
মানবপাচার বাংলাদেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। দেশে কর্মসংস্থানের সঙ্কট, দারিদ্র্য এবং অসচেতনতার সুযোগ নিচ্ছে পাচারকারী চক্র। জীবনযাত্রার মান দ্রুত বদলে যাবে বলে প্রলোভন দেখানো হচ্ছে দরিদ্র মানুষকে। ভালো চাকরি, আকর্ষণীয় বেতন ও উন্নত জীবনের ভুয়া আশ্বাস দিয়ে গ্রামের তরুণ-তরুণীদের থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী বা নির্মাণশ্রমিক পাঠানোর নামে প্রতারণা করছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্র। ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ভাসিয়ে দেয়া হচ্ছে ভূমধ্যসাগরে।
সম্প্রতি যোগ হয়েছে রাশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর নামে প্রতারণা। সম্প্রতি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজের আশায় রাশিয়ায় গিয়েছিলেন ৩০ বাংলাদেশী। সেখানে পৌঁছার পর তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে তুলে দেয়া হয় দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে। তাদের দেয়া হয় ২১ দিনের নামমাত্র প্রশিক্ষণ। তারপর পাঠিয়ে দেয়া হয় রাশিয়া-ইউক্রেন রণক্ষেত্রের প্রথম সারিতে। শিউরে ওঠার মতো তথ্য হলো, বাংলাদেশীদের সেখানে পাঠানো হয়েছিল প্রতিপক্ষের অবস্থান ও দূরত্ব শনাক্তকরণের ‘শিকার’ বা টোপ হিসেবে। অর্থাৎ, ড্রোন হামলার শিকার হয়ে অথবা প্রাণ দিয়ে তারা শত্রুর অবস্থান জানান দেবেন। প্রথম দিনই ড্রোন হামলায় তাদের ১৭ জনের মৃত্যু হয়। পরে আরো তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে একজন পঙ্গু হয়ে জীবিত ফিরে এসেছেন।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালসহ কয়েকটি ভুয়া রিক্রুটিং এজেন্সি এই ৩০ বাংলাদেশীকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিল। বিনিময়ে নেয়া হয়েছিল মোটা অঙ্কের টাকা। এসআরবি ইতোমধ্যে চক্রের দু’জনকে গ্রেফতার করেছে, যা প্রশংসনীয়। কয়েকজনকে গ্রেফতার করাই যথেষ্ট নয়; এই চক্রের মূলোৎপাটন করতে হবে।
বাংলাদেশের সামগ্রিক মানবপাচার পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, পাচারকারীরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশলে পরিবর্তন আনছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের আন্তর্জাতিক ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস’ (টিআইপি) প্রতিবেদনে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় ধাপে আছে। নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাচার প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগ থাকলেও ঘাটতি ও চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি। আমরা আশা করি, এই ঘাটতিগুলো কাটিয়ে উঠতে উদ্যোগী হবে সরকার। দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে হবে। রাশিয়ায় আটকে থাকা অন্যান্য বাংলাদেশীদের উদ্ধারে পররাষ্ট্র ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের চিকিৎসায় পদক্ষেপ নিতে হবে। কূটনৈতিক চ্যানেলে এ ধরনের অমানবিক আচরণের প্রতিবাদ জানাতে হবে। নিহতদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
জনসাধারণের সচেতনতাও এখানে জরুরি। জমিজমা বিক্রি বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে অনিশ্চিত গন্তব্যে পাড়ি জমানোর আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করা আবশ্যক। তবে পাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করলে এমন ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি হতেই থাকবে। আমরা দেখেছি, মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন থাকলেও বহু মামলা ঝুলে থাকে। মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। অনেক সময় বৈধ রিক্রুটিং লাইসেন্সের আড়ালেও চালানো হয় পাচার ব্যবসা। মানবপাচার রোধে সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শিথিলতা স্পষ্ট। এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








