সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

মোট রফতানি আয়ের বড় অংশ আসে পোশাক শিল্প থেকে। কিন্তু জ্বালানি সঙ্কটে তৈরী পোশাক শিল্প এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গতকাল নয়া দিগন্তের এক প্রতিবেদনে এই চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরা হয়। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, বৈশ্বিক পোশাক ব্যবসায় বড় ব্র্যান্ডগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন বদলে যাচ্ছে। আগে কম শ্রমমূল্য ও বড় পরিমাণে উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ক্রয়াদেশ পাওয়ার প্রধান শর্ত। এখন নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, দ্রুত উৎপাদন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ, পরিবহন সুবিধা এবং সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি— সব কিছুকেই গুরুত্ব দিচ্ছে ক্রেতারা।
আমাদের দেশে জ্বালানি সঙ্কটকে দীর্ঘদিন ধরে কেবল গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতিজনিত উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু সেটি এখন আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের তৈরী পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। গ্যাসের স্বল্প চাপ, বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এতে বিদেশী ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পণ্যের দর-কষাকষির শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। ইউরোপের বেশ কিছু বড় ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনার আদেশ কমিয়ে ভারত ও ভিয়েতনামের মতো বিকল্প উৎপাদক দেশে সরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
পরিসংখ্যান ও বাজার বিশ্লেষণ বলছে, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো তাদের ঝুঁকি কমাতে কোনো একক দেশের ওপর নির্ভর করতে চাইছে না। তারা ‘পণ্য সংগ্রহের ভৌগোলিক ভারসাম্য’ তৈরি করছে। বৈশ্বিক ফাস্ট-ফ্যাশন ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএমের সরবরাহব্যবস্থায় সাম্প্রতিক পরিবর্তনও এ প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। জটিল ডিজাইনের পোশাকগুলোর বাজার যেসব এলাকায়, সেসব এলাকার কাছাকাছি কোথাও উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। আর বাংলাদেশে তুলনামূলক কম দামের পোশক উৎপাদন ধরে রাখতে চাইছে তারা। 
এই প্রবণতা আমাদের পোশাক খাতের জন্য ভয়াবহ। আমরা যদি কেবল সাধারণ ও কম দামি পোশাকের ক্যাটাগরিতে আটকে থাকি, তাহলে বিশ্ববাজারে ভারতের মতো উদীয়মান প্রতিযোগীরও আমাদের চাইতে এগিয়ে যাওয়ার শঙ্কা আছে। তা ছাড়া এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর চ্যালেঞ্জও আছে আমাদের। এক দিকে আমাদের অভ্যন্তরীণ পরিচালন ব্যয় বাড়ছে, অন্য দিকে বাণিজ্য সুবিধার সঙ্কটে রফতানিকারকদের মুনাফার খাত মারাত্মকভাবে সঙ্কুচিত হচ্ছে।
এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণে শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। জ্বালানি সঙ্কটকে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে না দেখে একে জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সময়মতো পণ্য পৌঁছানোর সুবিধা ঠিক রাখতে বন্দর, কাস্টমস ও পরিবহন ব্যবস্থার জটিলতা কমিয়ে ‘লিড টাইম’ ছোট করে আনতে হবে।
এর পাশাপাশি উদ্যোক্তাদেরও চিরাচরিত কমদামি পোশাকের নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অর্থনীতিবিদরা পরামর্শ দিচ্ছেন, উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্য, কৃত্রিম তন্তুর পোশাক, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক উৎপাদন ও নিজস্ব নকশা প্রবর্তনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রধান শক্তির জায়গা ছিল আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে ‘নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী’ হিসেবে চার দশকের সুনাম। এই অর্জন হাতছাড়া হতে দেয়া যাবে না। জ্বালানি সঙ্কটের দ্রুত সমাধান, আধুনিক লজিস্টিক ব্যবস্থা এবং উদ্ভাবনী পণ্যের সুপরিকল্পিত রূপান্তরই পারে ঝড়ের মুখে পোশাক শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে। 

Advertisement