
ইউরোপে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে , সতর্ক করলেন জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূত মিগেল অ্যাঞ্জেল মোরাতিনোস। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মসজিদে হুমকিমূলক গ্রাফিতি লেখা থেকে শুরু করে মুসল্লিদের ওপর হামলা—মুসলিমবিদ্বেষের নানা ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে মুসলিম সম্প্রদায়। গত শুক্রবার প্যারিসের কাছে প্রাণঘাতী এক বন্দুক হামলার পর এ উদ্বেগ আরো বেড়েছে।
তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদুলু (২৭ অক্টোবর) জানায়, ওই হামলায় একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হন। আহতদের মধ্যে মাথায় হিজাব পরা ১২ বছরের এক কিশোরীও রয়েছে। তার মা জানিয়েছেন, মেয়েটিকে আটবার গুলি করা হয়েছে। ত্রাপের মেয়র আলি রাবেহ হামলাটিকে ‘নিঃসন্দেহে বর্ণবাদী, সম্ভবত ইসলামবিদ্বেষী’ বলে বর্ণনা করেছেন।
এ পরিস্থিতিতে ইসলামবিদ্বেষ মোকাবিলায় জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূত মিগেল অ্যাঞ্জেল মোরাতিনোস সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপের রাজনৈতিক আলোচনায় মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ ক্রমেই স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও তা ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি এই বিস্তারকে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়া রোগের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
নবম ইস্তাম্বুল মিডিয়েশন কনফারেন্স বা নবম মধ্যস্থতা সম্মেলনের ফাঁকে আনাদুলুকে দেয়া সাক্ষাৎকারে মোরাতিনোস বলেন, ‘ইউরোপের পরিস্থিতি সবচেয়ে জটিল বলে আমি মনে করি। কারণ, সেখানে রাজনৈতিক আলোচনায় ইসলামবিদ্বেষ ঢুকে পড়েছে।’
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া এক বছরে মুসলিমদের লক্ষ্য করে ৫ হাজার ১৩২টি বিদ্বেষমূলক অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে পুলিশ। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ১৫ শতাংশ বেশি। যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতরের পরিসংখ্যানে এ তথ্য উঠে এসেছে।
জার্মানির পর্যবেক্ষণ সংস্থা ক্লেইমের হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশটিতে মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৯৬টি। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮০টি। এসব ঘটনার মধ্যে বৈষম্য, হুমকি, মৌখিক গালিগালাজ ও শারীরিক হামলা রয়েছে। এতে দুটি হত্যাকাণ্ড এবং ২১৪ জনের ওপর শারীরিক হামলার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
মোরাতিনোস প্রশ্ন তোলেন, ‘সাধারণত নির্বাচনের সময় অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও মানুষের প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু ইসলাম নিয়ে আলোচনা করতে হচ্ছে কেন? মুসলিম সম্প্রদায়কে নিয়ে এমন উদ্বেগের কারণই বা কী?’
ইউরোপের বাইরেও যুক্তরাষ্ট্র, এশিয়া ও আফ্রিকার কয়েকটি অঞ্চলে মুসলিমবিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রে রোববার এক সমাবেশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিশিগানে ডেমোক্র্যাটিক দলের সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদকে ‘জিহাদি’ বলে আখ্যা দেন। তিনি এল-সাইয়েদকে ‘সন্ত্রাসীদের পক্ষে’ বলেও মন্তব্য করেন। সিনেটে প্রবেশের আগে তার ওপর বিশেষ নিরাপত্তা তল্লাশি চালানোর পরামর্শও দেন ট্রাম্প। নির্বাচিত হলে এল-সাইয়েদ হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর। এল-সাইয়েদের অভিযোগ, নিজের নীতির কারণে মানুষের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা থেকে দৃষ্টি সরাতেই ট্রাম্প তাঁর নাম ও ধর্ম নিয়ে বিদ্রূপ করছেন।
মোরাতিনোস সম্প্রতি ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও স্পেন সফর করে মুসলিমবিদ্বেষ মোকাবিলায় কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এ জন্য শক্তিশালী আইন, শিক্ষায় বিনিয়োগ এবং বিদ্বেষমূলক ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা দরকার।
তিনি বলেন, ‘সম্ভবত মানুষ মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ করে, কারণ তারা এ বিষয়ে অজ্ঞ। ইসলাম কী, মুসলিম সম্প্রদায় কেমন—তারা তা জানে না। একে অন্যকে সম্মান করার শিক্ষাও তারা পায়নি।’
জাতিসঙ্ঘের ইসলামবিদ্বেষবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবসকে অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু সচেতনতা বাড়ালেই হবে না, বাস্তব পদক্ষেপও নিতে হবে। এ বিদ্বেষ নির্মূলে জাতিসঙ্ঘ, সদস্যরাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ ও ধর্মীয় নেতাসহ সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে।
নিরাপত্তানির্ভর নীতির সমালোচনা
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে হামলার পর থেকে আন্তর্জাতিক নীতিতে নিরাপত্তাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়ার সমালোচনা করেন মোরাতিনোস। ১৯৯৬ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই হামলার পর রাজনৈতিক সংলাপ ও আলোচনার বদলে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।
তাঁর ভাষায়, ‘আমরা নিরাপত্তাকে বেছে নিয়েছি। আর নিরাপত্তার এই নীতি আমাদের বিপর্যয়কর পরিস্থিতির দিকে নিয়ে এসেছে।’
মোরাতিনোসের মতে, সংলাপের চেয়ে সামরিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দেয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘যখন আপনি আরো নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান, তখন আরো অনিরাপদ হয়ে পড়েন। ইসরাইলের নিরাপত্তা, লেবাননের নিরাপত্তা, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, ইরানের নিরাপত্তা—শুধু নিরাপত্তা আর নিরাপত্তা। অথচ এর পরিণতি হচ্ছে যুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতা।’
তিনি সব পক্ষের স্বার্থ, উদ্বেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, রাজনৈতিক সংলাপের বিকল্প সামরিক শক্তি হতে পারে না।
‘আইনের শক্তি, শক্তির আইন নয়’
ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন সংঘাতের প্রসঙ্গে মোরাতিনোস আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা যদি আমাদের বিবেক ও মূল্যবোধ হারাই, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও পথ হারাবে। শক্তি প্রয়োগের আইনের চেয়ে আইনের শক্তি অনেক বেশি টেকসই।’
জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতার কারণে বিভিন্ন উদ্যোগ আটকে যাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে নিয়ম পরিবর্তন করা প্রয়োজন।
জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের ইসরাইলে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন মোরাতিনোস। তিনি বলেন, ‘তিনি জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব। যেকোনো সময়ে, যেকোনো রাজধানীতে তাঁকে স্বাগত জানাতে হবে। যিনি সমগ্র মানবজাতির প্রতিনিধিত্ব করেন, তাঁর জন্য আপনারা দরজা বন্ধ করে দিতে পারেন না।’
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








