
পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় অধিদফতরের প্রস্তাবিত ‘সমবায়ের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে কারিগরি ও ভাষাগত দক্ষতা উন্নয়ন’ প্রকল্প ঘিরে যে ব্যয়ের খতিয়ান ও রূপরেখা এসেছে; তা কর্মসংস্থানে আশাব্যঞ্জক। প্রায় এক লাখ ৯১ হাজার বেকার ও কর্মক্ষম তরুণকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের এ উদ্যোগে দুই হাজার ৮১২ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। হিসাব মতে, প্রশিক্ষণার্থীপ্রতি সরকারের গড় ব্যয় হবে এক লাখ ৪৮ হাজার ৪৭৫ টাকা।
নয়া দিগন্তের খবর বলছে, বিপুল এই অর্থ বিনিয়োগের উদ্দেশ্য— প্রান্তিক তরুণদের উপযোগী কারিগরি, ভাষাগত ও সফট স্কিল প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। প্রশ্ন হলো— এই বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পর দিন শেষে তরুণরা কি শুধু একটি সনদ পাবেন? নাকি টেকসই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা থাকবে? এমন প্রশ্ন উত্থাপনের কারণ— দেশে বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে বহু প্রশিক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। সে সবের বড় দুর্বলতা ছিল প্রশিক্ষণোত্তর মূল্যায়নের অভাব। প্রশিক্ষণের পর কত শতাংশ চাকরি পেয়েছেন। কতজন সফল উদ্যোক্তা হতে পেরেছেন— এর নির্ভরযোগ্য বা হালনাগাদ কোনো তথ্য নেই।
প্রস্তাবিত প্রকল্পটিতে সমবায় অধিদফতর দেশের ৪৯৬টি উপজেলায় ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ড্রেস মেকিং ও ভাষা শিক্ষা দেয়ার পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি ৫০ হাজার জনকে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা এবং ২০ হাজার ৭৫০ নারীকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
বাস্তবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সুনির্দিষ্ট চাহিদা, ভাষা শিক্ষার সঠিক মানদণ্ড, বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে ৫০ হাজার কর্মী বিদেশে পাঠানো কতটা সম্ভব। একইভাবে, প্রশিক্ষণের পর নারী উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ এবং কার্যকর বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা না গেলে, কেবল পোশাক তৈরি বা সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মনির্ভরশীল করাও কি বাস্তবসম্মত।
প্রকল্পের ব্যয় কাঠামোও প্রশ্নের বাইরে নয়। দুই হাজার ৮১২ কোটি টাকার মধ্যে সরাসরি প্রশিক্ষণ খাতে দুই হাজার ২০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। বাকি অর্থ ব্যয় হবে গাড়ি ক্রয়, সেমিনার, প্রচার-বিজ্ঞাপন, সম্মানী ও প্রশাসনিক খাতে। যখন দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পে আনুষঙ্গিক ও প্রশাসনিক পরিচালনায় বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে— প্রকল্পের মূলধন বেকার তরুণের সক্ষমতা বাড়াতে কতটা কাজে আসবে। নাকি প্রশাসনিক কাঠামোর আড়ালে খরচের খাত বড় করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) সঠিকভাবে অনুধাবন করেছে, এটিকে স্রেফ ‘সনদ বিতরণী কর্মসূচি’ হিসেবে না দেখে ফলভিত্তিক দেখা। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের স্বীকৃত কারিকুলাম ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলোর সাথে সরাসরি চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানের কার্যকর সংযোগ ঘটানো। তা না হলে বিপুল অর্থ শুধু অপচয় হিসেবে গণ্য হবে।
প্রশিক্ষণ কোনো লক্ষ্য নয়, কর্মসংস্থানে পৌঁছানোর মাধ্যম মাত্র। সরকারি বিপুল অর্থের সাফল্য সনদ বিতরণে নিহিত নয়; বরং কতজন বেকারের স্থায়ী কর্মসংস্থান হলো। কতজন নারী নিজস্ব ব্যবসা দাঁড় করাতে পারলেন। কতজন বিদেশী শ্রমবাজারে শক্ত অবস্থান পেলেন তার ওপর নির্ভর করছে সাফল্য। সঙ্গতকারণে আমরা বলতে চাই, প্রকল্পটি যেন আমলাতান্ত্রিক ও প্রথাগত বৃত্তে আটকে না যায়। মূল অর্থ যেন আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় না হয়ে দক্ষতা অর্জনে ব্যবহৃত হয়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








