সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় লোগো। নয়া দিগন্ত

পৃথিবীতে নবজাতকের আগমন নিঃসন্দেহে আনন্দের। কিন্তু তাদের আগমন নিরাপদ করতে আমাদের আয়োজন অপ্রতুল। অপরিণত জন্ম, কম ওজন ও শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতায় নবজাতকদের জীবন প্রায়শ নাজুক থাকে। এ সময় তাদের প্রয়োজন হয় নিবিড় পরিচর্যা, যা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র বা এনআইসিইউ থাকার কথা। আমাদের দেশে ঢাকার বাইরের হাসপাতালে এনআইসিইউর অভাব প্রকট। ফলে নবজাতকদের নিয়ে বিপাকে পড়েন বাবা-মা ও স্বজনরা। 
একটি সহযোগী দৈনিকের খবরে বলা হয়েছে, দেশে প্রতিদিন জন্ম নেয় প্রায় ১০ হাজার শিশু। এসব নবজাতকের অনেকেরই দেখা দেয় নানা জটিলতা। প্রয়োজন হয় নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের (এনআইসিইউ) বিশেষায়িত সেবা। অথচ উপজেলা, জেলা, এমনকি বিভাগীয় পর্যায়ের অনেক সরকারি হাসপাতালেও এ সেবার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে অসুস্থ নবজাতকদের নিয়ে রাজধানীতে ছুটতে হয় অভিভাবকদের। এতে যেমন ঢাকার হাসপাতালে রোগীর বাড়তি চাপ পড়ে, তেমনি সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে ঝুঁকিতে পড়ে নবজাতকের জীবন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের এনআইসিইউতে শয্যা রয়েছে মাত্র ৩৮টি। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ১৮টি এনআইসিইউ শয্যাও কখনো খালি থাকে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সারা দেশ থেকে আসা রোগীর চাপে সীমিত এ সক্ষমতা দিয়ে সঙ্কটাপন্ন নবজাতকদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল দু’টি।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও আইসিডিআর,বি আয়োজিত এক কর্মশালায় বলা হয়েছে, দেশে ১৬ শতাংশ শিশুর জন্ম হয় অপরিণত অবস্থায়। বিশ্বে আকালিক বা সময়ের আগে জন্ম নেয়া শিশুর এই হার সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কম ওজনের শিশু জন্মহার ২৩ শতাংশ। প্রতিদিন এক হাজার ৩৪০ শিশু এবং ঘণ্টায় ৫৬ শিশু প্রিম্যাচিউরড অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু এসব শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও তার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে প্রতি ঘণ্টায় দেশের কোথাওনা কোথাও অপরিণত ও কম ওজনের তিনটি নবজাতকের মৃত্যু হচ্ছে।
অন্যদিকে গত বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক আরো কিছু সংস্থার এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দু’টি দেশ ছাড়া বাকি দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য পরিস্থিতি খারাপ।
এ অবস্থায় নবজাতকদের সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে— সরকারি চিকিৎসাসেবার পরিধি সঙ্কুচিত হলে খুব সহজেই সেই সুযোগটা লুফে নেয় বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যসেবা মানেই অতিরিক্ত অর্থ খরচ, যা জনগণের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। সরকারি হাসপাতালের এনআইসিইউ সেবা যেখানে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৬০০ টাকায় মেলে, সেখানে বেসরকারি হাসপাতালে এই সেবা নিতে প্রতিদিন খরচ হয় ১০ থেকে ২৫ হাজার টাকা! 
উপজেলা, জেলা কিংবা বিভাগীয় শহরের হাসপাতালে নবজাতকদের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি এনআইসিইউ সেবার ব্যবস্থা থাকলে মানুষকে আর সেখান থেকে ঢাকায় আসতে হয় না। এতে তাদের ভোগান্তি কমবে, অর্থ সাশ্রয় হবে। আশা করি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঢাকার বাইরে এনআইসিইউ সেবা সম্প্রসারণে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।

Advertisement