সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

ঢাকায় প্রতিদিন শত শত মানুষের স্রোত নামে। অন্যান্য জেলা থেকে যারা রাজধানীতে আসেন তারা আর খুব একটা ফিরে যান না। জীবনভর থাকার জন্য বসতি গড়েন ঢাকায়। এভাবে ঢাকা এখন মানুষের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে। আর এর ফলে ঢাকায় সৃষ্টি হয়েছে হাজারো রকমের সমস্যা। এসব সমস্যা থেকে ঢাকাবাসীকে মুক্তি দিতে নগর বিশেষজ্ঞরা ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণের পরামর্শ দিয়ে আসছেন বহুদিন থেকে। কায়েমি স্বার্থবাদীরা বিকেন্দ্রীকরণ চান না। অতীতের সরকারগুলোর মধ্যেও ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।  পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে গেছে, ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ বিকল্প চিন্তা করা যাচ্ছে না। যত দ্রুত সম্ভব এ কাজে হাত না দিয়ে উপায় নেই।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মোট জনসংখ্যা এক কোটি ২৭ লাখের কাছাকাছি— উত্তরে ৫৯ লাখ ৭৯ হাজার ৫৩৭ এবং দক্ষিণে ৪২ লাখ ৯৯ হাজার ৩৪৫ জন। অন্য দিকে জাতিসঙ্ঘের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টাস-২০২৫’ অনুযায়ী, ঢাকার জনসংখ্যা তিন কোটি ৬৫ লাখ ৮৫ হাজার। জাতিসঙ্ঘের হিসাবে ২০২৫ সালে বিশ্বের জনবহুল নগরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। শীর্ষে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা, যার জনসংখ্যা চার কোটি ১৯ লাখ ১৪ হাজার। তৃতীয় অবস্থানে জাপানের টোকিও, জনসংখ্যা তিন কোটি ৩৪ লাখ ১৩ হাজার।
জাতিসঙ্ঘ বলছে,  ২০৫০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়াবে পাঁচ কোটি ২১ লাখ ২৩ হাজার। জাতিসঙ্ঘের এই পূর্বাভাষ থেকে অনুমান করা যাচ্ছে, বর্তমানে ঢাকা যেটুকু বসবাসের উপযোগী আছে; আগামীতে তাও আর থাকছে না। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হতে পারে, ঢাকাকে একটি পরিত্যক্ত নগরী ঘোষণা করা লাগতে পারে। 
কয়েক শ’ মাইল দূর থেকে ঢাকায় এসে কাজ করা মানুষ যে সবাই খুব আয়েশি জীবন-যাপন করেন তা কিন্তু নয়! বরং ঢাকার ফুটপাথ, বস্তি কিংবা নিম্ন আয়ের অন্যান্য মানুষের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তারা অনেকটা নিরুপায় হয়েই এখানে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন। নিজ জেলায় কর্মসংস্থান থাকলে ঢাকায় বাস করা অনেক মানুষই আর এখানে থাকতেন না।  
কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক ঢাকার যে একক আধিপত্য এর অবসান হওয়া দরকার। এটিকে জেলায় জেলায় ছড়িয়ে দিতে হবে। সব জেলায় তৈরী পোশাকশিল্প গড়ে তুলতে হবে বিষয়টি তেমন নয়; বরং প্রতিটি জেলার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সেই জেলাগুলোতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। এই উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী দেশের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে এ কাজে সরকারকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করতে হবে। জেলাকেন্দ্রিক পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারলে ঢাকায় জনস্রোত অনেকটাই কমানো সম্ভব। 
এভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোতে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।  আদিকাল থেকে মানুষ যেখানে  সুন্দর ও স্বাচ্ছন্দ্য জীবনযাপনের উপকরণ পেয়েছে, সেখানে গিয়ে বসবাস করতে শুরু করেছে। এটি মানুষের স্বভাবগত গুণ। বাংলাদেশেও শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক সবকিছু না করে সারা দেশে তা ছড়িয়ে দিতে হবে। তবেই তা দেশের সব মানুষের জীবন ধারণের জন্য কল্যাণকর হবে। 

Advertisement