ বছরের মার্সেলিনের ছবি- দ্য গার্ডিয়ান

 

মে মাসে ১৪ বছরের রাকোটোমবেলো নিহত হওয়ার পর তার নয় বছর বয়সী বোন ভেরোলিন ও সাত বছর বয়সী ভাইকে মেয়রের বাড়িতে সশস্ত্র পাহারায় রাখা হয়েছে। হামলার রাতে ভেরোলিন একই ঘরে ঘুমাচ্ছিল। সে জানায়, কয়েকজন লোক দরজা ভেঙে তার ভাইকে নিয়ে যায়। পরে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়।

হত্যাকাণ্ড এখন জাতীয় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট হামলাকারীদের ধরতে তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীদের মাঠে নামিয়েছেন। ফার্স্ট লেডি দক্ষিণাঞ্চলে শ্বেতবর্ণতা আক্রান্ত মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

জাতিসঙ্ঘ ও স্থানীয় সংগঠনগুলো বলছে, সংকট মোকাবিলায় নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা দরকার। সঠিক তথ্যের অভাবও বড় সমস্যা। জাতিসঙ্ঘের কর্মকর্তা তোহোভেরি রাজাকামানানা সরকারকে দেশে শ্বেতবর্ণতা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা জানতে জরিপ চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

তোলিয়ারায় মেয়েকে হারানো সোআলারার পরিবার এখনো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। তাঁর আরেক মেয়ে প্যাট্রিসিয়ারও শ্বেতবর্ণতা রয়েছে। মেয়েটিকে হারানোর ভয়ে সোআলা কাজ করেন না, খুব কম বাইরে বের হন। পরিবারটি নির্ভর করে তাঁর স্বামীর রিকশা চালিয়ে দিনে প্রায় ৬ হাজার আরিয়ারি আয়ের ওপর।

সোআলা বলেন, ‘রাতে আমি ঘুমাতে পারি না।  ভয় আর দুচিন্তা দুইই হয়। খারাপ মানুষগুলো এখনো এই শিশুটিকে তালাশ করছে—এই ভয় আমাকে  সারাক্ষণ তাড়া করে।’