
রাজপথে হরতাল নেই, অবরোধ নেই। রাজনৈতিক উত্তাপও নেই। কর্মদিবসে আছে ছন্দ। কিন্তু এ স্থিতিশীলতার ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না উন্নয়ন কর্মসূচিতে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস চলে গেছে, তারপরও স্থবির হয়ে আছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য বলছে, প্রথম দুই মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে মাত্র ১.৮৫ শতাংশে। ব্যয় হয়েছে পাঁচ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। এমনকি পতিত আওয়ামী সরকারের শেষ তিন অর্থবছরের তুলনায়ও বর্তমান বাস্তবায়ন হার অর্ধেক বা তারও কম।
কেবল অর্থ ব্যয় হলে যে এডিপি বাস্তবায়ন হয়ে যায়, তা নয়। এর সাথে জড়িয়ে থাকে নির্মাণকাজ, ঠিকাদারি, শ্রমের চাহিদা, সিমেন্ট-রড-পাথরসহ নির্মাণসামগ্রীর বাজার, পরিবহন, স্থানীয় ব্যবসা ও কর্মসংস্থানসহ সার্বিক অর্থপ্রবাহ। বছরের শুরুতে ব্যয়ের গতি কমে গেলে এর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে যায়। বেসরকারি বিনিয়োগ যখন দুর্বল এবং অর্থনীতিতে চাহিদার চাপ থাকলে সরকারি উন্নয়নে ব্যয় অর্থনৈতিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হতে পারে। এই সময় সরকারি ব্যয় কম হলে তার চাপ প্রবৃদ্ধিতে পড়ে। তা ছাড়া বৈদেশিক সহায়তা ব্যবহারেও দেখা যাচ্ছে, এডিপির দুর্বলতা।
জুলাই-আগস্টে প্রকল্প ঋণ ও সহায়তা থেকে ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের মাত্র ১ দশমিক ২২ শতাংশ। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, দাতা সংস্থার জটিল শর্ত এবং ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রকল্প পুনর্ম্যূল্যায়নে আটকে আছে অর্থছাড়। পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পসহ সড়ক, বিদ্যুৎ ও রেলের মতো স্পর্শকাতর অবকাঠামো খাতে কাজের গতি দেখা যাচ্ছে না। এখানে উন্নয়ন বাজেটের একটি কাঠামোগত দুর্বলতাও আছে— বড় অঙ্কের অর্থ কয়েকটি বড় প্রকল্পে কেন্দ্রীভূত হয়ে গেলে পুরো এডিপির গতি ধীর হয়ে যায়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বড় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগে ২ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ বিভাগে ২ দশমিক ১৩ শতাংশ। নৌপরিবহন ও সেতু বিভাগের ক্ষেত্রেও বাস্তবায়ন প্রায় স্থবির। দেসের ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতায় এসবের প্রভাব পড়া স্বাভাবিক।
এই সমস্যার পেছনের কারণ কী? গতকাল নয়া দিগন্ত এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সার তুলে ধরা হয়েছে। সিদ্ধান্তহীনতা, প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন, অগ্রাধিকার নির্ধারণে সময়ক্ষেপণ, অর্থছাড়ের জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতাকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তারা।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আগের সরকারের আমলে নেয়া প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনীয়তা নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে। কিন্তু সেটি করতে গিয়ে পুরো উন্নয়ন কাজ ঝুলিয়ে রাখা উচিত নয়। সিদ্ধান্তহীনতায় শেষ তিন মাসে বাজেট খরচ করার তাড়াহুড়ো লেগে যাওয়ার শঙ্কা থেকে যায়। পুরনো এ অপচর্চা নতুন করে ফিরে আসুক, সেটি কাম্য নয়। এতে কাজের মান ঠিক রাখা যায় না। সেই সাথে অপচয় হয় সরকারি অর্থের।
আমরা মনে করি, বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেয়া উচিত নীতিনির্ধারকদের। অসংখ্য ঝুলন্ত প্রকল্প না রেখে সংখ্যায় কম; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন নীতির দিকে যেতে হবে। চলমান প্রকল্পগুলোর দ্রুত শ্রেণিবিন্যাস করে অর্থছাড় নিশ্চিত করা জরুরি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন দরকার। আমরা আশা রাখি, রাজনীতির স্থিতিসময় কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের চাকা সচল করা হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








