সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় লোগো। নয়া দিগন্ত

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অঙ্গীকার হলো নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এজন্য দরকার আইনের শাসন। কিন্তু বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জননিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আইন প্রয়োগে শিথিলতা, অপরাধীদের বিচারে দীর্ঘসূত্রতা এবং মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে। অপরাধের পর অপরাধীকে আইনে সোপর্দ না করে উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দেয়ার ঘটনাও ঘটছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম ৯ মাসে দেশে ৩৯৮টি গণপিটুনি ও গণসহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৮৭ জন মানুষ। রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যু হয়েছে ৭৩ জনের। এগুলোর ৯১ শতাংশই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিএনপির সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষে ঘটেছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৩৪২টি ঘটনায় ৪০ জন নিহত ও দুই হাজার ৬৩২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপির সাথে জামায়াতের সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ১১ জন, আহত দুই হাজার ১৯০ জন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকেন্দ্রিক ৪০২টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ১৩ জন, আহত দুই হাজার ৬২৩ জন।
কেবল অভ্যন্তরীণ সঙ্ঘাত নয়, এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সীমান্তের চিত্রও। এই কয় মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হামলায় মৃত্যু হয়েছে ১৩ বাংলাদেশীর। আহত হয়েছেন ৩৯ জন। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের এভাবে সীমান্তে হত্যা করা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। সীমান্ত হত্যা বন্ধে বারবার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না, যা উদ্বেগজনক।
প্রতিবেদনে নারীদের ওপর সহিংসতা, পারিবারিক নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো ঘটনার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। আইনি সুরক্ষার অভাবে এসব সহিংসতা ঘটছে। সমাজে নারী ও শিশুরা সুরক্ষিত না থাকলে সেখানে মানবাধিকারের স্বাভাবিক চর্চা অসম্ভব। 
৯ মাসে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে ৪৬৫টি পৃথক ঘটনায় ৪৯১টি লাশ উদ্ধারের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, অপরাধীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। 
রাজনৈতিক সঙ্ঘাত কেবল সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থায়িত্বকে ধূলিসাৎ করে দেয়। সবচেয়ে বেশি শঙ্কার বিষয় হলো রাষ্ট্রের হেফাজতে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া। 
আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। গণপিটুনি ও রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়িতদের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিচয় না দেখে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে উপলব্ধি করতে হবে— হিংসা ও বিচারহীনতা আমাদের জন্য টেকসই ভবিষ্যৎ নিয়ে আসবে না।

Advertisement