ক্ষুব্ধ, তরুণ প্রজন্ম, শিক্ষা, বাসস্থান, জীবনযাত্রা, ব্যয়, উত্তপ্ত, ইউরোপ
ফ্রান্সে জাতীয় বিক্ষোভের পর প্যারিসে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ম্যাকডোনাল্ডস আউটলেট। দ্য গার্ডিয়ান

বিদ্যালয়ের বেহাল অবস্থা, আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার লাগামহীন খরচ বাড়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণরা রাজপথে নেমেছেন। স্পেন, ফ্রান্স ও পর্তুগালসহ একাধিক দেশে এই অসন্তোষ তীব্র বিক্ষোভের রূপ নিয়েছে।

Advertisement

ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান জানায়, ফ্রান্সে দীর্ঘ ক্লাসের সময়সূচি, শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্পষ্ট ভর্তি পদ্ধতির প্রতিবাদে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দফায় দফায় পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। শিক্ষকদের অনুপস্থিতি ও শূন্য পদ পূরণ না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা মাসজুড়ে পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পরবর্তীতে অন্যান্য আন্দোলনকারীরাও শিক্ষার্থীদের সাথে মিছিলে যোগ দেন। মার্কিন বোমাবর্ষণের কারণে হরমুজ প্রণালী কার্যকরভাবে বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে। এর জের ধরে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদ জানান তারা। ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান ট্রেড ইউনিয়ন ‘জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার’ (সিজিটি) এই আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছে। তারা দ্রব্যমূল্য হ্রাস, পেনশন ও মজুরি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। এদিকে দুই মেয়াদ পূর্ণ করার পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এখন এলিসি প্রাসাদে তাঁর মেয়াদের শেষ প্রান্তে রয়েছেন।

পীরেনিজ পর্বতের ওপারে স্পেনে গত সেপ্টেম্বরে আবাসনের আকাশচুম্বী ভাড়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন আন্দোলনকারীরা। ৮৭ বছর বয়সী বৃদ্ধা মারিকারমেন আবাকালকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই ক্ষোভের সূত্রপাত। একটি বিনিয়োগ তহবিল তাঁর বাড়িভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছিল। উচ্ছেদের দুই সপ্তাহ পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। আন্দোলনকারীরা এখন বাড়িভাড়া কমানো, উচ্ছেদ বন্ধ করা এবং বিনিয়োগ তহবিলের আবাসন সম্পত্তি কেনা নিষিদ্ধ করার জোর দাবি জানাচ্ছেন।

একই দাবিতে শনিবার সীমান্ত পেরিয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে পর্তুগালও; লিসবনের কেন্দ্রস্থলে রাজপথে নামেন শত শত মানুষ। সরকারি হিসাব বলছে, গত নয় বছরে (২০১৫-২০২৪) ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ গতিতে পর্তুগালে বাড়িভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৪ শতাংশে।

ইউরোপজুড়ে ১৭ অক্টোবরের গণবিক্ষোভ

 

ইতালির মিলানেও পারিবারিক বাজেটের টানাটানির প্রতিবাদে মিছিল বের হয়। শনিবার শান্তিপূর্ণ মিছিল দিয়ে শুরু হলেও পরে মাস্ক পরা বিক্ষোভকারীরা দাঙ্গা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ও পাথর ছুড়তে থাকে। একপর্যায়ে রেস্তোরাঁ ও বারের টেবিল দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডে আগুন জ্বালিয়ে দেয় তারা।

অন্যদিকে আলবেনিয়ায় প্রধানমন্ত্রী এডি রামার বিরুদ্ধে রবিবার টানা ষষ্ঠ দিনের মতো বিক্ষোভ গড়ায়। দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব ও নিম্নমানের শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন সেখানকার মানুষ। মূলত সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের অর্থায়নে উপকূলীয় একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে গ্রীষ্মকালে এই বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল।

কবে শুরু হয়েছিল এই আন্দোলন?

ফ্রান্সে শিক্ষাসংক্রান্ত এই প্রতিবাদ শুরু হয় সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে, শিক্ষাবর্ষ শুরুর এক সপ্তাহ পর। তবে এরপর থেকে বিক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে শনিবার চরম রূপ নেয়। একই দিনে ইতালি, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামেও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে প্রথমবারের মতো মানুষ রাস্তায় নামেন।

কোনো পরিবর্তন এসেছে কি?

ফ্রান্স সরকার জানিয়েছে, শিক্ষকের অভাব মেটাতে তারা আরো ৩ হাজার বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ দেবে। একই সাথে স্কুলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আগামী বছরের বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রেশন ফি বৃদ্ধির যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তা-ও বাতিল করা হয়েছে। মধ্য-সেপ্টেম্বরে জ্বালানি বিক্ষোভের মুখে নির্দিষ্ট কিছু শিল্পের জন্য পেট্রল ভর্তুকি বাড়ানোর ঘোষণা দেয় এলিসি প্রাসাদ।

স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জরুরি আবাসন আইন পাসের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সংসদে ডানপন্থী ও অতি-ডানপন্থী দলগুলোর বিরোধিতায় বিলটি হেরে যায়। সানচেজ স্পেনের জনগণকে জানান, নতুন সংস্কারগুলো পাস করাতে তাঁর ‘বৃহৎ প্রগতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ প্রয়োজন। তাই তিনি ২৯ নভেম্বরের জন্য আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়েছেন।

বিক্ষোভ থামার কোনো সম্ভাবনা কি আছে?

গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের সাথে জরুরি বৈঠক শেষে ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাখোঁ রবিবার রাতে টেলিভিশনে ভাষণ দেবেন। তবে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নূন্যেজ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে সরকার আর ছাড় দিতে রাজি নয়। তিনি এই সহিংসতার জন্য ‘অতি-বামপন্থী’ বিক্ষোভকারী ও ভবনে লুটপাট চালানো দুর্বৃত্তদের দায়ী করেন। ২০২৭ সালের এপ্রিলে ফ্রান্সে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

অন্যদিকে স্পেন সরকার যদি বিশেষ কমিটির মাধ্যমে তাদের অন্তত কিছু আবাসন অধ্যাদেশ পাস করাতে পারে, তবে নির্বাচনের আগেই সেখানে আন্দোলন থামতে পারে। আগামী মাসের নির্বাচনে জয়ী হলে সানচেজের সোশ্যালিস্ট ও কনজারভেটিভ পপুলার পার্টি দুই পক্ষই নতুন ঘরবাড়ি তৈরি এবং আবাসন সমস্যা সমাধানে জোর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।