সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় লোগো। নয়া দিগন্ত

অনেক দেশে প্রাথমিক শিক্ষা উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ধরা হয়। আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত। এখন সময় এসেছে অন্যান্য দেশের মতো আমাদের শিক্ষার স্তর নতুনভাবে বিন্যস্ত করার। এ বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে ভাবা দরকার। প্রাথমিক শিক্ষা দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত করা গেলে এবং যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষকদের পদোন্নতি দেয়া হলে  শিক্ষার গুণগত মান আমূল পাল্টানো সম্ভব। এতে মেধাবী তরুণরা এ  পেশায় আরো বেশি আগ্রহী হবেন।
নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩০ ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতার শিক্ষক কাজ করছেন, যা আপাতদৃষ্টিতে একটি ইতিবাচক চিত্র। প্রাথমিক শিক্ষা তথ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের (আইপিইএমআইএস) সাম্প্রতিক তথ্য, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাস্টার্স, এমফিল, পিএইচডি, প্রকৌশল, কৃষিশিক্ষা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো বিশেষায়িত ডিগ্রি-সম্পন্ন উচ্চশিক্ষিত তরুণরা শিক্ষকতায় যুক্ত হচ্ছেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এই পরিবর্তনকে শিক্ষার মানোন্নয়নে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু এই তথ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভিন্ন আর্থসামাজিক বাস্তবতা। সাদা চোখে সহজে যা ধরা পড়ে। উল্লিখিত পরিসংখ্যান থেকে উন্মোচিত হয় আমাদের কর্মসংস্থানের নাজুক চিত্র। আসলে গুটিকয়েক ব্যতিক্রম বাদ দিলে সাধারণত কর্মসংস্থানের তীব্র অভাব এবং উপযুক্ত চাকরির অপ্রতুলতায় উচ্চ ডিগ্রিধারীরা বাধ্য হয়ে প্রাথমিকের শিক্ষক পদে যোগ দিচ্ছেন।
উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পর একজন এমফিল, পিএইচডি কিংবা প্রকৌশল ও চিকিৎসার মতো পেশাদার সনদধারী যখন প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক পদে যোগ দেন, তখন তা শুধু তাদের স্বেচ্ছায় পেশা বেছে নেয়া নয়; বরং দেশের বেকারত্ব ও কর্মসংস্থান সঙ্কটের প্রতিচ্ছবি। 
এসব উচ্চশিক্ষিত তরুণ প্রাথমিকের শিক্ষকতায় যেভাবেই আসুন না কেন, তাদের যদি এ পেশায় ধরে রাখতে হয় তাহলে শুধু নিয়োগ দিয়ে সরকারের দায় শেষ করলে চলবে না। উপযুক্ত মর্যাদা ও কাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। এ জন্য প্রথমত, প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতনভাতা ও কাঠামোগত পদমর্যাদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। কারণ যোগ্যতার ভিত্তিতে আকর্ষণীয় স্কেল না দিলে এই পেশায় মেধাবীরা বেশি দিন থাকবেন না। শুধু আপৎকালীন কিছু দিনের জন্য কর্মরত থেকে বেকারত্ব ঘোচাবেন। সময়-সুযোগ মতো পেশা বদলে  ফেলবেন। দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোটি উচ্চশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ এসব শিক্ষক দিয়ে সাজাতে হবে, যারা সহজে শিক্ষকদের ভেতর-বাইরের সমস্যা ও সম্ভাবনা বুঝতে সক্ষম। এ জন্য সহকারী শিক্ষক থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন, প্রশিক্ষণ এবং নীতিনির্ধারণী প্রশাসনিক পদগুলোতে শিক্ষকদের পদোন্নতির সুযোগ সুগম করতে হবে। 
অবকাঠামোগত দিক থেকে দেশের ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশির ভাগে বিদ্যুৎ সংযোগ ও খেলার মাঠ আছে। তবে ইন্টারনেট সুবিধাসহ আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি প্রকট। আধুনিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনে উচ্চশিক্ষিত শিক্ষকদের সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে তবেই আমরা একটি সমৃদ্ধ-টেকসই প্রাথমিক শিক্ষকসমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো। রাষ্ট্রকে অনুধাবন করতে হবে, ভিত্তি মজবুত না হলে শিক্ষার কোনো সুফল দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

Advertisement