মতামত
সম্পাদকীয় লোগো। নয়া দিগন্ত

কক্সবাজারের চকরিয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে মাতামুহুরী নদী। এ নদী ঘিরে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অবৈধ বালু উত্তোলনকারী একটি চক্র। দুই উপজেলার প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অন্তত অর্ধশতাধিক পয়েন্টে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে এই অপকর্ম সংঘটিত হচ্ছে। কোথাও দিনে-রাতে, আবার কোথাও রাতের আঁধারে চলছে পরিবেশবিনাশী কর্মকাণ্ড। দীর্ঘদিন ধরে চলা ‘বালু লুটের মহোৎসব’ শুধু নদীটির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে না; বরং নদীতীরের ফসলি জমি, বসতভিটা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে তীব্র ভাঙনের ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে। নয়া দিগন্তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
অবশ্যই নির্মাণকাজে বালু একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তা হলেও বালু উত্তোলনের নির্দিষ্ট পরিবেশগত আইন, ইজারা ও অনুমতি-প্রক্রিয়া আছে। কিন্তু মাতামুহুরী নদীতে কোনো ধরনের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বা সমীক্ষা ছাড়া যত্রতত্র ড্রেজার মেশিন বসিয়ে যেভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে; তা সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিবেশগত বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর উপযুক্ত সমীক্ষা ও পরিবেশগত মূল্যায়ন ছাড়া যেখানে-সেখানে বালু উত্তোলন নদীর তলদেশের গঠন, তীরের স্থিতিশীলতা এবং পানিপ্রবাহের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে নদীর বাঁক, সেতু, প্রতিরক্ষা বাঁধ ও বসতিপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করা হলে নদীভাঙন ও অবকাঠামোগত ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে। শুধু তাই নয়, বাঁক ও বসতিপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন করা হলে নদীর তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। তদুপরি, নিয়মবহির্ভূভাবে বালু উত্তোলন করায় সরকারও বঞ্চিত হচ্ছে বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো— প্রশাসনের তরফ থেকে মাঝে মধ্যে ঝটিকা অভিযান চালানো হয় বটে। তবে এতে কাজের কাজ কিছু হয় না। অভিযান শেষ হতে না হতে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা প্রভাবশালী দুষ্টচক্রটি পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। স্মরণযোগ্য যে, জরিমানা বা লোকদেখানো অভিযানে পরিবেশ বিনাশী এই অপকর্ম স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয়। যদিও বালুখেকোদের চিহ্নিত করে দ্রুত ও কঠোর অভিযানের আশ্বাস দিয়েছেন চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শফিউল আলম। অভিযান বাস্তবায়নে এর কতটুকু প্রতিফলন ঘটবে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মনে ঘোরতর সংশয় আছে।
প্রশাসনের মনে রাখা প্রয়োজন, মাতামুহুরী শুধু একটি নদী নয়। এটি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের কৃষি, মানুষের জীবনজীবিকা ও পরিবেশগত ভারসাম্যের প্রাণকেন্দ্র। তাই নদীটি বাঁচাতে এখন চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত ও ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। একইভাবে অবৈধ বালু উত্তোলনের সাথে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের তোয়াক্কা না করে নদী রক্ষায় শূন্য সহনশীলতা বা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের বিকল্প নেই। অন্যথায়, অচিরেই মাতামুহুরীর তীরবর্তী জনপদ নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে, তা সহজে বলা যায়। সঙ্গত কারণে মানবসৃষ্ট এই বিপর্যয় রোধে কোনো ধরনের গাফিলতি বা শৈথিল্য দেখানোর অবকাশ নেই।

Advertisement