মতামত
সম্পাদকীয় লোগো। নয়া দিগন্ত

জ্বালানি সঙ্কটের ডালাপালা আমাদের গ্রাস করে ফেলছে। একসাথে তেল, বিদ্যুৎ, গ্যাস— সবকিছুর ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তেলের জোগান অনেকাংশেই স্থিতিশীল হয়েছে। বিদ্যুতের সরবরাহও বাড়ানো গেছে। এই দুটোর উৎস এখনো টেকসই না হওয়ায় যেকোনো সময় বড় ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তবে গ্যাসের বিপুল ঘাটতি রয়ে গেছে, যা মোটাদাগে ভোগাচ্ছে দেশকে। এলপিজি সরবরাহ ব্যবস্থা একেবারে অস্থির হয়ে আছে। উপর্যুপরি এর দাম বাড়ানো হলেও সহজে মিলছে না সিলিন্ডার। দাম নির্ধারণ করে দেয়া হলেও নির্দিষ্ট মূল্যে কোথাও তা পাওয়া যাচ্ছে না। সর্বশেষ আবারো এর দাম বাড়ানো হয়েছে; নিশ্চিত করে বলা যায়— ওই দামেও পণ্যটি বাজার থেকে কিনতে পাওয়া যাবে না।
গত রোববার এলপিজির ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত নতুন দাম দাঁড়াল এক হাজার ৮৩৭ টাকা। নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পরও বাজারের সঙ্কট কাটেনি। খবরে জানা যাচ্ছে, একটি সিলিন্ডারের জন্য দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা লাগছে। দেশের বিভিন্ন শহরে কমপক্ষে ২০০-৩০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এলপিজি মূলত বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে ব্যবহার হয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কখনো এটি স্থিতিশীল মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে না। সবসময় বাজারে এর সরবরাহ ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে। একধরনের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির আলামত স্পষ্ট। বেশি দাম আদায়ের একটি অসাধু চক্রের কারসাজি কি না তা খতিয়ে দেখা হয়নি।
শিল্প-বাণিজ্যিপ্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁ এবং পরিবহন খাতেও এলপিজির ব্যবহার আছে। বছরে সবমিলিয়ে চাহিদা ১৭-১৮ লাখ টন। আমদানি ও দেশীয় উৎপাদন মিলে এর পুরোটা জোগান দেয়া যায় না। কাগজ-কলমে কিছুটা ঘাটতি দেখা যায়। কিন্তু বাজারে যেভাবে এর দুষ্প্রাপ্যতা লক্ষ করা যায়, সেটি অস্বাভাবিক। দেশের ৩২টি প্রতিষ্ঠানের এলপিজি আমদানির অনুমোদন আছে। এর মধ্যে ১৫টি আমদানি করে। বাজারে এদের মধ্যে দাম নিয়ে প্রতিযোগিতা দেখা যায় না। একধরনের অশুভ চক্রের ছায়া দেখা যায়। বাজার থেকে সিলিন্ডার একসাথে উধাও হয়ে যেতে দেখা যায়। খুচরা বিক্রেতাদের কাছে এর সরবরাহ না পাওয়ায় ভোক্তাদের মধ্যে হাহাকার পড়ে যায়। এরপরে দেখা যায়, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে এর সরবরাহ মিলছে। 
বিইআরসি ১২ আমদানিকারকের কাছে সেপ্টেম্বর মাসের আমদানি ও বিক্রির তথ্য চায়। এ তথ্য পাওয়ার পর এর দাম বাড়ানো হয়। ধরে নেয়া যাক, বিইআরসি আমদানি ঘাটতির বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে দাম বাড়িয়েছে। এরপরও কেন নির্ধারিত মূল্যে পাওয়া যাবে না। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানিটির দাম কেন স্থায়ীভাবে অস্থিতিশীল থাকবে। সবাই মিলে কি এর সরবরাহে একটি সঙ্কটাবস্থা তৈরি করে রেখেছে, যাতে ক্রেতাদের কাছে এটি চড়ামূল্যে বিক্রি করতে পারে? প্রশ্নটির সঠিক উত্তর দরকার।
এলপিজি সঙ্কটের পেছনে মূল কারণ জ্বালানি নিয়ে আমাদের স্থায়ী পরিকল্পনা না থাকা। জাতির জন্য এটি সর্বনাশা হলেও একটি শ্রেণীর জন্য এটি সীমাহীন মুনাফা হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে— আর কতকাল এ ধরনের জ্বালানি অনিশ্চয়তার সুযোগ দেয়া হবে এই শ্রেণীকে।

Advertisement