সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

বাংলাদেশে রুপালি ইলিশ শুধু স্বাদের জন্য সুপরিচিত নয়, এটি আমাদের দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ভূমিকা রাখে। তাই মা-ইলিশের বংশবৃদ্ধি ও নিরবচ্ছিন্ন প্রজনন নিশ্চিত করতে প্রতি বছর সরকার নির্দিষ্ট সময়ে ২২ দিনের জন্য এই মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। উদ্দেশ্য অত্যন্ত স্পষ্ট, মা-ইলিশ যাতে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়তে পারে। সেই সাথে ইলিশের উৎপাদন সুরক্ষা দেয়া। কিন্তু পটুয়াখালীর দুমকি এবং চাঁদপুরের মতলব উত্তরের চিত্র ভিন্ন এক আশঙ্কাজনক কথা মনে করিয়ে দেয়। এই দুই জায়গার যে চিত্র, তাতে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে এখন মা-ইলিশ রক্ষার কর্মসূচি যেন ‘চোর-পুলিশ খেলা’য় পরিণত হয়েছে।
নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন বলছে, দুমকির পায়রা নদী কিংবা মতলব উত্তরের মেঘনা নদী, সবখানে অসাধু জেলে ও চক্রের অপতৎপরতা সমান তালে চলছে। অভিযানের ট্রলার এক দিকে গেলে নদীটির অন্য প্রান্তে জাল ফেলা হচ্ছে; টহল দল সরে গেলে আবার চলছে মা-ইলিশ শিকার। শুধু তা-ই নয়, বরফভর্তি বাক্সে গোপনে মাছ সংরক্ষণ, চরাঞ্চল ও নদীসংলগ্ন অস্থায়ী হাটে ডিমওয়ালা তাজা ইলিশ প্রকাশ্যে কেনাবেচার ঘটনা মা-ইলিশ রক্ষা কর্মসূচির মূল লক্ষ্য অকার্যকর করে দিচ্ছে। জেলেদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের নারী-শিশুদের নজরদারির কাজে ব্যবহার করা এবং মুঠোফোনে আগাম বার্তা পাঠিয়ে সরে পড়ার কৌশল প্রমাণ করে, এই অবৈধ কার্যক্রম কতটা সুসংগঠিত।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনবলসঙ্কট, নৌযানের স্বল্পতা, নদীপথের বিশালতা ও দুর্গম এলাকার অজুহাত দেয়া হচ্ছে। স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তা-উপজেলা প্রশাসনের এ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সীমিত সামর্থ্যরে অজুহাতে জাতীয় সম্পদ ধ্বংস হতে দেয়া যায় না। এর মাশুল আমাদের মৎস্য খাতকে দিতে হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে ইলিশের উৎপাদন বা আহরণে যে নেতিবাচক প্রভাব ও হ্রাস, মা-ইলিশ রক্ষার অভিযানে এই অকার্যকারিতা ও ব্যর্থতা সে সঙ্কট আরো বহু গুণ বাড়িয়ে তুলবে। ডিমওয়ালা একটি মা-ইলিশ শিকারের অর্থ— লাখ লাখ রেণু ইলিশের সম্ভাবনা অঙ্কুরে বিনষ্ট করা। সাময়িক লাভে যদি আমরা প্রজনন মৌসুমে অবাধে মা-ইলিশ নিধন চলতে দিই, অদূরভবিষ্যতে দেশের নদ-নদী ইলিশশূন্য হয়ে পড়বে।
শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল দিয়ে এই সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য দরকার নিষেধাজ্ঞাকালে প্রকৃত ও তালিকাভুক্ত জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি খাদ্যসহায়তা যেন কোনোভাবে দুর্নীতির শিকার না হয়। যাতে সময়মতো সঠিক ব্যক্তির হাতে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা। কারণ অভাবের তাড়নায় অনেকসময় জেলেরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামতে বাধ্য হন। সেই সাথে অভিযানের গতি বাড়াতে মৎস্য বিভাগ এবং নৌপুলিশকে দ্রুতগতির আধুনিক নৌযান ও পর্যাপ্ত জনবল দিতে হবে। নদীতে অভিযানের পাশাপাশি অবৈধ ইলিশের গোপন বাজার, অস্থায়ী হাট এবং বরফকলগুলোতে কঠোর নজরদারি ও তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে।
ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ। অভিযানকে কেবল কাগজে-কলমে বা লোক দেখানো প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ না রেখে কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সর্বস্তরের জনগণকে এক হয়ে মা-ইলিশ রক্ষায় শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় দেশের ইলিশ সম্পদ রক্ষা করা খুব কষ্টসাধ্য হবে, এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়।

Advertisement