সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় লোগো। নয়া দিগন্ত

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অন্তত ৫৪টি অভিন্ন নদী বয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী, এসব নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার অধিকার বাংলাদেশের থাকলেও, দিল্লি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের তা থেকে বঞ্চিত করে আসছে। ইতোমধ্যে গঙ্গায় ফারাক্কা বাঁধ এবং তিস্তায় ভারতীয় অংশে গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করছে। এতে প্রতি গ্রীষ্মে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তীব্র পানি সঙ্কট দেখা দিচ্ছে, যা আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ ও কৃষি খাতের অপূরণীয় ক্ষতি করছে।
এমন পরিস্থিতিতে ভারতের বিতর্কিত ও উচ্চাভিলাষী ৮৭ বিলিয়ন ডলারের মেগা ‘আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প’ (ইন্টার-লিংকিং অব রিভার্স-আইএলআর)  বাংলাদেশের জন্য আরো ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনবে। মহাবিপর্যয়কর এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে খোদ ভারতের অভ্যন্তরে নদী গবেষক, পরিবেশবিদ ও ক্ষতির মুখে পড়া স্থানীয়রা তীব্র প্রতিবাদ করছেন। অথচ ভাটির দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা নেই। শুধু তাই নয়, দেশের মধ্যেও জনসচেতনতামূলক পদক্ষেপের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। একটি নদীবহুল দেশের দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্ব, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি এবং পরিবেশ সরাসরি এসব অভিন্ন নদীর পানি প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। তাই প্রকৃতিবিনাশী এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে নীতিনির্ধারকদের নিষ্ক্রিয়তা অত্যন্ত উদ্বেগের।
ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনার আওতায় প্রধান প্রধান আন্তঃদেশীয় নদীর উজানে পানি অপসারণ বা প্রবাহ অন্যত্র ঘুরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে। পরিণামে আমাদের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিব্যবস্থা পুরোপুরি ধসিয়ে দেবে। ইতঃপূর্বে একতরফা কয়েকটি নদী বিশেষ করে পদ্মা ও তিস্তার পানি প্রত্যাহারে সেগুলোর প্রবাহ কমে গেছে। এতে বাংলাদেশের সুন্দরবনসহ পুরো উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছেছে। মিষ্টি পানির অভাবে প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। ভূগর্ভের পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ায় সুপেয় পানির হাহাকার পড়েছে। বিপরীতে বর্ষাকালে উজান থেকে হঠাৎ অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেয়ায় কৃত্রিম বন্যা ও ভয়াবহ নদীভাঙনে প্রতি বছর নিঃস্ব হচ্ছেন হাজারো মানুষ।
ভারতের অভ্যন্তরে তীব্র বিতর্ক থাকলেও দিল্লি ইতোমধ্যে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের আওতায় ‘কেন-বেতোয়া লিংকের’ নির্মাণকাজ পুরোদমে এগিয়ে নিচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এটি শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ নিয়ে ভারতের ভেতরে বিতর্ক আছে ভেবে বাংলাদেশের নিশ্চুপ বসে থাকার অবকাশ নেই। দিল্লির পরিবেশবিনাশী এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। তা না হলে ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পরিবেশগত মহাবিপর্যয়ের খেসারত দিতে হবে।
ভারতের প্রকৃতিবিধ্বংসী প্রকল্প কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন। ভারতের অন্যায্য পানি নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক পর্যায়ে ঢাকার সর্বোচ্চ সতর্ক দৃষ্টি ও কঠোর অবস্থান নেয়ার কোনো বিকল্প নেই। অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় এবং পরিবেশগত চক্রান্তের বিরুদ্ধে ঢাকাকে আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালো দাবি তুলতে হবে।  
দেশকে সম্ভাব্য মরুকরণের হাত থেকে বাঁচাতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা, সরকারের দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থান এবং দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে  জোরালো জনমত গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

Advertisement