ইউক্রেনের একটি স্কুল
ইউক্রেনের একটি স্কুল। সংগৃহীত ছবি

কিয়েভ অঞ্চলে বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বেজে উঠতেই শিশুরা বুঝে গেল কী করতে হবে। তারা ছোট ছোট ব্যাগ হাতে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছুটল। স্কুলের খেলার মাঠে পড়ে রইল সাইকেল, খেলনা, এমনকি একটি পুতুলও।

Advertisement

শিক্ষকরা পিছিয়ে পড়া শিশুদের দ্রুত জড়ো করে আশ্রয়কেন্দ্রের প্রবেশপথে নিয়ে গেলেন। পরিচ্ছন্নতাকর্মীও খেলার মাঠে কেউ পড়ে আছে কি না, তা খুঁজে দেখলেন। কাউকে ফেলে আসা হয়নি নিশ্চিত হতে হতে তিনি বিড়বিড় করছিলেন।

কিয়েভের উপকণ্ঠে অবস্থিত উমকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালক ভ্যালেন্তিনা কুরিন্না বললেন, ‘সবাই দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে যাও, তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি!’

সবার মনেই তখন হামলার আশঙ্কা। 

এর মাত্র কয়েক দিন আগে একই খেলার মাঠে একটি ড্রোন আছড়ে পড়ে। অল্পের জন্য রক্ষা পান এক দাদা। শিশুরা মাটির নিচের আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গেলেও তিনি বাইরে ছিলেন।

বার্তাসংস্থা এএফপির হাতে আসা নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, বিস্ফোরণের কয়েক সেকেন্ড আগে ওই ব্যক্তি আকাশের দিকে তাকিয়ে দৌড়ে সরে যাচ্ছেন। এরপরই বিস্ফোরণে আগুনের বিশাল গোলা তৈরি হয়। আগুনে পুড়ে যায় নানা রংয়ের খেলার মাঠ।

খালি একটি শ্রেণিকক্ষের অন্য ভিডিওতে দেখা যায়, বিস্ফোরণের ধাক্কায় জানালার কাচ উড়ে যাচ্ছে, চেয়ার উল্টে পড়ছে ও কাচের টুকরো ছড়িয়ে পড়ছে পুরো কক্ষে।

রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের সাড়ে চার বছর পেরিয়ে গেছে। ইউক্রেনের রাজধানীতে অনেকেই এখন বিমান হামলার সাইরেন উপেক্ষা করেন। কিন্তু স্কুলগুলোতে প্রতিবারই শিশুদের আশ্রয়কেন্দ্রে নেয়া হয়।

আগে মস্কো মূলত রাতে কিয়েভে হামলা চালাত। এখন দিনের বেলাতেও হামলা হচ্ছে। ফলে শিশুদের বারবার আশ্রয়কেন্দ্রে নেয়া ও সেখান থেকে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার ক্লান্তিকর কাজ দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।

এএফপি যেদিন স্কুলটি পরিদর্শন করে, সেদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পাঁচবার বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বেজে ওঠে।

ভয়ংকর পরিস্থিতি
কয়েক মিনিটের মধ্যেই স্কুলের ১৩০ শিশুর সবাই মাটির নিচে বসে আবার ক্লাস শুরু করে। 

ইয়াসিয়া, ভারভারা ও আনিয়া নামের দু’টি মেয়ে একটি টেবিল ঘিরে বসেছিল। তাদের বয়স ১১ বছর। কিন্ডারগার্টেন থেকেই তারা বন্ধু।

সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে তারা প্রায় বেঞ্চ থেকে লাফিয়ে উঠছিল। কিন্তু ক্যামেরা তাদের দিকে ঘোরাতেই হঠাৎ লাজুক হয়ে পড়ে।

ভারভারা বলল, ‘ভয় লাগলে আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরতে পারি। কথার মাধ্যমেও একে অন্যকে সান্ত্বনা দিতে পারি।’

পুরোনো স্মৃতিচারণাও তাদের স্বস্তি দেয়। এর মধ্যে ছিল ‘বন্যা’ নামে তাদের পরিচিত একটি ঘটনা। একবার রাতে একসাথে থাকার সময় অসাবধানতাবশত তারা বাথরুম পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছিল। ঘটনাটি মনে করে তারা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছিল।

তবে বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বাজলে কী করতে হবে, তা বলতে গিয়ে তারা গম্ভীর হয়ে ওঠে।

আনিয়া বলে, ‘আমরা সবাই একসাথে আশ্রয়কেন্দ্রে যাই ও পরস্পরের সাথে থাকি।’

সে আরো বলে, ‘আমি বুঝতে পারি না, কেন আমরা এত কাছাকাছি থাকি। আবার একইসাথে আমাদের যত দ্রুত সম্ভব আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যেতে বলা হয়।’

স্কুল পরিচালক কুরিন্না শিশুদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে না দেয়ার জন্য কঠোর চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ভয় পেয়েছি, তা দেখানোর অধিকার নেই। আমাদের হাসতে হবে, শিশুদের জড়িয়ে ধরতে হবে এবং তাদের আশ্বস্ত করতে হবে।’

অভিভাবকদের উদ্বেগ সামলানোর দায়িত্বও শিক্ষকদের ওপর পড়ে। তারা গ্রুপ চ্যাটে নিয়মিত খবর পাঠান। 

সেখানে ইমোজি দিয়ে ‘আমরা নিরাপদে আছি!’ লিখে বার্তা দেন। পাশাপাশি মাটির নিচে বসে শিশুদের পড়াশোনার ছবিও পাঠান।

‘স্বাধীনতা!’
উমকা গ্র্যান্ড স্কুল ইউক্রেনের একটি ব্যতিক্রমী বেসরকারি উচ্চমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

কিয়েভ নগর কর্তৃপক্ষ এএফপিকে জানায়, রাজধানীর মাত্র ৪০ শতাংশ স্কুলে সব শিক্ষার্থীর জায়গা হয়, এমন ধারণক্ষমতার আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। সেসব আশ্রয়কেন্দ্রের অনেকগুলোতেও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই।

বিমান হামলার সময় দীর্ঘায়িত হওয়া এবং হামলার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অভিভাবকেরা শিক্ষা তদারকি কর্তৃপক্ষের কাছে ক্রমেই বেশি অভিযোগ জানাচ্ছেন। তাদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সুপেয় পানির অভাব ও শৌচাগার ব্যবহারের সুযোগ না থাকা।

বেসরকারি অর্থায়ন ও মাটির নিচে পর্যাপ্ত জায়গা থাকায় উমকা সৌভাগ্যবান।

যুদ্ধ শুরুর পরপরই স্কুলের কর্মীরা মাটির নিচের জায়গাটিকে আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তর করেন। প্রাথমিকভাবে সেখানে একটি সংগীত বিদ্যালয় চালুর পরিকল্পনা ছিল।

আশ্রয়কেন্দ্রটিতে চারটি আলাদা প্রবেশপথ রয়েছে। ফলে সব শিশুকে সহজে নিচে নামানো যায়। সেখানে কয়েকটি কক্ষ ও করিডর রয়েছে। সবার জন্য রয়েছে পড়ার টেবিল।

আলাদা একটি কক্ষে ঘুমানোর জন্য সারি সারি দোতলা খাট রয়েছে। সেখানে ছোট শিশুরা গোলাপি ও নীল রংয়ের মাদুরে বসে শিক্ষকের গল্প শুনছিল। তারা গল্পে এতটাই মগ্ন ছিল যে চারপাশের দিকে তাদের খেয়াল ছিল না।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে কুরিন্না বলেন, ‘আমরা শ্রেণিকক্ষের চেয়ে আশ্রয়কেন্দ্রেই বেশি সময় কাটাই।’

আশ্রয়কেন্দ্রে আরামদায়ক পরিবেশ থাকলেও টানা দুই ঘণ্টা মাটির নিচে থাকার পর হামলার আশঙ্কা কেটে যাওয়ার সংকেত শুনে শিশুরা আনন্দে মেতে ওঠে।

ইংরেজি ক্লাস শেষ করে আনিয়া, ইয়াসিয়া ও ভারভারা ছুটে বাইরে যায়। শরতের নির্মল রোদে ১৫ মিনিটের বিরতি উপভোগ করতে থাকে তারা।

ইংরেজিতে আনিয়া বলে ওঠে, ‘স্বাধীনতা!’

এরপর মেয়েরা সহপাঠীদের সাথে যোগ দেয়। সবাই মিলে বিশাল একটি লাল, হলুদ ও নীল বেলুন নিয়ে খেলতে থাকে।

সূত্র : বাসস