সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়। নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

বাংলাদেশে উৎপাদন হওয়া পাটের কদর আছে বিশ্ববাজারে। এখানকার পাটের গুণগত মান ভালো। উজ্জ্বলতায়ও সেরা। বিশ্ববাজারে ‘সোনালি আঁশ’ হিসেবে পরিচিত এই প্রাকৃতিক ফাইবার দিয়ে মিহি সুতা, সূক্ষ্ম কাপড় ও উন্নত কার্পেট তৈরি সম্ভব। বৈশ্বিক পাট উৎপাদনের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশই হয় বাংলাদেশে। উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, তবে রফতানিতে প্রথম।
পাট উৎপাদনে প্রথম অবস্থানে আছে ভারত। মোট উৎপাদনের প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ উৎপাদন হয় ওই দেশটিতে। ভারতে উৎপাদিত পাটের বেশির ভাগই মাঝারি থেকে মোটা মানের। এগুলো বস্তা বা মোটা প্যাকেজিং ব্যাগ তৈরিতে ব্যবহার হয়। তা ছাড়া ভারতের এই বিপুল উৎপাদন নিজেদের অভ্যন্তরীণ বাজার মেটাতেই শেষ হয়ে যায়। ফলে ভারতের টেক্সটাইল, কার্পেট ও প্যাকেজিং শিল্পের মানসম্মত কাঁচামাল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের প্রিমিয়াম মানের পাটের সুতা ও টুইনের ওপর নির্ভর করতে হয়। বাংলাদেশ থেকে রফতানি হওয়া মোট পাটপণ্যের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জায়গা করে নেয় ভারতের বাজারে। রফতানির এই ধারা স্বাভাবিক থাকলে উভয় দেশের জন্য ভালো।
আফসোসের বিষয় হলো— বাংলাদেশ থেকে পাট নেয়ার ক্ষেত্রে অন্যায্য বাধার দেয়াল তুলে দিচ্ছে ভারত। বাংলাদেশের পাটপণ্য আমদানিতে নতুন করে প্রতি টনে ১৪০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ভর্তুকিবিরোধী শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে দেশটি। এই শুল্ক আরোপের চার দিন আগে বাংলাদেশী পাটপণ্যে সর্বোচ্চ ৪৪৫ ডলার অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে তারা। এর পাশাপাশি সড়কপথে আসা স্বাভাবিক স্থলবন্দরগুলো বন্ধ করে দিয়ে কেবল সুদূর মুম্বাইয়ের ‘নাভা শেভা’ সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে, যা সরাসরি কৃত্রিম অশুল্ক বাধা।
ভারতের এই পদক্ষেপ অন্যায্য। সেই সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ‘সাবসিডি অ্যান্ড কাউন্টারভেইলিং মেজার্স’ চুক্তি এবং স্বয়ং ভারতের কাস্টমস ট্যারিফ আইনের ৯বি ধারা অনুযায়ী, একই পণ্যে একই সাথে অ্যান্টি-ডাম্পিং ডিউটি ও সিভিডি আরোপ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই দ্বৈত শুল্ক মূলত বিশ্ব মুক্ত বাণিজ্যের পরিপন্থী। বাংলাদেশের সাশ্রয়ী উৎপাদন ব্যয়কে অন্যায়ভাবে ‘ভর্তুকি’ হিসেবে চিহ্নিত করছে তারা। 
বাংলাদেশের সেরা মানের পাটসুতা, হেসিয়ান ও ব্যাগ ভারতীয় বাজারে জনপ্রিয় এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের। এই প্রাকৃতিক ও গুণগত সুবিধাকে বাণিজ্যের ময়দানে পরাস্ত করতে পারছে না ভারত। 
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বড় দাগে ভারতের অনুকূলে। হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র পণ্য দেশটিতে রফতানি হয়। বাংলাদেশ যখন প্রিমিয়াম পণ্য নিয়ে ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করতে চায়, তখনই একের পর এক বেআইনি শুল্ক ও কঠিন পোর্ট-বিধি চাপিয়ে পথ বন্ধ করে দেয়া হয়।
শুধু কূটনৈতিক অনুরোধ বা আনুষ্ঠানিক চিঠিপত্র পাঠিয়েই এই অন্যায্য বাণিজ্য বাধা উত্তরণ সম্ভব নয়। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে সরকারকে দৃঢ় ও শক্ত অবস্থান নিতে হবে। অন্যায্য সিদ্ধান্ত থেকে সরে না এলে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিরোধ নিষ্পত্তি ট্রাইব্যুনালে ভারতের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক নালিশ জানাতে হবে। ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্প, রফতানি খাত ও পাটচাষিদের স্বার্থরক্ষায় বলিষ্ঠ ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। 

Advertisement