
সড়কে বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে আসছে। কোনোটি আবার সংবাদমাধ্যমের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। তবে মৃত্যুর খবরগুলো অনেকটা ‘স্বাভাবিক’ ঘটনা হিসেবে ধরে নিচ্ছি আমরা। গতকাল ছিল ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’। এ উপলক্ষে সড়কে মৃত্যুর নানামাত্রিক জরিপ প্রকাশ করেছে সংবাদপত্রগুলো। সড়ক দুর্ঘটনা কেন হয়, এর সমাধান কী— এসব বিশ্লেষণও তুলে ধরা হয়েছে। এমন গবেষণার তথ্য নিয়মিত আসে আমাদের সামনে। এগুলো দেখে হয়তো কিছু সময়ের জন্য হা-হুতাশ করি। তারপর ভুলে যাই। সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব যাদের, তারাও বেমালুম ভুলে যান। নিয়মিত ও গতানুগতিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এসব লক্ষণ বলে, হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সংবেদনশীলতা।
গত ছয় বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর হাজারের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শিশুমৃত্যুর পরিমাণ মোট মৃত্যুর ২৪ শতাংশ। বেশির ভাগ শিশু দুর্ঘটনায় পড়ছে গ্রামে— অটোরিকশা, ইজিবাইক, মোটরসাইকেলের কারণে। লাইসেন্সবিহীন এসব বাহনের বেপরোয়া গতি শিশুদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। দেখা গেছে, নিহত শিশুদের কেউ বাড়ির পাশে খেলছিল অথবা সড়ক পারাপার হতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার। উদ্বেগজনক তথ্য, এমন অনেক ঘটনায় মামলা হয় না। ‘আপসে’র নামে ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে। এতে চালকরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
চালকদের চালানোর দক্ষতা আর যানবাহনের লাইসেন্স সিস্টেম না থাকলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো কোনোভাবে সম্ভব নয়। অথচ প্রতিদিন যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। সেই সাথে বাড়ছে দুর্ঘটনা। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত চালক তৈরির কথা থাকলেও ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়ার প্রক্রিয়াতে পাওয়া গেছে গুরুতর অনিয়ম। লাইসেন্স পেতে যে পরীক্ষা দিতে হয়, তার জন্য অনেকে ভুয়া ডকুমেন্টে আবেদন করেন। পরীক্ষাকেন্দ্রের অনেক কিছু থাকে দালালদের নিয়ন্ত্রণে। তাই পরীক্ষার্থীদের ৮৪-৯৫ শতাংশ পরীক্ষায় উতরে যাচ্ছেন। পাসের এই হারকে অস্বাভাবিক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। মূলত দক্ষতা অর্জন না করে দক্ষ চালকের সনদ পেয়ে যাচ্ছেন অনেকে।
চালকদের বেলায় চিহ্নিত হয়েছে আরো এক সঙ্কট। বিশেষ করে দূরপাল্লার বাসের চালকরা পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ পান না। তাদের ক্লান্তিও দুর্ঘটনার বড় একটি কারণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। কক্সবাজার থেকে ঢাকা অথবা দীর্ঘতম দিনাজপুর রুটে চলাচলকারী বাসগুলোতে মাত্র একজন চালক থাকেন। তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা টানা স্টিয়ারিং ধরে থাকতে হয়। রাতের যাত্রায় বা দীর্ঘপথ পাড়ি দেয়ার সময় চোখে ঘুম আসে। শরীরে ঝিমুনি তৈরি হয়। এতে বাস দুর্ঘটনায় পড়ে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, চালকরা রোবট নন, তাদেরও বিশ্রামের প্রয়োজন আছে। চালকদের শারীরিক সক্ষমতা এবং শ্রমঘণ্টা নির্ধারণ করে দেয়া এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। সেই সাথে তাদের ওপর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। দূরপাল্লার প্রতিটি বাসে পালা করে দায়িত্ব পালনে একাধিক দক্ষ চালক রাখার নিয়ম নিশ্চিত করতে হবে।
গ্রাম-শহরের ব্যাটারিচালিত যানবাহনগুলো সুনির্দিষ্ট নীতিমালায় নিয়ে আসাও জরুরি হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এর জন্য পরিবহন মালিক, চালক, প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণসহ সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








