সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে বিদায় নিয়েছে ফ্যাসিস্ট রেজিম; কিন্তু সেই সময়ের সংস্কৃতি থেকে গেছে এখনো। ক্ষমতাসীন দলের সাথে যুক্ত অনেকে সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে সারের ডিলারশিপ নিচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে ডিলারশিপ ভাগাভাগি করা হচ্ছে ফ্যাসিবাদের দোসরদের সাথে। বিষয়টি নিয়ে গতকাল প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সহযোগী একটি দৈনিক। এতে খুলনা, টাঙ্গাইল, ঝিনাইদহ ও ময়মনসিংহের গৌরীপুরে ডিলার নিয়োগ ঘিরে অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
কৃষি ও কৃষকের টিকে থাকার বড় উপাদান রাসায়নিক সারের সহজলভ্যতা ও সঠিক বণ্টন; কিন্তু এই সারের ডিলারশিপ নিয়ে গড়ে উঠেছে ভাগাভাগির দুষ্টচক্র। প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়— যার কোনো গুদামঘর ও বিক্রয়কেন্দ্র নেই, তিনি কাগজপত্রে বরফকল বা মিষ্টির দোকানকে গুদামঘর দেখিয়ে ডিলারশিপ বাগিয়ে নিয়েছেন! ঝিনাইদহে সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে সরকারি কর্মকর্তা বা শিক্ষকদের নিকটাত্মীয় এবং রাজনৈতিক স্বজনদের সুবিধা দেয়া হয়েছে। টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহের গৌরীপুরে প্রভাবশালীদের ভাতিজা, দলীয় নেতাকর্মী এবং অবৈধ আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে অযোগ্য ব্যক্তিদের হাতে সারের ডিলারশিপ তুলে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। হতাশার বিষয় হলো— এসব অভিযোগের ব্যাপারে উদাসীনতা দেখাচ্ছে স্থানীয় দায়িত্বশীলরা। ‘দেখছি-দেখা হচ্ছে’ বলে এড়িয়ে যাচ্ছেন ইউএনও এবং কৃষি কর্মকর্তারা। 
সারের মূল বণ্টন ব্যবস্থা এভাবে অসাধুদের দখলে চলে গেলে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হয়। পরে সার বিক্রি হয় কালোবাজারিতে। তখন ন্যায্যমূল্যে সার পান না কৃষক, যা সার্বিক জাতীয় খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো— যেসব ব্যক্তি বিগত ১৭ বছর ধরে ফ্যাসিবাদী রেজিমের সুবিধাভোগী, সরাসরি ফ্যাসিবাদী শক্তির দোসর ছিলেন, তারা নতুন করে খোলস পাল্টে ডিলারশিপ বাগিয়ে নিচ্ছেন। কোথাও দেখা যাচ্ছে, তারা স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয়। তাদের গড়ে তোলা দুষ্টচক্রে দলের ভেতরেও কোণঠাসা হয়ে আছেন ত্যাগীরা।
একজন ফ্যাসিস্ট পালিয়ে গেলেই ফ্যাসিবাদী অপসংস্কৃতির অবসান হয় না। তার দোসর, তার তৈরি করা সিস্টেম এবং সংস্কৃতির মধ্য দিয়েও ফ্যাসিবাদ টিকে থাকে। শেখ হাসিনা রেজিম যে রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল, সেটি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করেছিল, লুটপাট চালিয়েছিল। এখনো সেই একই পন্থা টিকিয়ে রাখা এবং অর্থনৈতিক সুবিধা ভাগাভাগির অর্থ হলো— শহীদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা। আমাদের মনে রাখতে হবে, চব্বিশের বিপ্লব হয়েছিল বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত দেশ গঠনের প্রত্যাশায়। জুলাইয়ের মূল চেতনা ছিল জবাবদিহি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। সেই চেতনার সাথে প্রতারণা করে ফ্যাসিবাদের দোসরদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া মেনে নেয়া যায় না। দায়িত্বশীল জায়গা থেকে যদি এ হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার রাজনীতি বন্ধ না হয়, তাহলে সরকারের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে। সেই সাথে জনমনে ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দেবে। 
আমরা মনে করি, সার ডিলার নিয়োগের এ বিতর্কিত তালিকা বাতিল করা প্রয়োজন। সেই সাথে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা দরকার। এর সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। স্বচ্ছতার সাথে যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত ও যোগ্য ব্যবসায়ীদের হাতে ডিলারশিপ তুলে দিতে হবে। সারের মতো স্পর্শকাতর কৃষি উপকরণের বিলিবণ্টন নিয়ে ভাগাভাগির রাজনীতি বন্ধ হোক। 

Advertisement