সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

এক মাসের ব্যবধানে ফের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের নতুন পথনকশার কথা বলেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২১ জানুয়ারি থেকে পাঁচ ধাপে শুরু হয়ে ভোটগ্রহণ শেষ হবে ২৭ মে। এর আগে ১২ নভেম্বর থেকে এই নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণের প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছিল ইসি। তবে পরদিন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী এক প্রতিক্রিয়ায় জানান, এ বিষয়ে ইসি সরকারের সাথে কোনো আলোচনা করেনি। সরকারের এই অবস্থানের পর ইসি পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের এভাবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে স্বাভাবিকভাবে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ  ভোটারদের মনে নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল।
দেশের গণতন্ত্রকামী নাগরিকসমাজ আর কোনো সঙ্ঘাতময়, বিতর্কিত কিংবা প্রহসনের নির্বাচন চায় না। সম্প্রতি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনী সংস্কৃতির যে একটি ইতিবাচক সূচনা হয়েছে; নাগরিক প্রত্যাশা— সে ধারা যেন ব্যাহত না হয়। তবে এ কথা অনস্বীকার্য, সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে দলীয় সরকারের অধীনে। একটি সঙ্ঘাতমুক্ত ও সুষ্ঠু ইউপি নির্বাচন আয়োজন করা বর্তমান ইসি এবং সরকার উভয়ের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা।
ইউপি নির্বাচন ঘিরে একসময় গ্রামাঞ্চলে আনন্দ-উচ্ছ্বাস বিরাজ করত। কিন্তু ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন রূপ নিয়েছিল এক প্রহসনে। এর সাথে ছিল সরকারদলীয় নেতাকর্মী-সমর্থকদের রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাত।  সেই ভয়াবহ নির্মমতা জনস্মৃতিতে এখনো রয়ে গেছে। দলীয় প্রতীকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার গ্রামীণ সমাজকাঠামোকে বহুধাবিভক্ত করে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল। ক্ষমতাসীন দলের একক আধিপত্য বিস্তারের উপায় বানিয়েছিলেন শেখ হাসিনা স্থানীয় নির্বাচনকে। ওই নির্বাচন পরিণত হয়েছিল মারামারি, খুনোখুনি, কেন্দ্র দখল ও জোর-জবরদস্তির মহোৎসবে। যেখানে ভিন্নমতের কোনো স্থান রাখা হয়নি। ‘বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী’ হওয়ার যে অপসংস্কৃতি সেসময় দেখা গেছে, তা শুধু নাগরিকদের ভোটাধিকার হরণ করেনি; বরং পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামোর মূলে চরম আঘাত হেনেছিল। ইউপি নির্বাচন ঘিরে অগণিত প্রাণহানি, ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টের কলঙ্কজনক অধ্যায় রচিত হয়েছিল। ইসি রূপ নিয়েছিল সরকারের হুকুম তামিলের এক আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে।
সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে এসে ইসির হারানো জন-আস্থা পুনরুদ্ধার এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। একটি গ্রহণযোগ্য-অবাধ ইউপি নির্বাচন আয়োজনে ইসির সামনে বাধা পেশিশক্তি ও আধিপত্যের রাজনীতি। তাই স্থানীয় পর্যায়ের কোনো রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল যেন প্রভাব বিস্তার বা কেন্দ্র দখলের দুঃসাহস না দেখায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শতভাগ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করাতে হবে। অতীতের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ যেন কোনো পক্ষের সহযোগী না হন। নির্বাচনকালীন কোনো এলাকায় সঙ্ঘাতের আলামত দেখা দিলে আগেভাগে ব্যবস্থা নিয়ে অপরাধীদের দলমত-নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনতে হবে।
আমাদের দেশে স্থানীয় সরকার বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ গণতন্ত্রের প্রাথমিক ভিত্তি। এতে হানাহানি-জালিয়াতি হলে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই আসন্ন ইউপি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ যেন কোনো রক্তপাতের কারণ না হয়। ইসি ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও আনন্দময় নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হোক।

Advertisement